এই সঙ্গীতযোগে নৃত্যের পূর্ণবিকাশ আমাদের প্রাচীন নৃত্যে দেখা যায় না।
রবীন্দ্র-নৃত্যের স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য এবং সৌন্দর্য রক্ষার কথাও ভেবেছিলেন প্রতিমা। তাই গানের স্বরলিপির মতো নৃত্যলিপির কথাও তার মনে আসে। শিল্পী হারিয়ে যাবে। শিল্প হারাবে না। শিল্প যে অবিনশ্বর! রবীন্দ্রনাথের চোখের সামনে যে শিল্প নৃত্যরূপ লাভ করল, তার মধ্যে আছে আপন স্বকীয়তা। একে যদি ধরে না রাখা হয় তাহলে যে হারিয়ে যাবে সেই নয়ননন্দন ভঙ্গিমা। তাই প্রতিমা আশ্রমের নতুন মেয়েদের নিয়ে নাচের ক্লাস করতেন। মেয়েদের দিয়ে নাচ তৈরি করিয়ে কবিকে দেখাতেন। কবির অনুমোদন না পেলে সন্তুষ্ট হতেন না। চলত অনুশীলনের পর অনুশীলন। তখন অবশ্য সব নৃত্যই ছিল ভাবনৃত্য। গানের ভাবই প্রকাশ পেত নৃত্যভঙ্গিমায়। প্রতিমা নিজেই নাচের মূদ্রা দেখিয়ে দিতেন; পুরোপুরি নাচ তৈরি করে দিতেন সুন্দরভাবে গানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে। নাচের বোল ছাত্রীদের লিখে রাখতে বলতেন এবং কলা ভবনের শিল্পীদের দিয়ে নৃত্যের ভঙ্গি আঁকিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন।
রবীন্দ্রনাথকে প্রতিমা যত গভীরভাবে বুঝতেন ততখানি বোধহয় কেউ বোঝেননি! বৃথীন্দ্রের সঙ্গে কবির আদর্শগত মতবিরোধ হত। কিন্তু প্রতিমার সঙ্গে নয়। তাই কবির শেষজীবনের অনুপুঙ্খ ঘটনায় পূর্ণ নির্বাণ প্রতিমার হাতে জীবন্ত হয়ে উঠেছিল। এমন নির্লিপ্ত মৌখিক ভঙ্গিতে তিনি কবির সর্বশেষ পর্যায়টি বর্ণবিরল পরিচ্ছন্ন কয়েকটি হালকা রেখার টানের মতো ফুটিয়ে তুলেছেন যা নিজে না পড়লে বোঝা যায় না। শান্তিনিকেতনে তিনি নারীশিক্ষা ও নারীকল্যাণের দিকটাও দেখতেন। মেয়েদের নিয়ে গড়েছিলেন আলপিনী সমিতি। ইন্দিরা ও হেমলতা ছাড়াও সেখানে ছিলেন সুকেশী, কমলা, মীর ও আরো অনেকেই। মাঝে মাঝে ঘরোয়া এবং পুরোপুরি মেয়েলি অনুষ্ঠানে তারা লুকিয়ে লুকিয়ে নিজেরাই নানারকম নাচের মুদ্রা অভিনয় করছেন, গান গাইতেন। আবার কখনো কখনো তেঁতুলতলায় ছোট চৌকি পেতে বসে তাঁরা বোলপুরের মেয়েদের শেখাতেন গান, বলতেন গল্প। চারপাশের গ্রামে কাজ করা পছন্দ করতেন রবীন্দ্রনাথ। তাই প্রতিমার ব্যবস্থায় আশ্রম থেকে মেয়ের পালা করে যেতেন গ্রামে—কখনো হেঁটে কখনো গরুর গাড়ি চড়ে। গ্রামের অশিক্ষিত মেয়েদের তারা শেখাতেন, কি করে স্বাস্থ্যকর খাবার তৈরি করা যায়, শরীর ভাল করা যায় কিংবা টুকিটাকি হাতের কাজ করে তা থেকে দু পয়সা উপার্জন করে সংসারের সাশ্রয় হয়—এইসব! কবির সমস্ত ইচ্ছেকেই সাগ্রহে রূপ দেবার চেষ্টা করেছিলেন প্রতিমা।
আলাপিনী সমিতির আরেকজন সভ্য ছিলেন দিনেন্দ্রনাথের স্ত্রী কমলা। এরকম আমুদে, সবার মুখে সুখী মেয়ে খুব কমই ছিল। এখনো শান্তিনিকেতনের প্রথম যুগের মানুষেরা কমলা বৌঠানের কথায় খুশি হন। বলেন, তার মতো মানুষ হয় না। খুব আদর যত্ন করতেন। আসলে এক এক জন মানুষ থাকেন যারা অনেক কিছু না করেও জুড়ে থাকেন মনের অনেকখানি, কমলা ছিলেন তাই। কবির সঙ্গেও তার মধুর সম্পর্ক। পরিবারের সবচেয়ে বড় নাতবৌ। সেই সুবাদে কবি প্রায়ই ঠাট্টা-তামাশা করে লজ্জা দিতেন কমলাকে। সবার মাঝে হঠাৎ কমলাকে ডেকে পাশে বসিয়ে বলতে শুরু করে দিতেন,
কমল তুমি এইখানটিতে বোসস! তোমার সঙ্গে আমার যে খুব ভাব, তা না-হয় ওরা দেখতেই পাবে, না-হয় কলকাতায় গিয়েই বলে দেবে।
ওরা হচ্ছেন রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে সীতা ও শান্তা। আরেক দিনের কথা। তারও সাক্ষী সীত। রবির সঙ্গে কমলের সম্বন্ধটি নিয়ে কবি প্রায়ই ঠাট্টা করেন। তাঁর গানে ঘুরে ফিরে যে কমল কথাটা আসে কেন কে জানে? একজন জানালেন, দিনেন্দ্রনাথ নাকি এতে আপত্তি করছেন কারণ গান শেখাতে গেলে গানে কমল কথাটা থাকলে ছেলেরা হাসে। কবি জানেন সবই। ছেলেদের হাসির কারণ যে কবি নন, স্বয়ং দিনেন্দ্র, তাও জানেন। তাই কবি গম্ভীর হবার ভান করে বলেন, দোষটা মেয়েদেরই। তারাই এ কথাটা ছড়িয়েছে।
আলাপিনী সমিতির নিজস্ব কাগজ ছিল শ্রেয়সী। একদিন শোনা গেল কমলা তার জন্যে একটা গল্প লিখেছেন। কবির মহা উৎসাহ। কেমন গল্প? গল্পের মধ্যে কটা বিয়ে আছে? নেই? বিয়ে ভাঙাও নেই? কমলাকে বললেন, তুমি কোনো কর্মের নয়, একটা বিয়ে দিতে পারলে না?
এরপর প্রতিমা বলে দিলেন, গল্পের নায়ক একজন কবি। আর যায় কোথায়! কবি অত্যন্ত চটে ওঠার ভান করে বললেন, এ নিশ্চয় আমাকে লক্ষ্য করে লেখা, যাও, তোমার সঙ্গে আর কোনো কথা নয়—
শ্রেয়সী পত্রিকার সব কটা সংখ্যা আর পাওয়া যায় না। যে কটি আছে তাতে কমলার গল্পটি পাওয়া যায়নি, শুধু একটিমাত্র লেখা পাওয়া গেছে। গল্প নয়, ছোট্ট একটি রচনা গান। মনে হয় এতে তার স্বামীর হাতই বেশি। দিনেন্দ্রনাথ শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতের ভাণ্ডারী ছিলেন না, নিজেও কবিতা লিখতেন। তার প্রথম কবিতার বইটা প্রকাশিত হল নীরব বীণ নামে। বাকা মন্তব্য করলেন সুরেশ সমাজপতি, দাদামশাই আর নাতি এত জোর নীরব বীণা বাজাচ্ছেন যে দুদিন পরে গড়ের মাঠে আর ব্যান্ড পার্টির দরকার হবে না! লজ্জায় দুঃখে সব বই লুকিয়ে ফেললেন দিনেন্দ্রনাথ। তাঁর মৃত্যুর পরে সমস্ত অপ্রকাশিত রচনা একত্র করে সেগুলি প্রকাশ করে কমলা তার কর্তব্য পালন করেন। গান-এর ভাষা সহজ, সরল, প্রাণের ভেতরে প্রবেশ করে।
