দোল পূর্ণিমারও একটি বিশেষ সাজ ছিল, সে হল হালকা মসলিনের শাড়ি, ফুলের গয়না আর অতির গোলাপের গন্ধমাখা মালা। দোলের দিন শাদা মসলিন পরার উদ্দেশ্য ছিল যে আবিরের লাল রঙ শাদা ফুরফুরে শাড়িতে রঙিন বুটি ছড়িয়ে দেবে।
প্রতিমার বিবরণে গয়নার কথা নেই। গগনেন্দ্রর ছোট মেয়ে সুজাতা আমাদের জানিয়েছেন, সে সময় দিনে সোনার গয়না, বিকেলে মুক্তোর গয়না এবং রাতে হীরে জহরতের জড়োয়া গয়না পরার রেওয়াজ ছিল। বিয়েবাড়িতে কিংবা উৎসবের দিনে তারা এভাবেই সাজতেন। দিনের সোনালি আলোয় সোনার জৌলুষ বাড়ে, রাতের আলো হীরে জহরতে ঠিকরে পড়ে, শুধু মুক্তোর ভূমিকাঁটাই তেমন স্পষ্ট হল না। বিকেলের আলো-আঁধারি আর মন-কেমনকরা গোধূলি আলোয় মুক্তোই বোধহয় সবচেয়ে ভাল দেখায়।
প্রতিমার আসল দান কিন্তু ছবি আঁকা বা লেখা নয়, শান্তিনিকেতনে মেয়েদের জন্যে নাচ শেখাবার ব্যবস্থা। যদিও বাঙালীদের মধ্যে নাচ শেখার একেবারেই কোন ব্যবস্থা ছিল না। সেকালে স্টেজের ওপর তাল রেখে দু পা চলাও ছিল রীতিমতো লজ্জার কথা। বাল্মীকি প্রতিভা বা মায়ার খেলার সবটাই ছিল অভিনয়, সামান্য হাত নেড়ে একটু আধটু নাচের ভাব আনার চেষ্টা করা হত। তবে দিন বদলাচ্ছে। মেয়েরা এগিয়ে এসেছেন সব কাজে উৎসাহ নিয়ে। নাচেই বা পিছিয়ে থাকলে চলবে কেন? শান্তিনিকেতনে এই পরীক্ষা চালানোও অপেক্ষাকৃতভাবে সহজ। তাই আগ্রহী হয়ে উঠলেন প্রতিমা। নিজে তিনি মঞ্চে উপস্থিত হয়েছেন খুব কম। তার বিয়ের অল্প পরেই শান্তিনিকেতনে মেয়েদের প্রথম অভিনয় লক্ষ্মীর পরীক্ষা, প্রতিমা তাতে সেজেছিলেন ক্ষীরি। এরপর নিজে অভিনয় না করলেও যে কোন রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যের তিনিই ছিলেন প্রাণ। রবীন্দ্রনাথের নিজের মনেও চিত্রাঙ্গদা, পরিশোধ নিয়ে নৃত্যনাট্য রচনার কোন পরিকল্পনা ছিল না। প্রতিমাই একটা খসড়া খাড়া করে কবির কাছে নিয়ে গেলে কবি এই নতুন শিল্পরূপ সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠেন।
কিন্তু নাচ কে শেখাবে? শান্তিনিকেতনে কিভাবে শেখান হবে? এ দেশের চোখ নাচ দেখতে অভ্যস্ত নয়। তাতে কি? প্রতিমা শুরু করলেন দুরূহ সাধনা। তিনি নিজে নৃত্যশিল্পী নন, কোনদিন নাচ শেখেননি। অসাধারণ শিল্পবোধের সাহায্যে কে এগোতে হয়েছে। তবে বাঙালীরা যে এ সময় নৃত্য-সচেতন হয়ে উঠেছে তার ইতস্ততঃ প্রমাণ দেখা যেতে লাগল উদয় শংকরের আবির্ভাবে। অবশ্য তখনও তার নৃত্যসঙ্গিনী কোনো ভারতীয় নন, বিদেশিনী সিমকি। ভদ্রবরের বাঙালী মেয়েদের নাচের পথ দেখিয়েছেন রে রায়। য়ুনিভারসিটি ইন্সটিটিউটে ঋতুচক্রের আয়োজন করেছিলেন সৌম্যেন্দ্রনাথ ও আরো অনেকে। উৎসবের শেষ গান যে কেবল পালিয়ে বেড়ায় দৃষ্টি এড়ায় ডাক দিয়ে যায় ইঙ্গিতে শুরু হতেই রেবা হঠাৎ গানের দল থেকে বের হয়ে এলেন উল্কার মতো স্টেজের মাঝখানে, গানের হালকা ছন্দের সঙ্গে শুরু করে দিলেন চপল নৃত্য! কাণ্ড দেখে সবাই তাজ্জব! চোখ কপালে উঠে গেল। ছি ছি ছি, ভদ্রঘরের মেয়েরা আবার নাচে নাকি? বিষোগারে কান পাতা দায়। এর উত্তর দিলেন সৌম্যেন্দ্র আরো কয়েকদিন পরে। জোড়াসাঁকোর বাড়ির উঠোনে নূপুর বেজে যায় রিণি রিণির সঙ্গে নাচলেন তিনটি মেয়ে চিত্রা, নন্দিত ও সুমিতা। এর বছরখানেক পরে রবীন্দ্রনাথ মঞ্চস্থ করলেন নটীর পূজা। এই সময় ভদ্রঘরের মেয়েদের নাচার পথ আরো সুগম করে দিলেন কেশবচন্দ্র সেনের নাতনীরা। ১৯২৮ সালে ভিক্টোরিয়া ইটিটিউশনের সাহায্যের জন্যে মঞ্চস্থ করা হল শ্রী কৃষ্ণ! কৃষ্ণের বাল্যরূপ দিলেন নীলিনা আর তার পরবর্তী জীবন রূপায়ণের ভার পড়ল সাধনার ওপর। সাধনা পরবর্তী জীবনে মধু বসুকে বিয়ে করেন ও মঞ্চে-পর্দায় অনেকবার নর্তকীরূপে উপস্থিত হন। সাধনা শিখেছিলেন ভালো কথক নাচ। আলিবাবা, রাজনৰ্তকী, দালিয়া তার অভিনয়ের সাক্ষ্য হয়ে। আছে। রেবা রায়ও নিয়মিত ভাবে নাচ শেখাতে লাগলেন সঙ্গীত সম্মিলনীতে। বড় বড় নৃত্যনাট্যের অনুষ্ঠান শুরু করলেন কিছুদিন পরে। যাক সে কথা।
প্রতিমা শান্তিনিকেতনে যা শেখাচ্ছিলেন তাকে ভাবনৃত্য বলাই উচিত। বর্ষামঙ্গলের দু-একটা নাচে কিছু রূপ দেবার পর প্রতিমা কবিকে পূজারিণী কবিতার নৃত্যনাট্যরূপ লিখে দিতে অনুরোধ করেন। শুধু মেয়েদের দিয়ে সেটি অভিনয় করবেন কবির জন্মদিনে। লেখা হল নটীর পূজা। দিনরাত খেটে প্রতিমা মেয়েদের দিয়ে অভিনয় করালেন। শ্ৰীমতীর ভূমিকায় অপূর্ব নৃত্যাভিনয় করে চিরস্মরণীয় হয়ে রইলেন নন্দলাল বসুর মেয়ে গৌরী। অবশ্য এ অভিনয় আরো পরের ব্যাপার!
দীর্ঘ চোদ্দ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে প্রতিমা রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্যের পাকা রূপ ফুটিয়ে তুললেন চিত্রাঙ্গদায়। এর আগে এসেছে শাপমোচন। নৃত্য নিয়ে প্রতিমা যে কত ভেবেছেন তার পরিচয় আছে তাঁর লেখা নৃত্য বইখানিতে। চিত্রাঙ্গদাতে যে বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠল তা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠল চণ্ডালিকাতে। এই বৈশিষ্ট্য কি? যা অন্য থেকে রবীন্দ্র নৃত্যনাট্যকে পৃথক করে রেখেছে। উদয়শংকরের নাচ তখন অনেকে দেখেছেন, দেখেছেন রেবা রায় ও সাধনা বসুর নাচের ধারা। এমন কি শ্ৰীমতীও মডার্ণ ডাসের আঙ্গিকে পরীক্ষামূলকভাবে রবীন্দ্র কবিতার সঙ্গে পরিবেশন করেছেন তার ভাবনৃত্য। চিত্রাঙ্গদা প্রথম মঞ্চায়িত হল ১৯৩৬ সালে নিউ এম্পায়ারে। এর পর ১৯৪০ সাল পর্যন্ত চিত্রাঙ্গদার অভিনয় হয় চল্লিশবার। এ হিসেব শান্তিদেব ঘোষের রচনা থেকে পাওয়া, তিনি থাকতেন নাচ ও গান উভয় দলেই। অর্জুন, কুরূপা ও সুরূপা চিত্রাঙ্গদা সাজতেন নিবেদিতা, যমুনা ও কবির দৌহিত্রী নন্দিতা। অন্তরালে থাকতেন প্রতিমা। সমস্ত পোশাক-পরিচ্ছদ-সাজ তাঁর নির্দেশেই পাননা হত। মঞ্চ-সজ্জাতেও তিনি শান্তিনিকেতনের ঐতিহ্য গ্রহণ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাটক ও নৃত্যনাট্যে দৃশ্যসজ্জা ও রূপসজ্জায় যে একটি শালীন সৌন্দর্য আছে প্রতিমা সেটি। কঠোর ভাবে মেনে চলতেন। তাই নারী চরিত্রগুলির সুরুচিসম্মত রূপসজ্জা রচনায় তার নাম স্মরণীয় হয়ে আছে। শেষ দিকে কবির নির্দেশে তিনি নাটকের মঞ্চসজ্জা কেমন হবে তার স্কেচ করে রাখতেন। কবি তার অনুরোধে আর উৎসাহেই নৃত্যনাট্যগুলির খসড়া করেন আগেই বলেছি। মায়ার খেলারও নতুন রূপ দিয়েছিলেন তিনি। প্রতিমা আবার কথা ও কাহিনীর সামান্য ক্ষতি, গল্পগুচ্ছের ক্ষুধিত পাষাণ ও দালিয়া গল্পকে ট্যাবলো ধরনের মূকাভিনয় আকারে রূপায়িত করে কবিকে দেখিয়েছিলেন। তাতেও অবশ্য অভিনয়ের চেয়ে ভাবনৃত্যের প্রাধান্য ছিল। প্রতিমার নিজের মতে রাবীন্দ্রিক নৃত্যনাট্যের প্রধান বৈশিষ্ট্য সংমিশ্রণ। শান্তিনিকেতনের নৃত্য কোন বিশিষ্ট নৃত্যকলার আঙ্গিককে গ্রহণ করেনি। মিশ্র তল ও ভঙ্গির সহযোগে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হয়েছে। তাই মণিপুরী আঙ্গিকে গড়ে ওঠা চিত্রাঙ্গদার নাচ সমস্ত মণিপুরে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দক্ষিণী আঙ্গিকে তৈরি চণ্ডালিকাকে চেনা যাবে না দক্ষিণী নাচের মধ্যে। মিশ্রণের এমনি গুণ। এর পর এই মিশ্র নৃত্যকে দাড় করান হল সঙ্গীতের ভিত্তির ওপর। সেইটেই হল শান্তিনিকেতনের নতুন দান।
