প্রতিমার বিয়েতে সামাজিক বাবা কিছু এসেছিল। ঠাকুর পরিবারের কোন শরিক নিজের বাড়ির উৎসবে রবীন্দ্ৰপরিবারকে নিমন্ত্রণ করেননি এই সব। এদিকে বেশি মনোযোগ না দেওয়ায় সব ঝড় কেটে গেল। রবীন্দ্রপরিবারে গৃহলক্ষ্মী হয়ে প্রবেশ করলেন প্রতিমা; সত্যিই তিনি ছিলেন মূর্তিমতী লক্ষ্মীশ্রী, রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের মা-মণি, তার আদরের ব্রাইড মাদার (বৌমা)। দীর্ঘ বত্রিশ বছর ধরে রবীন্দ্র সান্নিধ্যে থেকে তার সেবা করে গিয়েছেন প্রতিমা। সেই সঙ্গে চলেছে আশ্রমের দেখাশোনা আর অতিথি সেবার কাজ। কবির সেবা করা খুব সহজ কাজ ছিল না। প্রতিমা করেছেন অসীম ধৈর্য নিয়ে।
শুধু সেবা নয়, প্রতিমা শিল্পক্ষেত্রে রেখে গেছেন অনেক। তার যা কিছু শিক্ষা রবীন্দ্রনাথের কাছেই। সেই শিক্ষা তার প্রতিভার স্পর্শে নতুন রূপ নিল। চলে যেতে যেতে রেখে গেল ঠাকুরবাড়ির মেয়ের আরো কিছু অসামান্য দান। প্রতিমা দুই পরিবারের শিক্ষা সংস্কৃতি নিয় এসেছিলেন। নিয়ে এসেছিলেন কল্যাণশ্রীর সঙ্গে আশ্চর্য নিরাসক্তি। তিনি ভাল লিখতে পারতেন, পারতেন ভাল ছবি আঁকতে। তাঁর লেখা গুরুদেবের ছবি রবীন্দ্রনাথের চিত্র বিচারের মাপকাঠি। বাস্তবিক চিত্র বিচারে প্রতিমা ছিলেন সিদ্ধহস্ত। রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলাকে তিনভাগ করে প্রতিমা দেখিয়েছেন কবির আঁকা প্রাকৃতিক দৃশ্য ও জীবজন্তু যেমন ফরাসী জাতির দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তেমনি মানুষের মুখের প্রতিকৃতি মনোহরণ করেছিল জার্মানদের। কিন্তু আসলে এসব ছবিকে বিশ্লেষণ করা যায় না। সৃষ্টির এমন এক সত্যকে এরা অনুভূতি দিয়ে প্রকাশ করছে যার ব্যাখ্যা চলে না। দিব্যদৃষ্টি দিয়ে কেউ যদি সে জিনিষ ধরতে পারল তো বুঝল, নইলে খনির ভিতর মণির মতো তার দীপ্তি রইল ঢাকা। রবীন্দ্রনাথ শেষ বয়সে ছবি আঁকলেন দু হাজারেরও বেশি। ছবি তার শেষ বয়সের প্রিয়া—জীবন-সায়াহ্নে যে নায়িকা আসে সে যেন সবচেয়ে বেশি অভিনিবেশ দাবি করে। চোখের সামনে বুঝি ফুটে উঠল আর একটা জগৎ, রঙে-রেখায় কবি তাকে স্পষ্ট করে তুললেন। রবীন্দ্রনাথের এই ছবি আঁকার কথা লিখেছেন প্রতিমা। তাঁর মতে, রবীন্দ্রনাথ কবিতায় যেমন একটা সৃষ্টির সম্পূর্ণ চেহারা দিয়েছেন চিত্রেও তেমনি বস্তু প্রবাহের আবর্তনের ইতিহাস একেছেন। গ্রহ নক্ষত্রের মধ্যে যে ঘূর্ণমান গতি তেজের চাপে রচনার কাজে নিরন্তর নিযুক্ত, তারি জোয়ার ভাটার টানে রেখা হতে রেখান্তরে প্রাণী ও জড়জগতের চেহারা ছাঁচে ঢালাই হয়ে বেরিয়ে আসছে। শিল্পীর মনে লেগেছিল সেই স্রোতের ঢেউ। ব্যক্তিত্বের রসে মজে তাই তুলির টানে বেরিয়ে এল রূপ হতে রূপান্তরে সৃজিত অপরূপ মানুষ পশুপক্ষী ও দৃশ্য।
এ তো গেল প্রতিমার চিত্র সমালোচনার কথা। প্রতিমা নিজেও ভাল ছবি আঁকতেন। কিছু শিখেছিলেন ইতালিয়ান শিক্ষক গিলহার্ডির কাছে। কয়েকটি ছবিতে তার দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যাবে। ছবির সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল কথার ছবি আঁকা। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ছদ্মনাম দিলেন কল্পিতাদেবী। এই নামে প্রতিমা অনেক কবিতা লেখেন প্রবাসীতে। প্রতিটি কবিতা লিখেই তিনি দেখাতে যেতেন কবিকে। বুক ঢিপঢিপ করত ভয়ে। কি জানি হয়ত হয়নি। অথচ না দেখিয়েও তৃপ্তি নেই। কবি বেশ মন দিয়েই দেখতেন। মাঝে মাঝে কলম চালিয়ে তাতে এনে দিতেন ঔজ্জ্বল্যের দীপ্তি। আবার কখনও কখনও প্রতিমার লেখা কবিতাটাকেই ভেঙেচুরে নতুন করে লিখে দেখাতেন কাব্যভাষা বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে কবিতাটাই কেমন নতুন হয়ে ওঠে। যেমন ধরা যাক স্মৃতি কবিতাটা প্রতিমা লিখলেন :
এই গৃহ এই পুষ্পবীথি
যারে ঘেরি একদিন তোমার কল্পনা
গড়েছিল ইমারত দীপ্তি গরিমার,
উত্তপ্ত কামনা তব যার প্রতি ধূলির কণায়
জীবন্ত করিয়াছিল তব মুহূর্তেরে।
যে বাসনা মনে ছিল পুরিল না।
অবসন্ন প্রাণ
গেল চলে ছায়া ফেলে অঙ্গনে প্রাঙ্গণে।
রবীন্দ্রনাথ ভাষা বদলে লিখলেন :
এই ঘর এই ফুলের কেয়ারি
একে ঘের দিয়ে তোমার খেয়াল
বানিয়েছিল পরীস্থানের ইমারৎ।
তোমার তপ্ত কামনা।
রাঙিয়েছিল তার প্রত্যেক ধূলিকণাকে
তার প্রত্যেক মুহূর্তকে করেছিল তোমার আবেগ দিয়ে অস্থির।
তুমি চলে গেলে,
অকৃতার্থ আকাঙ্ক্ষার ছায়া ভেসে বেড়াচ্ছে
অঙ্গনে প্রাঙ্গণে।
কবির সঙ্গে কল্পিতার এই ধরনের কবির লড়াই প্রায়ই হত। তার গদ্য রচনাতে চোখে পড়বে লিপিকার বিশিষ্ট ভঙ্গি। সে যেন গদ্য নয়, গদ্য কবিতা। নটী, মেজবৌ ১৭ই ফান, সিনতলা দুর্গ সবই এক সুরে বাঁধা। প্রতিমার লেখা স্বপ্নবিলাসী পড়ে কবি মুগ্ধ হয়ে লেখেন মন্দিরার উক্তি। পুত্রবধূকে অনুরোধ করেন তার পরের অধ্যায় নরেশের উক্তি লিখতে। অর্থাৎ কবি লিখবেন নারীর উক্তি আর প্রতিমা লিখবেন পুরুষের উক্তি। কিন্তু কবির সঙ্গে হাত মিলিয়ে গল্প লেখা? কল্পিতা রণে ভঙ্গ দিলেন।
এছাড়া প্রতিমা লিখেছেন কিছু স্মৃতিকথা। মায়ের ডায়রি কাহিনী অবলম্বনে লেখা হয় স্মৃতিচিত্র। এতে বেশ পাঁচ নম্বর বাড়ির মেয়েদের কথা আছে। যেমন উৎসবের সাজের কথা। দেবেন্দ্ৰপরিবারে মূর্তি পূজো বন্ধ হয়ে গেলেও গায়ে লাগানো পাশের বাড়িতে বেশ ঘটা-পটা করেই দোলদুর্গোৎসব হত। হবে নাই বা কেন? তখনকার কলকাতায় এই তো ছিল দস্তুর। প্রতিমা লিখেছেন :
প্ৰতি, উৎসবেই মেয়েদের তখন বিশেষ সাজ ছিল। বাসন্তী রঙে ছোপানো কালো পেড়ে শাড়ি, মাথায় ফুলের মালা, কপালে খয়েরের টিপ—এই ছিল বসন্ত পঞ্চমীর সাজ। দুর্গোৎসবে ছিল রঙবেরঙের উজ্জ্বল শাড়ি, ফুলের গয়না, চন্দন ও ফুলের প্রসাধন।
