নারীর দেহে এ ভবেতে হে
লভিয়া জনম আজিকে আমি।
মাতৃত্ব যে কি তাহা তো জেনেছি,
এ দেহ স্বার্থক হয়েছে স্বামী।
রেখ না মোরে ক্ষুদ্র মা করে
ধরণীতে কর গো পরিচিত,
সবারি যে মা হব গো হেথা
সে রূপে হয়ে পূর্ণ বিকশিত।
কল্যাণকামী মঙ্গলকামী
মাতৃরূপিনী আমায় হেরি
ধরার অন্যা পুত্র ও কন্যা
চারিপাশে মোর দাঁড়াক ঘেরি।
সংজ্ঞার অবিরাম তীর্থভ্রমণ, সাধুসঙ্গ, আশ্রমবাস ও বাঞ্ছিতের সন্ধানে অন্বেষণ শেষ হয়েছে এই সেদিন, পার্থিব জীবনের পরিসমাপ্তিতে।
এবার বলেন্দ্রের স্ত্রী সাহানার কথায় আসি। মাত্র তেরো বছরে বিয়ে হয়েছিল তার এবং যোলো বছরেই সব সাধ আহ্লাদ ঘুচিয়ে বিধবার শুভ্র সাজে সাজতে হল তাকে। দিন বদলেছে। তাই সাহানার বাবা ভেবেছিলেন মেয়ের আবার বিয়ে দেবেন। কিন্তু বিধবা বিবাহে মহর্ষির ঘোর আপত্তি। সম্মতি ছিল না উদারচেতা ঠাকুরবাড়ির একজনেরও। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লক্ষ্ণৌ গেলেন সাহানাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ফিরিয়ে আনতে। অথচ এর কয়েক বছর পরেই তিনি বিধবা বিবাহ সম্বন্ধে নিজের মত বদলান। সাহানার দুঃখ কোনদিনই ঘোচেনি। কবির সঙ্গেই শ্বশুরবাড়িতে ফিরে এলেন তিনি, মন দিলেন লেখাপড়ায়। স্কুলের পড়া শেষ করে পাড়ি দিলেন বিলেতে। ইচ্ছে ছিল হাতেকলমে কিছু ট্রেনিং নিয়ে আসা। এ সময় বাঙালী মেয়েদের অনেকেই বিলেত যাচ্ছেন। সরলাবালা-মিত্র সরকারী বৃত্তি নিয়ে কিংবা কুচবিহারের রাজকন্যা প্রতিভা ও সুধীর এবং লর্ড সিন্হার মেয়ে রমলা নিছক বেড়াবার উদ্দেশ্যে বিলেত পাড়ি দিচ্ছেন। সাহানাও গিয়েছিলেন। কোথাও কোন আলোড়ন না তুলে তিনি। আবার কিছুদিন পরেই দুর্বল স্বাস্থ্য নিয়ে ফিরে আসেন। অল্প কিছুদিন পরে মারা যান। সাহানার কথা ঠাকুরবাড়ির কেউ কোনদিন ভাবেননি, এমনকি রবীন্দ্রনাথও নয়। একথা ভাবলে সত্যি কষ্ট হয়। মনে হয় সকলের নিষ্ঠুর ঔদাস্যে সায়াহ্নের সকরুণ সাহানা হারিয়ে গেলেন অকালে।
১৩. প্রতিমা ঠাকুরবাড়িরই মেয়ে
প্রতিমা ঠাকুরবাড়িরই মেয়ে আবার ঠাকুরবাড়িরই বৌ। পাঁচ নম্বর আর ছ নম্বর, যারা কাছেই ছিল তাদের আরো কাছে এনে দিলেন তিনি। আসলে প্রতিমা বিনয়িনীর মেয়ে। সুন্দর ফুটফুটে মেয়েটিকে দেখে কবিপত্নী মৃণালিনীর খুব ভাল লেগেছিল। অন্তরঙ্গদের বলেছিলেন, এই সুন্দর মেয়েটিকে আমি পুত্রবধু করব। আশা করি ছোটদিদি তার নাতনীটিকে আমায় দেবেন।
অতি অকালে চলে যাওয়ায় মৃণালিনী তার ইচ্ছেকে কাজে পরিণত করতে পারেননি। তাই মুখ ফুটে কিছু বলার আগেই প্রতিমার বিয়ে হয়ে যায় গুণেন্দ্রের ছোটবোন কুমুদিনীর ছোট নাতি নীলানাথের সঙ্গে। তখন প্রতিমার বয়স সবে এগারো। এবাড়ির মেয়েদের একটু ছোট বয়সেই বিয়ে হত, প্রতিমারও হয়েছিল।
ফাল্গুন মাসে বিয়ে হল। বৈশাখ মাসে শুভদিন দেখে প্রতিমাকে শ্বশুরবাড়ির লোকেরা নিয়ে গেলেন। তার কয়েকদিন যেতে না যেতেই গঙ্গায় সাঁতার কাটতে গিয়ে জলে ডুবে মৃত্যু হল নীলানাথের। শ্বশুরবাড়ি থেকে অপয়া অপবাদ নিয়ে ফিরে এলেন প্রতিমা। এ ঘটনার পাঁচ বছর পরে, রথীন্দ্র বিলেত থেকে ফিরলে রবীন্দ্রনাথ প্রতিমার পুনর্বিবাহ দেবার প্রস্তাব করেন। স্ত্রীর মনোবাসনা তার অজ্ঞাত ছিল না, তাছাড়া বিধবা বিবাহের প্রতিবন্ধক মহর্ষি তখন পরলোকে। কবিও বাল্যবিধবাদের অবহেলিত জীবন ও দুভাগ্যের কথা চিন্তা করছিলেন। ঠিক সেই সময় ঢাকার গুহঠাকুরতা পরিবারের মেয়ে লাবণ্যলেখাও বিধবা হয়ে ফিরে এলেন। কন্যাসমা এই মেয়েটিকে বিয়ে দিয়ে আবার সংসারে ফিরিয়ে আনা যাবে না-কি? কবি পূর্বসংস্কার ভাঙবার জন্যে প্রস্তুত হলেন এবং তখনই স্থির করলেন নিজের ছেলের বিয়ে দেবেন বিধবার সঙ্গে। এছাড়া সমাধানের কোন পথ নেই। তিনি নিজে যদি নিজের ছেলের বিয়ে কোন বিধবার সঙ্গে না দেন তাহলে অন্য লোকে দেবে কেন? তিনি গগনেন্দ্রকে মনের কথা জানালেন।
তোমাদের উচিত প্রতিমার আবার বিয়ে দেওয়া। বিনয়িনীকে বলো যেন অমত না করে। ওর জীবনে কিছুই হল না। এ বয়সে চারিদিকের প্রলোভন কাটিয়ে ওঠা মুস্কিল। এখন না হয় মা বাপের কাছে আছে। এর পরে ভাইদের সংসারে কৃপাপ্রার্থী হয়ে থাকবে সেইটাই কি তোমাদের কাম্য? না, বিয়ে দেওয়া ভাল, সেটা বুঝে দেখ।
উদারহৃদয় গগনেন্দ্র তখনই রাজী হলেন। কিন্তু সমাজ রয়েছে। সমাজের কি সম্মতি পাওয়া যাবে? এ তো ব্রাহ্মসমাজ নয়। বিদ্যাসাগর ১৮৫৬-তে বিধবা বিবাহকে কাগজে-কলমে বৈধ করে গিয়েছেন। সমাজ সংস্কারের হিড়িকে কিছু বিধবার বিবাহ হয়েছে কিন্তু সাধারণ ভাবে এখনো সমাজে কেউ মেনে নিয়েছে কি? বিনয়িনী ভয় পেলেন :
আমাকে যে সমাজে একঘরে ঠেলবে। আমার আরও ছেলেমেয়ে আছে তাদের বিয়ে দিতে হবে।
ভয় পেলেন না গগনেন্দ্র। বললেন, তোমাদের ভয় নেই। তোমাদের পেছনে আমি আছি। তোমায় সমাজ ত্যাগ করলে আমিও সমাজ ত্যাগ করব। সমাজকে অগ্রাহ্য করে নিজে দাঁড়িয়ে থেকে প্রতিমার বিয়ে দিলেন গগনেন্দ্র। ঠাকুরবাড়িতে প্রথম বিধবা বিবাহ। অবশ্য ঠিক ঠাকুরবাড়ি বলা চলে না। মাত্র কয়েকমাস আগে পাথুরেঘাটা-ঠাকুরবাড়ির মেয়ে ছায়ার বিধবা বিবাহ হয়েছে। জোড়াসাঁকোতে প্রথম বিয়ে হল রথীন্দ্র ও প্রতিমার। কবি এর পরে লাবণ্যলেখার বিয়ে দিয়েছিলেন প্রিয় শিষ্য অজিত চক্রবর্তীর সঙ্গে। গগনেরে ইচ্ছে ছিল তার নিজের বিধবা পুত্রবধূ গেহেন্দ্রের স্ত্রী মৃণালিনীরও আবার বিয়ে দেবেন। মৃণালিনীর প্রবল আপত্তিতে তা সম্ভব হয়নি।
