জ্ঞানদানন্দিনীর একমাত্র ছেলে সুরেন্দ্রনাথ! চোখের মণি, আদরের দুলাল। তার বিয়ে দেবেন ডাকসাইটে সুন্দরীর সঙ্গে। যেখানে সুন্দর মেয়ে দেখতে পান তার সঙ্গেই সম্বন্ধ করেন। মাঝে মাঝে তাদের বাড়িতে এনে রেখে দিয়েছেন। ছেলের ঘোর আপত্তি বিয়েতে। কি আর হবে? কঁদতে কাঁদতে অনেক খেলনা দিয়ে সে মেয়েকে বিদায় দিতে হয়েছে। সুরেন্দ্রের বিয়ের কথা হয়েছিল কুচবিহারের রাজবাড়িতে। কেশব সেনের নাতিনী সুকৃতির সঙ্গে। তার মা সুনীতি দেবী। ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে এদের সম্বন্ধ-বন্ধুত্ব-হৃদ্যতা অনেক পুরনো। সুতরাং এ তো সুখের কথা! কিন্তু আপত্তি করেছিলেন মহর্ষি। তিনি ব্রাহ্মণ-অব্রাহ্মণের বিবাহের ঘোর বিরোধী। কাজেই হল না। সুকৃতির বিয়ে হল স্বর্ণকুমারীর ছেলে জ্যোৎস্নানাথের সঙ্গে। তিনি বিয়ে করেছিলেন সকলের অমতে! সুরেন্দ্র ও জ্যোৎস্না ছিলেন অভিন্নহৃদয় বন্ধু। যাক সে কথা! সুরেন্দ্রের বিয়ে ঠিক হল একেবারে হঠাৎ।
মহর্ষির প্রিয় শিষ্য প্রিয়নাথ শাস্ত্রীর মেয়ে সংজ্ঞা একদিন এসেছিলেন ভাইয়ের পৈতেয় নিমন্ত্রণ করতে। নাক মুখ টিকলো, কেবল চোখ একটু বসা, তাকে সকলেরি খুব পছন্দ হয়ে গেল। নলিনীর স্বামী সুহৃং চৌধুরী জ্ঞানদানন্দিনীকে বললেন, এই ত বেশ মেয়ে হাতের কাছে রয়েছে। একেই বউ করুন-না। জ্ঞানদানন্দিনী তো এককথায় রাজী। তাই হল। সবচেয়ে খুশি হলেন মহর্ষি। তিনি আনন্দের চোটে এক চামচ ভাত বেশি খেয়ে ফেললেন। বললেন, ঢালাও হুকুম রইল, এ বিয়েতে দেবী যা চায় তাই যেন হয়। দেবী হচ্ছেন সংজ্ঞার মা। আসলে সংজ্ঞার মা ইন্দিরাও ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, দ্বারকানাথ। ঠাকুরের সহোদর রাধানাথ ঠাকুরের বংশে শ্রীনাথ ঠাকুরের মেয়ে। তাঁর নিজের লেখা আমার খাতাও একটি সুখপাঠ্য বই।
বেশ ধূমধামের সঙ্গে বিয়ে হল। মায়ের জেদাজেদিতে বিয়ে করতে হল। বলে সুরেন্দ্র মেয়ে দেখেননি। সংজ্ঞার বয়সও তার তুলনায় খুব কম ৷ সুরেন্দ্রের একত্রিশ, সংজ্ঞার সবে বারো বিয়ে করতে যাবার আগে সুরেন্দ্র একবার। শুধু জিজ্ঞেস করেছিলেন ইন্দিরাকে, নেহাৎ বাচ্চা কি? বয়সের খুব পার্থক্য থাকলেও স্ত্রীকে পরম স্নেহে গ্রহণ করলেন সুরেন্দ্র। শুরু করলেন লেখাপড়া শেখাতে! তিনি নিজে খুব ভাল অনুবাদ করতে পারতেন। ইংরেজী বই খুলে একবারও না থেমে এমন সহজ বাংলায় বলে যেতেন যে বোঝাই যেত না মুখে মুখে অনুবাদ করছেন। ক্রমে সংজ্ঞাও শিখলেন অনুবাদ করতে। না, ইংরেজী গল্প নয়, তিনি গোটাকতক জাপানী গল্প অনুবাদ করেন। তার মধ্যে দুটো গল্প। মৎসুয়ামার আয়না ও ইউরিশিমা ছাপা হয় পুণ্য পত্রিকায়। হয়ত এ অনুবাদে সুরেন্দ্রেরও হাত ছিল নয়ত প্রথমেই অমন সহজ স্বচ্ছ সাবলীল ভঙ্গিটি আয়ত্ত করা কঠিন। সংজ্ঞার অনুবাদকে তর্জমা বলে মনেই হয় না। জাপানী গল্প অনুবাদের এই দক্ষতা ছিল সুরেন্দ্রেরও। তিনি জাপানী ঐতিহাসিক গল্প একটি বসন্ত-প্রাতের প্রস্ফুটিত সকুরা-পুষ্প অনুবাদ করে উৎসর্গ করেন সংজ্ঞাকে। এ ব্যাপারে সংজ্ঞা একটু উৎসাহী হলে আরো কিছু জাপানী গল্পের অনুবাদ সেযুগেই আমাদের হাতে এসে পৌঁছত।
ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য বৌয়েদের মতো সংজ্ঞাও ভাল অভিনয় করতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে চলে গেলেও অভিনয়ের জন্যে প্রায়ই ডাক পড়ত ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বৌয়েদের। অভিনয়ে তাদের দক্ষতা তপন কিংবদন্তী। শান্তিনিকেতনের শিল্পীগোষ্ঠী ভাল করে তৈরি হয়নি। কলকাতায় বিসর্জনের অভিনয় হবে। তোড়জোড় চলছে। কবির বয়স হার মানল তার উৎসাহের কাছে। তিনি নিজে সাজলেন জম্নসিংহ। অপর্ণার ভূমিকায় চমৎকার অভিনয় করলেন সংজ্ঞার এক মেয়ে মঞ্জু শ্রী! আর সংজ্ঞা নিজে সাজলেন গুণবতী। এ অভিনয় ঘরোয়া মঞ্চে বা জোড়াসাঁকোর উঠোনে সখের অভিনয় নয়। রীতিমতো টিকিট বিক্রী করে এম্পায়ার থিয়েটারে তিন দিন অভিনয় হয়। প্রত্যক্ষদর্শী সৌম্যেন্দ্রনাথের ভাষায় গুণবতীর ভূমিকায় আমার কাকী সংজ্ঞাদেবীর অভিনয় হয়েছিল অনবদ্য। কিন্তু যেমন সাহিত্যচর্চা, তেমনি অভিনয় দক্ষতা থাকলেও কোন কিছুতে মন ছিল না সংজ্ঞার। কোথায় যেন ছিল আশ্চর্য নিরাসক্তি। জ্ঞানদানন্দিনী অনুযোগ করতেন, সংজ্ঞা সাজে না। সুরেনের খাওয়া দেখে না। কিন্তু প্রশ্রয় ছিল সুরেন্দ্রের। তিনি সংজ্ঞাকে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছেন নানান জায়গায় নিয়ে গেছেন ভগিনী নিবেদিতার কাছে।
প্রিয়নাথ শাস্ত্রীর আধ্যাত্মিক অধিকারী হয়েছিলেন সংজ্ঞা। সংসারের প্রতি আসক্তি কম। বড় ঘর বিপুল সংসার-শ্বশুর-শাশুড়ী স্বামী ছটি সন্তান নিয়ে ভরাভর্তি সুখ তবু আসক্তির বন্ধনটা যেন সংজ্ঞার জীবনে শিথিল হ৪ে আসে। মা ছাড়াও তার ছেলেমেয়েদের অন্য সঙ্গী ছিল, ছিলেন স্নেহময়ী জ্ঞানদানন্দিনী, এবং স্নেহময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। তারপর আসে একটি পরমলগ্ন। ডায়মণ্ডহারবারে নদীর ঢেউ দেখতে দেখতে তিনি এক দিব্য অনুভূতি লাভ করলেন। এক উজ্জ্বল জ্যোতির্মণ্ডল যেন তাকে দিল এক পরম আনন্দময় চিন্ময় সত্তার সন্ধান। চির বৈরাগ্যের সুর এসে বাজল সংজ্ঞার মনে।
পরের ইতিহাস সংক্ষিপ্ত। স্বামীর মৃত্যুর পর সংজ্ঞা সংসার ত্যাগ করে চলে গেলেন চির বৈরাগী সাধুদের চরণচিহ্ন অনুসরণ করে। বাধা পাননি বিশেষ। বাঞ্ছিতের সন্ধানে যার যাত্রা শুরু, তাকে বাধা দেবে কে? এলাহাবাদে ঈপ্সিত গুরু সচ্চিদানন্দ সরস্বতীর কাছে দীক্ষা নিয়ে সন্ন্যাস গ্রহণ করলেন সংজ্ঞা। গৃহজীবনের শেষ বন্ধন নামটুকু জীর্ণ পাতার মতো খসে পড়ল তার জীবন থেকে। মুছে গেল ঠাকুরবাড়ির বৌটির পরিচয়। নতুন নাম হল স্বরূপানন্দ সরস্বতী। মুণ্ডিতমস্তক গৈরিকধারিণী সংজ্ঞা হরিদ্বারে পেলেন নতুন জীবন। কাশীতে দেখেছিলেন অসীমানন্দ সরস্বতীকে—তার প্রতিষ্ঠিত রামচন্দ্রপুরের আশ্রমেও থেকেছেন অনেকদিন। মাঝে মাঝে যেতেন তীর্থে। তার আধ্যাত্মিক জীবনের তীব্র ব্যাকুলতা প্রকাশ পেয়েছে এসময়ে লেখা কয়েকটি কবিতায়। কবিতাগুলি সংকলিত হয়েছে কৃপাকণা বইতে। সংজ্ঞার কবিতা পড়লে বোঝা যায় প্রাণের তীব্র ব্যাকুলতা তাঁকে কোথায় উপনীত করেছে। ছটি সন্তানের জননী হয়েও মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা তার মেটেনি কারণ তিনি চেয়েছিলেন সকলের মা হয়ে উঠতে। অনুভূতি, পরপারের সুর, হৃদয়নাথ, আঁধারে, প্রেমবৃষ্টি, মা, আনন্দমিশন, বন্দনা সব কবিতাই আধ্যাত্মিক সুরে বাঁধা। সহজ-সরল প্রাণের আকূতি বলেই পূর্ণমা বোধহয় সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে। কৃপাকণাএখন দুষ্প্রাপ্য তাই কবিতাটি সম্পূর্ণ আকারেই এখানে উদ্ধৃত করা হল। ছোট্ট কবিতা :
