কবিপত্নী একবার সাধ করে সোনার বোতাম গড়িয়েছিলেন কবির জন্মদিনে কবিকে পরাবেন বলে। কবি দেখে বললেন, ছি ছি ছি, পুরুষে কখনো সোনা পরে—লজ্জার কথা, তোমাদের চমৎকার রুচি। কবিপত্নী সে-বোতাম ভেঙে ওপাল-বসানে বোতাম গড়িয়ে দিলেন। দু-চার বার কবি সেটি ব্যবহার করেছিলেন যেন দায়ে পড়ে।
জ্ঞানবৃদ্ধ আপনভোলা চিরশিশু দ্বিজেন্দ্রনাথের কথাও কম নেই। দুবেলা তার খাবার সময়ে একটা না একটা গোলযোগ লেগেই থাকত। মোচার ঘন্টে গরম মশলার গন্ধ পেয়েই তিনি হুলস্থুল কাণ্ড বাঁধিয়ে দিতেন, কোথা থেকে কতকগুলো মাথাঘসা বেটে মোচার ঘন্টে ঢুকিয়েছ। কিছু জান না কি করে রাঁধতে হয়। কিংবা
বৈকালে গরম লুচি ভেজে সামনে এনে দিয়েছে। লুচিতে হাত ঠেকিয়েই বললেন, এ কি লুচি? ঘি চপচপ করছে লুচির সারা গায়ে, আমার হাতশুদ্ধ নষ্ট হল ঘি লেগে। লুচির প্লেট আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, যাও, জল দিয়ে লুচি ভেজে আন। ঘি দিয়ে বুঝি লুচি ভাজে?
হেমলতা একটু পরে ঘিয়ের বদলে শুকনো ময়দা দিয়ে বেলে লুচি ভেজে আনলেন। এবার ঠিক হয়েছে দেখা গেল। লুচির গায়ে ঘি লেগে নেই একটুও। খুশি হয়ে দ্বিজেন্দ্র বললেন, এই তো ঠিক হয়েছে, দেখলে জল দিয়ে ভেজে কেমন হল। খাওয়ার পরে হেমলতা গল্পচ্ছলে শোনালেন লুচি ভাজার ইতিহাস। তখন সে কি হাসি, তাই তো, গরমজলে ময়দা দিলে গুলে কাই হয়ে যাবে তো বটেই। আচ্ছা কাণ্ড আমার, কি বলতে কি বলি, তোমাদের জ্বালিয়ে মারি। তোমরা যা ভাল বোঝ তাই কর–
হেমলতা না থাকলে এ রকম অনেক ছবিই হারিয়ে যেত। হয়ত খুব বড় গোছের ক্ষতি হত না কিন্তু সেই বিশাল মহাপ্রাণ ব্যক্তিদের অনেকখানি ব্যক্তিত্ব রইত ঢাকা। কোন পুরুষ কি আমাদের কাছে পৌঁছে দিতে পারতেন ঠাকুরবাড়ির এই আটপৌরে অনাবৃত রূপ?
দ্বিজেন্দ্ৰপরিবারে সুশীলা, হেমলতা ছাড়াও বধূরূপে এসেছিলেন অরুণেরে দুই স্ত্রী চারুশীল ও সুশোভিনী, নীতীন্দ্রনাথের স্ত্রী সুহাসিনী, সুধীন্দ্রনাথের স্ত্রী চারুবালা এবং কৃতীন্দ্রনাথের দুই স্ত্রী সুকেশী ও সবিতা। সুশীলার মতো চারুশীলা ও সুকেশীর অকালমৃত্যু হয়। চারুশীলা ছিলেন সুশীলারই বোন। অন্যান্যরাও তাদের পারিবারিক গণ্ডির সীমা ছাড়িয়ে এমন কিছুই করেননি যে স্বতন্ত্রভাবে উল্লেখ করা চলে। বরং সুধীন্দ্রের স্ত্রী চারুবালা ওই পারিবারিক পরিবেশেই ছেলেমেয়েদের মনে স্বাদেশিকতা সঞ্চারের চেষ্টা করেন। তখন বাংলাদেশের আকাশে বাতাসে দেশপ্রেমের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে। চারুবালা প্রত্যক্ষভাবে কোন আন্দোলনে জড়িয়ে না পড়ে ছেলেমেয়েদের স্বদেশী জিনিষ ব্যবহার, দেশপ্রেমের গান শেখাতেন। তাঁর শিক্ষা যে ব্যর্থ হয়নি তার পুত্র সৌম্যেন্দ্রনাথের বিদ্রোহী মনোভাবই তার প্রমাণ। তবে একটা কথা বলা ভাল। এ সময় ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা আর বাংলায় নারী সমাজের নেত্রী হয়ে নেই। কয়েকজন প্রতিভাময়ী নিশ্চয় আছেন কিন্তু তাদের পরিধিও সংকীর্ণ। ঠাকুরবাড়ির সম্বন্ধে এমন একটা ধারা বা ধারণা গড়ে উঠেছে লোকের মনে। সে ধারণা শ্রদ্ধা ও বিস্ময় মেশা। কিন্তু এখন আর বাংলায় গুণবতী মেয়ের সংখ্যা কম নয়। শিক্ষা, শিল্প, বিজ্ঞান সব দিকেই তাদের ভূমিকা স্পষ্ট। বরং ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সে পথ থেকে কিছুটা দূরে সরে এসে নিরালায় শিল্পসাধনা নিয়ে মেতে উঠেছেন, কারণ বাংলার শিল্পজগৎ তখন সম্পূর্ণভাবে সমৃদ্ধ হয়নি।
সুকেশী থাকতেন শান্তিনিকেতনেএই হাসিখুশি মিশুকে বৌটি তার মধুর ব্যবহার দিয়ে সকলকে আপন করে নিয়েছিলেন। এ সময় রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতন—বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা করায় ঠাকুরবাড়ির অনেকেই চলে এলেন শান্তিনিকেতনে। জোড়াসাঁকোর বাড়ি ক্রমশই যেন তার মহিমা হারাচ্ছিল। সেটাই স্বাভাবিক। কারণ, উনিশ শতকে প্রাধান্য বিস্তার করেছিল এই বিশাল বাড়িটি, বিশ শতকে বিশ্ববিখ্যাত হয়ে উঠলেন এই বাড়িরই একটি মানুষ—একক ব্যক্তিত্ব প্রাধান্য লাভ করল। তাই শান্তিনিকেতনে গড়ে উঠতে লাগল ঘরোয়া পরিবেশ। মেয়ের গড়লেন অলাপিনী সভা—আনন্দমেলা। বেরোতে শুরু করল হাতেলেখা মেয়েলি পত্রিকা শ্রেয়সী, ঘরোয়া আরো কত কী! ইন্দিরা, হেমলতা সবাই জমিয়ে বসলেন সেখানে। সুকেশীও মিশে গিয়েছিলেন সবার সাথে। যখনি দরকার পড়ত এগিয়ে আসতেন হাসিমুখে। কখনো বাড়ির মেয়েদের মিলে থিয়েটার করতেন, কখনো নানারকম বরঠকানো রান্না করে লোকেদের ঠকাতেন। একবার ক্ষিতিমোহন সেনকে ঠকিয়েছিলেন কুমড়ো কেটে তৈরি করা চাপা ফুল দিয়ে। অল্প কয়েকদিনের ইনফ্লুয়েঞ্জা জ্বরে সুকেশী। চিরবিদায় নিলেন। কৃতীন্দ্রের পুনর্বিবাহ হয় সবিতার সঙ্গে। সবিতা ভাল ছবি আঁকতে পারতেন। ১৩২৯ সালের শ্রেয়সীর পাতায় তাঁর আঁকা কিছু ছবি ছাপা হয়েছিল। এ প্রসঙ্গে হেমেন্দ্রনাথের পুত্রবধূদের কথাও সেরে নেওয়া যেতে পারে। হিতেন্ত্রের স্ত্রী সরোজিনী, ক্ষিতীন্দ্রের স্ত্রী ধৃতিমতী ও সুহাসিনী এবং ঋতেন্ত্রের স্ত্রী অলকা এসেছেন ঠাকুরবাড়িতে। তবে তিন ভাইয়ের কেউই তাদের বাবার মতো নারী প্রগতি বা স্ত্রীশিক্ষায় উৎসাহী ছিলেন বলে মনে হয় না। বরং এ সময় যেন ঠাকুরবাড়ি একটু বেশি মাত্রায় রক্ষণশীল এবং পর্দানশীন হয়ে পড়েছিল। অবশ্য এরই মধ্যে নানারকম শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন সুরেন্দ্রের স্ত্রী সংজ্ঞা, বলেন্দ্রের স্ত্রী সুশী বা সাহানা এবং রথীন্দ্রের স্ত্রী প্রতিমা।
