বাংলা দেশের ছোট বড় নানা গ্রামে পল্লীতে তুমি ভ্রমণ করেছ, সেই উপলক্ষ্যে তোমার দৃষ্টিশক্তি তোমার অভিজ্ঞতাকে বিচিত্র করে তুলেছে, তোমার গল্পগুলি সেই অভিজ্ঞতার চিত্র প্রদর্শনী।
ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বৌদের মধ্যে স্বর্ণকুমারীর পর মৌলিক গল্প লিখে এতখানি সম্মান বোধহয় হেমলতাই পেলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকে সম্মান জানিয়েছিল সর্বপ্রথম লীলা পুরস্কার দিয়ে। হেমলতার গল্পের সঙ্গে স্বর্ণকুমারীর লেখার সাদৃশ্য নেই, বরং যোগ আছে লাহোরিনী শরৎকুমারীর গল্পের। দুজনেরি স্বচ্ছ সরস জীবনদৃষ্টি তাঁদের গল্পে উদ্ভাসিত। তবে হেমলতার কবিতার মতোই গল্পগুলোও জটিলতাবর্জিত। তার গল্পের চরিত্র, ঘটনা, সংলাপ সবই অতি সহজ, স্বাভাবিক, অনাড়ম্বর। অধিকাংশ গল্পেই আছে হেমলতার বাস্তব অভিজ্ঞতা। বিধবা আশ্রম দেখা শোনার সময় তিনি অনেকের সুখ-দুঃখের সঙ্গে পরিচিত হন।
হলে চন্দ্রমণি গল্পের নায়িকাকে আঁকতে পারতেন না। দারিদ্র্যের জ্বালা সহ্য করতে না পেরে কুমারী মেয়েকে বিধবা সাজিয়ে আশ্রমে পাঠানো তৎকালীন লেখিকাদের কলমে আঁকা সম্ভব ছিল না। অভিজ্ঞতাই তাকে বহু বিচিত্র পরিস্থিতির সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে।
হেমলতাকে প্রকৃত সমাজ সেবিক। বললেই বোধহয় তার যথার্থ পরিচয় দেওয়া হয়। ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য মেয়েরাও সাহিত্য, সঙ্গীত চর্চার সঙ্গে সঙ্গে সমাজসেবা করেছেন। কিন্তু হেমলতার প্রধান লক্ষ্য ছিল নারী কল্যাণ। সখিসমিতি, বিধবা শিল্পাম কিংবা ভারত স্ত্রীমহামণ্ডলের সঙ্গেই তার যোগ বেশি। তিনি নিয়েছিলেন সরোজনলিনী নারীমঙ্গলসমিতি ও পুরীর বসন্তকুমারী বিধবা-আশ্রমের ভার। আশ্রম পরিচালনার সময় হেমলতা যে সংগঠনী শক্তির পরিচয় দিয়েছিলেন তার তুলনা বোধহয় চলে শুধু ভারত স্ত্রীমহামণ্ডলের কৃষ্ণভামিনী দাসের সঙ্গে।
সরোজনলিনী আশ্রম প্রতিষ্ঠা হয় ১৯২৫ সালে। তার কিছুদিন পরে গুরুসদয় দত্তের অনুরোধে হেমলতা এর ভার নেন। পরে তিনি দেখলেন নারীশিক্ষাসমিতির জন্যে অবলা বসু, হিরন্ময়ী শিল্পাশ্রমের জন্যে স্বর্ণকুমারী ও ভারত স্ত্রীমহামণ্ডলের দেখাশোনার জন্যে সরলা আছেন কিন্তু সরোজনলিনীর জন্যে কেউ নেই। তাই সে ভার তাকেই নিতে হল। নারীশিক্ষা ও কল্যাণের আদর্শে নিজেকে একেবারে সঁপে দিয়ে তিনি খুঁজেছিলেন, মেয়েদের সত্যিকারের অধিকার কোথায় খর্ব হয়েছে। নিজে কঠোর বৈধব্য জীবন যাপন করলেও মেয়েদের মৌল সমস্যা অনুসন্ধানের সময় সংস্কারমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দিয়েছেন। মেয়েদের স্বাধীনতা কি এবং কাকে বলে সেকথাও তিনি খুব সংক্ষেপে জানাতে পেরেছেন। পুরুষের সঙ্গে অবাধে মিলতে মিশতে পারাকেই তিনি স্ত্রী-স্বাধীনতা নাম দিতে নারাজ। পুরুষকে শুধু পুরুষ বলেই জেনে যে মেয়ে পুরুষের সঙ্গে মেলামেশার জন্যে লালায়িত, সে মেয়ে অশিক্ষিত। পুরুষকে যিনি পুরুষের অতিরিক্ত মানুষ বলে দেখতে ও চিনতে শিখেছেন তিনিই প্রকৃত শিক্ষিত। তবে বাঙালী মেয়েদের স্বাধীনতা স্পৃহাকে যারা বাঁকা চোখে দেখেছেন তাদের ভুলও ভেঙে দিতে চেয়েছেন হেমত। বাঙালী মেয়েরা পুরুষের সঙ্গে মেশবার লালসায় স্বাধীনতা চাননি। তাদের সত্যিকারের অধীনতা হচ্ছে দায়ভাগে অনধিকার।
য়ুরোপে নারীমুক্তি আন্দোলনের কথা শুনে উৎসাহিত হয়ে হেমলতা দেখতে গিয়েছিলেন সেখানে নারীমুক্তি আন্দোলন কি ভাবে সফল হয়েছে এবং স্বাধীনতার প্রকৃত স্বরূপ কি? অনেক দেশ ঘুরে তিনি যখন ভারতে ফিরে এলেন তখনও তার এ সম্বন্ধে কোনো ধারণার পরিবর্তন দেখা যায়নি। নারীর আদর্শ তার কাছে ত্যাগ-তিতিক্ষা-সংযম ও পরহিত। সেই আদর্শেই তিনি মেয়েদের অনুপ্রাণিত করেছেন। তার একাধিক প্রবন্ধে এই কথাই বলা হয়েছে। সমাজসেবিকা হিসেবে স্বর্ণকুমারী, হিরন্ময়ী, সরলা, কৃষ্ণভামিনী দাস, অবলা বসু, চারুশীলা দেবী, মোহিনী সেন ও আরো অনেকেই ছিলেন, এঁদের মধ্যে হেমলতা ছিলেন মধ্যমণি হয়ে। সব আশ্রমেই তার ডাক পড়ত। হাসি মুখে এগিয়ে যেতেন সবার কাছে। মিশে যেতেন সবার সঙ্গে। অন্তরের অভিজাত শুদ্ধতাবোধের সঙ্গে মিশত প্রাণের আবেগ।
এখনও যে মাঝে মাঝে আমরা হেমলতার কথা মনে করি তার কারণ কিন্তু সমাজসেবা নয়, তার লেখা স্মৃতিকথা। না, ঠাকুরবাড়ির ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তিনি নিজের আত্মকাহিনী লেখেননি। কিন্তু ঘরোয়া আটপৌরে ভঙ্গিতে এমন কয়েকটা প্রবন্ধ লিখেছেন যার মধ্যে মিশে আছে রম্য ব্যক্তির স্বাদ। নিজের জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা লিখে রাখার ইচ্ছে তার ছিল না। কিন্তু যাদের সংস্পর্শে এসে তার জীবন ধন্য হয়ে উঠেছিল, সেই স্পর্শমণির মতো কয়েকজন ব্যক্তিকে প্রবন্ধের মধ্যে ধরে রেখেছেন হেমলতা। না রেখে পারেননি। স্মৃতিকথা, ছোঁয়া থাকলেও এই প্রবন্ধগুলো লেখবার সময় নিজেকে সম্পূর্ণ। অপরিচয়ের দূরত্বে সরিনে রাখার কৃতিত্ব অস্বীকার করা যায় না। রবীন্দ্রনাথের বিবাহবাসর, বৈশাখের রবীন্দ্রনাথ, সংসারী রবীন্দ্রনাথ, আশ্চর্য মানুষ রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথের অন্তমুখীন সাধনার বারা—কবিকে বুঝতে খুব বেশি সাহায্য করে। কবি নিজেও স্বীকার করেছেন রচনাগুলি অতি সুপাঠ্য। রবীন্দ্রজীবনসন্ধানীর কাছে হেমলতার প্রবন্ধগুলি অমূল্য সম্পদ হয়ে আছে। দু একটা ছবি দেখা যাক। হেমলতা লিখেছেন :
