হেমলতা তখন নতুন বৌ নন। তাই বললেন, সুফীরা মহাতাপস, তবে কোন কিছু হাওয়াইওয়ি চবে না রাজা রামমোহনের যুগে। কোন একটা কোঠায় ঢোকা যায় কি করে?
কবি শুনে খুশি হয়েছিলেন, কথা ঠিক। তোমার ওপর রাজা রামমোহনের আশীর্বাদ আছে দেখছি।
মহর্ষির আশীর্বাদও পেয়েছিলেন হেমলতা। বলেরে মৃত্যুর পর পারিবারিক ধর্মালোচনার সময় তার আগ্রহ, উৎসাহ এবং পৃথক ধর্মসাধনার কথা মহর্ষি শুনতে পান ও হেমলতার সঙ্গে প্রতিদিন দুপুরে একঘণ্টা ধর্মালোচনা করতে আরম্ভ করেন। এভাবেই কাটে দীর্ঘ সাত বছর।
মৃত্যুর আগে নাতবৌয়ের ধর্মবিশ্বাস ও ভগবৎ ভক্তির প্রতি আস্থার নিদর্শন রূপে মহর্ষি তাকে দিয়ে যান নিজের দীক্ষার আংটিটি। হেমলতা একথা জানতেন না। মহর্ষির মৃত্যুর পরে তাঁর খাজাঞ্চী যদুনাথ চট্টোপাধ্যায় আংটিটি হেমলতাকে দিয়ে বলেন, কর্তামহাশয় ইহা আপনাকে দিবার জন্য আমাকে বলিয়া গিয়াছেন এবং বলিয়াছেন আপনিই ইহার প্রকৃত অধিকারী। হেমলতা অনেকদিন এই আংটি পরেছিলেন, পরে আংটিটি শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবনে রাখা হয়। এই ঘটনা থেকেই প্রমাণ পাওয়া যায় হেমলতা ছিলেন সবার থেকে স্বতন্ত্র এবং মহর্ষির জীবন-সাধনার যোগ্যতম উত্তরাধিকারিণী। এ সময় ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বিভিন্ন দিকে এঁকে দিচ্ছেন নিজেদের সাফল্যের পরিচয় আর হেমলতা নীরবে নিভৃতে দিচ্ছেন ধর্ম উপদেশ। এই উপদেশগুলি পুস্তিকার আকারে ছাপা হয়েছিল। পরমাত্মায় কি প্রয়োজন, সৃষ্টি ও স্রষ্টা কাহার নাম, চৈতন্যময় পূর্ণ ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বর কাহার নাম, সত্য লাভের উপায় কি প্রভৃতি উপদেশে ব্রাহ্মধর্মের সারসত্য নিহিত আছে। ধর্ম সম্বন্ধে হেমলতার যেমন গোঁড়ামি ছিল না তেমনি সর্বধর্মের প্রতি ছিল তার আন্তরিক শ্রদ্ধা। রামকৃষ্ণ মিশনের সন্ন্যাসীরা হেমলতার বক্তৃতা শুনে আনন্দিত হতেন। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের জন্মশতবর্ষপূর্তি উৎসবে যোগ দিয়ে তিনি ঠাকুরকে ব্যাখ্যা করেছিলেন, সহজ আনন্দের উৎস শিশু ভোলানাথ রূপে।
ধর্মচর্চার সঙ্গে সঙ্গে হেমলত করেছেন সাহিত্যচর্চা এবং সমাজসেবা। এ কাজেও তিনি কোন বাধা পাননি। মেয়েদের বাধা ক্রমশই অপসারিত হচ্ছিল। তার ওপরে তিনি ধর্মপ্রাণ, সুশিক্ষিত এবং ধনী-ঘরনী। সব কাজের মধ্যেও বাড়ির সবার জন্যে সর্বদা ব্যস্ত থাকত তার দুit সেবানিপুণ হাতের প্রাণঢালা শুশ্রুষা। কি করে যে এত কাজ তিনি করতেন কে জানে? গল্প-কবিতা-প্রবন্ধনাটিকা-শিশুপাঠ্য বই-স্মৃতিকথা-গান বলতে গেলে সবই লিখেছেন হেমলতা। এর ওপর ছিল বঙ্গ লক্ষ্মী পত্রিকা সম্পাদনা, সরোজনলিনী ও বসন্তকুমারী বিধবা আশ্রমের ভার। ছিল শান্তিনিকেতনের ছেলেদের দেখাশোনার ভার। প্রথমে তার সাহিত্যচর্চার কথাটাই সেরে নেওয়া যেতে পারে। ঠাকুরবাড়িতে এসে অনেকেই লেখিকা হয়েছেন কিন্তু হেমলতার সাহিত্যবোধ ছিল সহজাত। এ বাড়ির বৌ হয়েও তার নিজস্বতা তিনি হারাননি। তাই তাঁর গল্পে পাওয়া যাবে ভিন্ন সুরের সন্ধান, তবে প্রবন্ধ-স্মৃতিকথায় তিনি ঠাকুরবাড়ির বিশেষ ভঙ্গিটিকেই গ্রহণ করেছেন।
হেমলতার কবিতার বই প্রকাশিত হয়েছে মাত্র তিনটি—জ্যোতিঃ, অকল্পিতা ও আলোর পাখি। এছাড়াও অনেক কবিতা এখনও পত্র-পত্রিকায়। ছড়িয়ে আছে। রবীন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথ হেমলতার কয়েকটা কবিতায় সুর দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সুর দেওয়া গান হল ওহে সুনির্মল সুন্দর উজ্জ্বল শুভ্র আলোকে ও বালক প্রাণে আলোক জালি। জ্যোতিরিন্দ্র সুর দিয়েছিলেন। আমি আর কিছু না জানি কবিতায়। এঁরা ছাড়াও হেমলতার গানের সুর ও স্বরলিপি করেছেন ইনিরা, ও বিখ্যাত গায়ক সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।
হেমলতার সব কবিতাই ভগবৎ-প্রেমে সিক্ত। ছোট ছোট কবিতায় গভীরতার ছাপ স্পষ্ট কিন্তু কোথাও দুর্বোধ্য বা জটিল নয়। কোথাও নেই রূপ ও রূপকের ঠোকাঠুকি, প্রতীক ও ইঙ্গিতের ব্যঞ্জনা কিংবা চিত্রকল্পের সুমিত আভাস। তবু কি যেন আছে। অন্তর ও বাইরের চেতনাকে তিনি এক করে দেখতে চেয়েছেন। এই দেখার মধ্যে আছে তার নিজস্ব অনুভব :
অন্তরে চেতনা অনুভবে
বাহিরে সে ধরে
নানামত রূপ,
অন্তরে বাহিরে নেহারে যে তারে
ঘুচে তার ভব–
বন্ধনের দুখ।
হেমলতার সব কবিতাই আজকের তুলনায় বড় বেশি সরলীকৃত তবে ১৯১০১২ সালে এ জাতীয় কবিতার আদর ছিল। রবীন্দ্রানুসারী কবিগোষ্ঠী ছাড়াও এরকম কবিতা লিখতেন প্রিয়ম্বদা দেবী, কামিনী রায়, অনুদাসুন্দরী দেবী, মানকুমারী বস্তু আরো অনেকে। আসলে পারিবারিক সুখদুঃখ, প্রকৃতি এবং ঈশ্বর এই ছিল মেয়েদের কবিতার জগৎ এবং ছিল অনেকদিন। তখনও গদ্য কবিতা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়নি। ভাব এবং কাব্যভাষাতে রাবীন্দ্রিক ছাপই বেশি ছিল। কবি হেমলতার কবিতা পড়তে ভালবাসতেন। স্কুলপাঠ্য কাব্য পরিচয়ে তিনি হেমলতার একটা কবিতাও যোগ করেন।
দুনিয়ার দেনা আর দেহলি হেমলতার লেখা গল্পের বই। প্রথমটির গল্পগুলো অনেকটা লিপিকাধর্মী তবে দার্শনিক চিন্তায় ভরা। কামিনী রায় গল্প পড়ে অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। এবং সেই সঙ্গে অনুভব করেছিলেন হেমলতার সাহিত্য সাধনায় অনুমান আর কল্পনার চেয়ে জীবনের অভিজ্ঞতা অনেক বেশি কার্যকর হয়েছে। কথাটা সত্যি, মেয়েদের লেখায় অভিজ্ঞতার অভাব একটা মস্ত বড় জিনিষ। তাই অনেক জিনিষই সত্য হয়েও বাস্তব হয়ে ওঠে না। হেমলতার সেই অসুবিধে ছিল না। তিনি সমাজসেবার জন্যে বিভিন্ন মানুষকে দেখেছিলেন, পর্যবেক্ষণ করেছিলেন আপন অসামান্য অন্তদৃষ্টি দিয়ে, তাই মুগ্ধ করতে পেরেছিলেন কথাকোবিদ রবীন্দ্রনাথকে। যিনি মেয়েদের লেখা পছন্দ করতেন না। তিনিও দেহলি পড়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে লিখেছিলেন একখানি অনবদ্য চিঠি। লিখেছিলেন :
