গাছ ভরে বেল জুই ফুটতে লাগল, সকালে উঠে লাল রাস্তার উপর শিশির ভেজা শিউলি ফুল বিছিয়ে আছে দেখতে পেতুম, বাতাসে দূর থেকে চামেলির গন্ধ ভেসে আসত, তখন আর আমার কোন দুঃখ রইল না। মনে হত এরা। আমাকে যথেষ্ট প্রতিদান দিয়েছে। কেননা কোন কাজে যখন আমি মন বসাতে পারছিলুম না, তখন এই বাগানের নেশা আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল।
লেখার অনেক আগে মীরা রবীন্দ্র নির্দেশে কয়েকটি দেশী-বিদেশী। ইংরেজী প্রবন্ধের সর সংকলন করেন। আটটি ছাপা হয় প্রবাসীতে এবং তিনটি তত্ত্ববোধিনীতে। এছাড়া দীর্ঘ জীবনে মীর। শান্তিনিকেতনে বাস করলেও, বলতে গেলে কিছুই করেননি। মীরার সঙ্গে সঙ্গেই মহর্ষির নাতনীদের কথা বলার পালাও ফুল। এবার আসা যাক, এ বাড়ির নতুন-আসা বৌয়েদের কথায়। মেয়েরা যেমন ঠাকুরবাড়ির নিজস্ব সংস্কৃতিকে নিয়ে গিয়েছিলেন ভিন্ন পরিবারে তেমনি ভিন্ন পারিবারিক ঐশ্বর্যের গরিমা নিয়ে এসেছিলেন আরও কয়েকটি মেয়ে। তবে সকলে তো আর সমান প্রতিভার অধিকারী হতে পারেন
তাই যারা বিশেষ গুণ বতীরূপে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন তাদের কথাই বলব। এ সময়ে ঠাকুরবাড়িতে যারা বৌ ছয়ে এসেছিলেন এঁদের মধ্যে তিনজনের নাম সবচেয়ে বেশি শোনা যায়। এই তিনজন হচ্ছেন হেমলতা, প্রতিমা ও সংজ্ঞা।
১২. হেমলতা দ্বিজেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ
হেমলতা দ্বিজেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠ পুত্রবধূ। দ্বিপেন্দ্রনাথের দ্বিতীয় স্ত্রী। দ্বিপেন্দ্রর প্রথমা স্ত্রী সুশীলা তার জীবনের স্বল্প অবকাশে অন্দরমহলকে হাসিয়ে-কাঁদিয়ে চলে গেছেন। বাংলা দেশের এক গ্রাম থেকেই বোঁ হয়ে এসেছিলেন সুশীল ও তাঁর বোন চারুশীলা, দু বোনের কেউই বেশিদিন বাঁচেননি। সুশীলা ভাল গান ও অভিনয় করতে পারতেন। প্রফুল্ল মন্ত্রী তার স্মৃতিচারণের সময় জানিয়েছেন যে, যে কোন গানই তিনি এমন ভাব নিয়ে গাইতেন যে লোকে মুগ্ধ হত। সুশীলার ছেলে দিনেন্দ্রর গানেও এই বৈশিষ্ট ছিল। সুশীলা অভিনয় করেছেন ঠাকুরবাড়ির সেই সোনালি পর্বে। বিবাহ-উৎসব নাটিকায় তিনিই সাজতেন নায়ক। তার একটা গান ও কেন চুরি করে চায় তখন খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। অবশ্য এই জনপ্রিয়তা ঠাকুরবাড়ির বাইরে নয়। বাইরে সুশীলার গান অভিনয় কিছুই পোঁছয়নি। তার স্বভাবটি ছিল ভারি মিষ্টি। সবার সঙ্গে মিলে-মিশে হৈচৈ করতে ভালবাসতেন, তারই মধ্যে দেখা গেল মেমেরাইজ করার দুর্লভ ক্ষমতাও সুশীলায় যথেষ্ট রয়েছে। তিনি দীর্ঘজীবী হলে আর একটি প্রতিভাময়ী নারীকে আমরা দেখতে পেতুম।
সুশীলার মৃত্যুর পরে ঠাকুরবাড়ির বৌ হয়ে আসেন হেমলতা। রাজা রামযোহন রায়ের পুত্র রাধাপ্রসাদ রায়ের দৌহিত্র বংশে তার জন্ম। ইতিপূর্বে তার তিন দাদার সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির তিনটি মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এবার সে বাড়ির বৌ হয়ে এলেন হেমলতা, বিয়ের আগে থেকেই ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরের সঙ্গে হেমলতার পরিচয় ছিল। ষোলো বছর বয়সে বৌ হয়ে এসেই দ্বিপেন্দ্রর দুটি ছেলেমেয়ের একেবারে আসল মা হয়ে উঠলেন। তারপর থেকে হেমলতার বড় মা হয়ে ওঠার কাহিনী এগিয়েছে মসৃণভাবে। তার নিজের সন্তান ছিল না, কিন্তু তিনি ছিলেন সবারই বড় মা। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত এই শ্রদ্ধা ও সম্মান পেয়েছেন তিনি। সেবা, শুশ্রুষা, আদর-যত্ন, দেখাশোনা, কর্তৃত্ব ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে ছিল লেখবার দুর্লভ ক্ষমতা। আদি ব্রাহ্মসমাজে তিনি প্রথম আচার্য। পারিবারিক কাজ, সমাজ সেবা, ধর্মোপদেশ দানের ফাঁকে ফাঁকে চলত তার সাহিত্য-সাধনা।
ছোটবেলা থেকেই হেমলতা বিদ্যোৎসাহিনী। তাই তার বাবা লতিমোহন যত্ন করে মেয়েকে বাংলা, ইংরেজী ভাষার সঙ্গে শিখিয়েছিলেন জ্যোতিষশাস্ত্র। মেয়েদের জ্যোতিষ পাঠ নিষিদ্ধ। যাদের বাঁচা-মরা খাওয়া-পরা নির্ভর করে পরের হাতে সে নিজের ভাগ্য গণনা করে করবেই বা কি? তাই মেয়ের মা বিরোধিতা। করতেন। এখন দিন বদলেছে। তাই ললিতমোহন হেসে বলতেন, এই মেয়ে আমার ব্রাহ্মণ। ব্রাহ্মণের মতোই হেমলতার ধারণাশক্তি ছিল তাই জ্যোতিষচর্চা। করা মোটেই অসম্ভব নয়। হেমলতার জ্যোতিষচর্চা অবশ্য কতটা এগিয়েছিল জানা। যায়নি তবে কয়েকটা গল্পে তার ছাপ পড়েছে। এছাড়া দাদা মোহিনীমোহনের কাছে তিনি পড়েছিলেন কালীসিংহির মহাভারত। বিয়ের পরও তার আগ্রহ দেখে দ্বিপেন্দ্র মিস ম্যাকস্কলকে নিয়োগ করেন হেমলতাকে ইংরেজী পড়াবার। জন্যে। শান্তিনিকেতনে বাস করার সময় হেমলতাকে দুবছর নিয়মিতভাবে ইংরেজী পড়ান পিয়ার্সন সাহেব। এণ্ডজের কাছে হেমলতা পড়তেন ইংরেজী কবিতা। হেমলতা পড়তেন রবীন্দ্রনাথের কাছেও। কবি দেশবিদেশের ইংরেজী পত্রিকা থেকে ভাল ভাল প্রবন্ধ বেছে নিয়ে হেমলতাকে অনুবাদ করতে দিতেন। শুধু সাহিত্য বা ভাষা নয়, হেমলতার আগ্রহ ছিল ধর্ম ও আধ্যাত্মবাদের ওপর। তার বাবা ছিলেন তৈলঙ্গস্বামীর সাক্ষাৎ শিষ্য। দাদা মোহিনীমোহনও প্রথমে থিয়সফিস্ট আন্দোলনের এবং পরে শিবনারায়ণ স্বামীর সংস্পর্শে আসেন। হেমলতাও পরমহংস শিবনারায়ণ স্বামীকেই গুরু হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। সুতরাং বিভিন্ন আধ্যাত্মিক চিন্তা ও ধর্মসাধনার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। রাজা রামমোহনের ঐতিহ্য তো ছিলই, বিয়ের পরে এর সঙ্গে যুক্ত হল মহর্ষির জীবনসাধনা। রবীন্দ্রনাথের কাছে তিনি কিছু সুফীবাদের বইও পড়েন। অনুবাদ করেন আফ্রিকায় ইসলাম প্রবন্ধটি। সেটি পড়ে একদিন কবি পড়াতে পড়াতে বলেন, তুমি মুসলমান হবে নাকি? তোমার মন যে রকম উজ্জ্বল হয়ে ওঠে দেখি, সুফীদের কথায়।
