বিহারে তখন প্রচণ্ড পর্দার যুগ চলছে। সেই পর্দা ভেদ করে মেয়েদের কাছে শিক্ষার আলো পৌঁছয় না। এইরকম জায়গায় এসে মাধুরী কি শুধু আপন সংসারটিকে নিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে থাকতে পারেন? না পারা সম্ভব? বিশেষ করে মাধুরী সেই ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, যে মেয়ের জ্ঞানের আলো জ্বালাতে বারবার এসে দাঁড়িয়েছেন পুরুষের পাশে। মজঃফরপুরে যদিও শরৎকে কোন সমাজ-সংস্কারের কাজে মগ্ন হতে দেখা যায়নি তবে স্ত্রীর ইচ্ছেয় তিনি বাধাও দেননি। তাই মাধুরী কাজ শুরু করে দিলেন অনুরূপাকে সঙ্গে নিয়ে। কলকাতায় তিনি দেখে এসেছেন নারী শিক্ষা প্রসারের চেষ্টা, দেখেছেন তার দিদিরা কেমন মেতে উঠেছেন জনসেবার কাজে। এখানেও রয়েছে অনেক কাজ। মেয়েরা একেবারে অশিক্ষিত, ঘোর পর্দার আড়ালে তাদের জীবনের সবটাই প্রায় ঢাকা। এমন উপযুক্ত পরিবেশে শিক্ষার বীজ বপন করতেই হবে। সখী অনুরূপাকে নিয়ে মাধুরী সেখানে গড়ে তুললেন লেডিজ কমিটি, যুগ্ম সম্পাদিকা হলেন দুজনেই। তারপর প্রতিষ্ঠা করলেন একটা গালস স্কুল, চ্যাপম্যান বালিকা বিদ্যালয়। স্কুল তো হল, ছাত্রী কই?
মজঃফরপুরে ছাত্রী জোগাড় করা সহজ নয়। বাংলার তুলনায় বিহারের মেয়েরা তখনও পেছনে পড়ে আছেন। মাধুরীর সমসাময়িককালেই বিহারের মেয়েদের কথা আরো অনেক বেশি ভেবেছিলেন অঘোরকামিনী রায়। তার অক্লান্ত চেষ্টায় বাঁকিপুরের মেয়েদের অবস্থা কিছু বদলেছে। তিনি নিজের কাছে মেয়েদের রেখে তাদের একটু একটু করে শিখিয়েছেন। এভাবেই প্রথম পনেরোজন শিক্ষিত হয়ে ওঠে। অঘোরকামিনীর সঙ্গে সঙ্গে কাজ করতেন। তার মেয়েরাও। বিহারের মেয়েরা থাকত পর্দার আড়ালে। পর্দা প্রথা দূর করবার জন্যে অঘোরকামিনী ব্ৰহ্মসঙ্গীত গাইতে গাইতে মেয়েদেব নিয়ে পথে বেরোতেন। সে এক দৃশ্য! তাদের সমবেত সঙ্গীত সাহস জোগাত অন্যদের, একটু একটু করে খুলে যেত বন্ধ দুয়ার। অবশ্য অঘোরকামিনীর মতো সমাজ সেবিকার সঙ্গে মাধুরীর কোন তুলনা হয় না। কতই বা বয়স তার? কদিনই বা ছিলেন মজঃফরপুরে? এসময় আরো একজন মহিলা ভাগলপুরের মেয়েদের দুরবস্থা দূর করতে এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু পারেননি। তাঁর নাম বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন। তিনিও বাংলারই মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল ভাগলপুরের ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট খান বাহাদুর সৈয়দ সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে। বিদুষী স্ত্রীকে তিনি লেখাপড়া ও বইলেখার কাজে উৎসাহ দিতেন। মৃত্যুকালে একটা মেয়েদের স্কুল স্থাপন করে স্ত্রীকে তার ভার দিয়ে যান। মাত্র পাঁচটি মেয়ে ও একজন শিক্ষিকা নিয়ে স্কুলের কাজ শুরু করেন রোকেয়া। কিন্তু সেখানে বিশেষ করে মুসলমান সমাজের অবস্থা তখন অবর্ণনীয়। বোরখার অন্ধকারে হাঁফিয়ে উঠে কত মেয়ে যে ছটফট করত কে তার হিসেব রাখে! বিয়ে-সাদী স্থির হলে মেয়েকে ছয় কি সাত মাস রাখা হত অন্ধকার ঘরে। দিন-রাত আটক থাকতে থাকতে কেউ হারাত স্বাস্থ্য, কেউ হারাত জীবন, কেউ হারাত দৃষ্টিশক্তি, তবু পর্দা এতটুকু ফাঁক হত না। এদের ভাল করার সাধ্য একা রোকেয়ার ছিল না। স্বামীর স্মৃতি রক্ষার জন্যে তাকে স্কুলটি তুলে নিয়ে চলে আসতে হয় কলকাতায়। তবে ভাগলপুরে মেয়েদের জন্যে কিছু কাজ করতে পেরেছিলেন। দীপনারায়ণ সিং-এর স্ত্রী লিলিয়ান বা লীল। ভাগলপুরের পাশেই তো মজঃফরপুর। সেখানে দুটি সংসার-অনভিজ্ঞা কিশোরী বধূ কি করে স্কুল চালাবেন!
অনুরূপা হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিতে চান কিন্তু মাধুরীর ধৈর্য অসাধারণ। সখীকে টেনে নিয়ে ঢাকা ঘোড়ার গাড়ি চড়ে মাধুরী বাড়ি বাড়ি ঘুরতে শুরু করলেন। মেয়েরা তখনও অসূর্যম্পশ্যা। তাদের মনে বিশ্বাস উৎপাদন করবার জন্যে মাধুরীদের লুকোতে হত আড়ালে। গাড়ি থেকে নামার সময় দুদিকে চাদর ধরে আড়াল করা পথ দিয়ে তাঁরা গৃহস্থবাড়ীতে ঢুকতেন। কেন এই প্রয়াস? তারা তোত অসূর্যম্পশ্যা নন। তবু বিশ্বাস আনতে হবে তো। খণ্ডন করতে হবে বিবিয়ানার অপবাদ। আপনজনের সামনেই তো খুলবে মনের বদ্ধ দুয়ার, তাই ছোট শহরের সামাজিক রীতিকে উপেক্ষা করলেন না মাধুরী। একটু একটু করে সত্যিই দরজা খুলতে লাগল। মজঃফরপুরে বেশিদিন থাকলে মাধুরীও নিশ্চয় সমাজসেবিকা হিসেবে নাম করতেন! কিন্তু স্ফুলিঙ্গ দাবানলে পরিণত হবার আগেই পট পরিবর্তন হল! মাধুরী ফিরে এলেন কলকাতায়।
মাধুরীর লেখাপড়ার দিকে নজর ছিল রবীন্দ্রনাথের। তাই বোধহয় লেখার হাত খুলেছিল প্রথম থেকেই। চিঠিগুলোই তার প্রমাণ। এছাড়াও তার আটটা রচনার খোঁজ পাওয়া গেছে। মনে হয় এ সময়েই কবি মৃণালিনীর অসমাপ্ত রামায়ণটা মেয়ের হাতে তুলে দেন। শরৎ ব্যারিস্টারি পড়তে বিলেতে গেছেন। অবসর সময়ে মাধুরী শান্তিনিকেতনে বাচ্চাদের পড়াতেন। গল্প লেখার শুরুও এখানে অনুবাদ ছাড়া তিনটে গল্পে নতুনত্ব এবং শক্তির পরিচয়। পাওয়া যায়। আত্মপ্রকাশে কুণ্ঠিত মাধুরীকে লিখতে বলতেন অনুরূপাও। তারপর বাবার উৎসাহে লিখে ফেললেন সুয়ো, মাতশত্রু, সৎপাত্র, অনাদৃতা, চোর প্রভৃতি গল্প। ছাপা হয়েছিল ভারতী, প্রবাসী ও সবুজপত্রে। অবশ্য সে আরো পরের কথা। তখন মাধুরী আছেন জোড়াসাকোতে, শরৎ বিলেতে। স্ত্রী, রেণুকা আর শমীন্দ্রকে হারিয়ে কবি অবশিষ্ট সন্তানদের আরো আপন করে নিতে চাইলেন। এই সময়ই মকসো চলত গল্পের। খসড়া দেখে দিতেন মাধুরীর বাবা। কবি প্রশান্ত মহলানবিশকে বলেছিলেন, ওর ক্ষমতা ছিল, কিন্তু লিখত না। মাতশত্রু বা সৎপাত্র পড়লেই এ কথা বোঝা যাবে। তবে এসব গল্পে রবীন্দ্রনাথ কতখানি কলম চালিয়েছিলেন বলা শক্ত। হয়ত শুধু কাঠামোটাই ছিল মাধুরীর। গল্প গুচ্ছের প্রথম মুদ্রণে সংপাত্র তো রবীন্দ্রনাথের রচনা হিসেবেই ছাপা হয়। পরে কবি জানান সেটি তার কন্যার লেখা। এ গল্পে নারীমাংসলোলুপ সাধুচরণের শ্বাপদবৃত্তির যে ছবি আঁকা হয়েছে তা যেমন তীব্র তেমনি ভয়াবহ। গল্পের শেষে একটি মাত্র মন্তব্য স্ত্রীর হিসাবে সাধুচরণের যত্র আর তত্র ব্যয়। এই গল্প এবং শেষের মন্তব্যটির অনির্বাচ্য ব্যঞ্জনায় মাধুরীর চেয়ে বিশ্ববিখ্যাত বাবার হাতই যে বেশি ছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই। মাতশত্রুও বেশ নতুন ধরনের গল্প। এক হতভাগিনী মায়ের দুর্জয় লোভ ও তার পরিণতি নিয়ে লেখা। শরৎকুমারীর সোনার ঝিনুকের সঙ্গে এর আশ্চর্য মিল রয়েছে। হয়তো মূল গল্পটি কবিই দুজনকে বলেছিলেন, দুটো গল্পই অবিশ্বাস্য অথচ বিশ্বাসযোগ্য করে তোল হয়েছে। মাধুরীর বন্ধু অনুরূপার সঙ্গে কবির দেখা হয়েছিল একবার। কবি অনুরূপাকে বলেছিলেন, তোমার দেখাদেখি ইদানীং গল্প লিখতে আরম্ভ করেছিল। বেঁচে থাকলে হয়ত তোমার মতো লিখতে পারত।
