ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হয়েও মাধুরীলতা মানুষ হয়েছেন স্বতন্ত্র ধরনে। তা স্বতন্ত্র বৈকি। সত্যেন্দ্র বা হেমেন্দ্রর মেয়েদের মতো ধরাবাঁধা বিলিতি স্কুল লরেটোতে পড়েননি তিনি। এমনকি দেশী স্কুল বেথুনেও না। পড়েছেন বাড়িতে। তিনজন ইংরেজ শিক্ষয়িত্রী, লরেন্স সাহেব ও হেমচন্দ্র ভট্টাচার্যের কাছে শিখতেন লেখাপড়া। এছাড়া পড়তেন বাবার কাছে। স্কুলে পাঠাননি বলে কবি যে মাধুরীকে কিছু শেখাতে বাকি রেখেছিলেন তা নয়। দেশী-বিলিতি গান, সাহিত্য, এমন কি নার্সিং পর্যন্ত শিখিয়েছিলেন।
মাত্র একত্রিশ বছর বেঁচেছিলেন মাধুরীলতা। তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনের ইতিবৃত্ত সকলেরি জানা কারণ তিনি রবীন্দ্র-দুহিত। পিতা রবীন্দ্রনাথের প্রথম উপলব্ধি বেলাকে কোলে নিয়েই। তাই তাকে নিয়ে তার কত আশা কত আশঙ্কা! কত স্বপ্ন কত সাধ! পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে বেলা কবির সবচেয়ে প্রিয়। বাবার মন বলে বড় হয়ে বেলি খুব লক্ষ্মী মেয়ে হবে। হয়েছিলেনও তাই। একটু বড় হতেই মাধুরী বুঝেছিলেন, আমি যা করব আমার ভাইবোনেরা তাই দেখে আমার দৃষ্টান্ত অবলম্বন করবে। আমি যদি ভাল না হই, তবে ওদের পক্ষে, আমার পক্ষেও মন্দ! মাধুরী জানতেন তিনি দিদিদের মতো বিশেষ করে ইন্দিরার মতো গুণবতী নন। কিন্তু তার চেষ্টা যদ্দুর পারি ভাল হব।
শিলাইদহের একঘেয়েমিতে মৃণালিনীর মতোই হাঁপিয়ে উঠতেন মাধুরী। দিন যেন কাটে না। অভিযোগ ঝরে পড়ে বাবার বিরুদ্ধে। রবীন্দ্রনাথকে সরাসরিভাবে তাক্রমণ করার সাহস কারুর নেই। কিন্তু মাধুরীলতা তারই মেয়ে। তাই বাবাকে চিঠি লেখেন :
তোমার একলা মনে হয় না, কেননা তুমি ঢের বড় বড় জিনিষ ভাবতে, আলোচনা করতে, সেগুলোকে নিয়ে একরকম বেশ কাঁটাও। আমরা সামান্য মানুষ, আমাদের একটু গল্পগুজব মানুষজন নিয়ে থাকতে এক একসময় একটু আধটু ইচ্ছে করে। আর যদি তুমি এখানে এসে আর নড়তে না চাও তবে তুমি যে যে মহৎ বিষয় নিয়ে থাকে। তাই সব আমাদের একটু একটু দাও।
ভাবতে অবাক লাগে, মাধুরী যখন এ চিঠি লিখছেন তখন তার বয়স চোদ্দও পুরো হয়নি। তখন থেকেই তিনি পিতার দার্শনিক চিন্তার শরিক হতে চেয়েছেন।
মাধুরীর চোদ্দ বছর বয়স হতেই তার বিয়ের জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলেন রবীন্দ্রনাথ। মনের মতো ছেলে পাওয়া কি এতই সোজা? তার ওপর মোটা বরপণ আছে। বন্ধু প্রিয়নাথ সেনের ওপর পড়ল পাত্র খোঁজার ভার। যখন কথাবার্তা। ফলপ্রসূ হয় না তখন বন্ধুকে সান্ত্বনা দিয়ে লেখেন, বৃথা চেষ্টায় নিজেকে ক্ষুব্ধ কোরো না। আবার লেখেন, নদী যেমন চলতে চলতে একসময়ে সাগরে গিয়ে পড়েই, সেইরকম বেলা যথাসময়ে তার স্বামীকুলে গিয়ে উপনীত হবে। কিন্তু এ তো সান্ত্বনা। এভাবে বসে থাকলে তো মেয়ের বিয়ে হয় না। অবশেষে সুপাত্রের সন্ধান মিলল। কবি বিহারীলাল চক্রবর্তীর পুত্র শরৎ-কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র। দর্শনে অনার্স নিয়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে। পেয়েছেন কেশব সেন স্বর্ণপদক। তারপর মেন্টাল এ্যাণ্ড মর্যাল সায়েন্সে এম. এ., তাতেও প্রথম। এখন ওকালতী পাশ করে মজঃফরপুরে প্র্যাকটিস করছেন। সব দিক থেকেই মনোমত পাত্র। কবি বিহারীলালের প্রতি রবীন্দ্রনাথের আকর্ষণ প্রথম জীবন থেকে সেই তিন তলার ছাদ, ফুলের বাগান, জ্যোতিদাদার সাহিত্য মজলিশ, বৌঠানের প্রিয় কবি বিহারীলালের উদাত্ত, হাসি, সাধের আসন—সব যেন মনে পড়ে। এখন বিহারীলাল নেই, তার ছেলে। কি তার মতোই স্বভাব পাবে না?
শরতের মা মোটা বরপণ দাবি করলেন। বিয়ে হবে ব্রাহ্ম মতে। কবি তখনও সংস্কারক হননি। মেয়ের সুখের জন্য ক্ষুব্ধ অভিমানে বরপণের দাবিও মেনে নিলেন। সম্মত হলেন দশ হাজার টাকা দিতে। গুরুজনদের প্রতি কোনরকম বিরুদ্ধাচরণ করে শরৎ এ বিয়েতে মত দিতে চাননি, কবিও না, তাই পণের টাকা নিয়ে কোন পক্ষই কিছু ভাবেননি। এর আগে বলেছি, মহর্ষি মেয়েদের বিয়েতে যৌতুক দিতেন তিন হাজার টাকা, এবারে দিলেন পাঁচ হাজার। বাকিটা দিলেন কবি। পণের টাকা দেওয়া নিয়েও বিস্তর লেখালেখি হল। বিয়ের কথা পাকা হবার পরেও বাধা এসেছিল, কারণ শরৎত্রা যে শ্রেণীর ব্রাহ্মণ, তার সঙ্গে মাধুরীর বিয়ে কুটুম্বদের মনঃপূত হয়নি। অবশ্য এসব আপত্তি কবি গায়ে মাখলেন না।
বিয়ের পর মাধুরী স্বামীর প্র করতে গেলেন মজঃফরপুরে। সেখানে ওরকম যৌতুক নিয়ে ঘরবসত করতে কেউ আসেনি। অপর্যাপ্ত শাড়ি, গয়না, অসামান্য রূপ। তার ওপর মাধুরীর মধুর ব্যবহারে সমস্ত মজঃফরপুরবাসী বাঙালী বিস্ময়ে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। এর ওপর অতিথিরূপে এসেছেন মাধুরীর কবিপিতা। লোক সমাগমের যেন শেষ নেই। এত ঝঞ্চাটের মধ্যেও কবি খুশি হয়েছিলেন জামাই হিসেবে শরৎকে পেয়ে স্ত্রীকে লিখলেন, এমন সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য জামাই তুমি হাজার খুঁজলেও পেতে না। অনেক উপদেশ দিয়েছিলেন মেয়েকে; মাধুরী উত্তরে লিখেছেন, এ বাড়ির মেয়ে বলে উনি আমাতে অনেক সদগুণ আশা করেন, তাতে যাতে না নিরাশ হন আমি সেই চেষ্টা করব।
মাধুরীর চেষ্টা সফল হয়েছিল। সতেরো বছরের দাম্পত্য জীবনে সুখী হয়েছিলেন শরৎ ও মাধুরী। মজঃফরপুরের জীবনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিতে নিশ্চয় কষ্ট হয়েছিল মাধুরীর। লেখিকা অনুরূপা দেবীর সঙ্গে এ সময় মাধুরীর আলাপ হয়। দুজনের স্বামীরা ছিলেন দুই বন্ধু। সেই সূত্রে বন্ধুত্ব। বিয়ের সময় অনুরূপা মজঃফরপুরে ছিলেন না। ফিরে এসে মাধুরীকে দেখলেন এক স্নিগ্ধোজ্জল চৈত্র অপরাহ্নে। দেবকন্যার মতোই অপরূপা। সকলেই তার গুণে মুগ্ধ। মাধুরীর গৃহিণীপণার গল্প আর করব না। কবির চিঠিতে তার উল্লেখ আছে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা, শুধু ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা কেন, বাঙালী মেয়েরা গৃহিণীপণায় খুব পটু। সুতরাং অন্য প্রসঙ্গে আসি।
