নিতান্ত অকালে-হারানো মাধুরীলতার জীবন যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবে শেষ হল না। ১৯০৯ থেকে ১৯১৩ সাল পর্যন্ত জোড়াসাঁকোতে কাটলেও তারপর শুরু হয়েছিল ঘোর অশান্তি। কারণটা ঠিক জানা যায়নি। কবি ছিলেন বিদেশে। জোড়াসাঁকোর বাড়ি তদারকির ভার ছিল ছোট জামাই নগেন্দ্রনাথের হাতে। শোনা যায়, ঐ সময়ে শরতের ওপর নানারকম অবিচার করা হয়। দোষ ছিল না তার। তবু ফিরে আসার পর মাধুরীর মুখে সব কথা শুনেও কবি যখন কোন ব্যবস্থা না করেই শান্তিনিকেতনে ফিরে গেলেন তখন ক্ষুব্ধ অভিমানে শরৎ ও মাধুরী চলে গেলেন ডিহি শ্রীরামপুরের বাড়িতে। এরপর আর কোনদিন শরতের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের দেখাসাক্ষাৎ হয়নি। আর মাধুরীলতা?
মৃত্যুসংবাদ ছাড়া তার সম্বন্ধে আর কি কিছুই জানা যাবে না? দেবতুল্য বিশ্ববন্দিত পিতার সঙ্গে তার বিচ্ছেদ ঘটল, সে সময় কে রইল পাশে? কে দিল সান্ত্বনা? এ সময় থেকেই তিনি ধীরে ধীরে রোগশয্যা নিলেন। বছরখানেক পরে একটু সুস্থ হয়ে অনুরূপাকে লিখেছিলেন, বন্ধুহার মম অগ্ধ ঘরে, থাকি বসে অবসন্ন মনে। রোগশয্যায় শুয়ে মাধুরী অনুভব করেছেন :
একটা আবরণ সরে গেছে, মানুষকে যেন নতুন করে দেখতে শিখেছি। এরকম কঠিন ভাবে মনটা নাড়া না পেলে হয়ত কখনো ক্ষাগত না।
মাধুরী উপলব্ধি করেছেন, তার জীবনে এতদিন আত্মার সঙ্গে মনের পরিচয় হবার সুযোগ হয়নি, হয়েছে সুদীর্ঘ বোগশয্যায়, জীবনমৃত্যুর মাঝখানে। এই নতুন উপলব্ধি নিয়ে মাধুরী আর সংসারে ফিরে আসতে পারেননি। সম্প্রতি জানা গেছে, অনুরূপা ছাড়াও আর এক বান্ধবীর সঙ্গে এসময় পত্রালাপ করেছিলেন মাধুরী, তার নাম ইন্দুপ্রভা। ইন্দুপ্রভাকে লেখা চিঠিতে অবশ্য নেই তার নতুন উপলব্ধির কথা কি কোন বিষণ্ণতার আভাস। তবে কি মাধুরী তখন সবই ভুলে যেতে চাইছিলেন? তাই চিঠিতে লিখেছেন, মেয়েমানুষকে যখন বি, এ ছাড়া অন্য পাশ দিতে হয় না তখন অত লম্বা স্মরণশক্তি রেখে কি ফল? এসময় একবার হাজারিবাগে ইন্দুপ্রভার বাড়িতে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল। মাধুরীর, মনে হয় যাওয়া হয়নি। কবিকেও বারবার যেতে হয়েছে বিদেশে। এণ্ডজের মুখে বাবার বিজয়বার্তা শোনেন মাধুরী। প্রদীপ্ত হয়ে ওঠে মেয়ের পাণ্ডুর মুখ। তারপর শোনা গেল ডাক এসেছে মাধুরীর। যে রোগে মারা গেছেন ছোট বোন রেণুকা, সেই রাজাই বাসা বেঁধেছে স্বর্গীয় মাধুরীমাখা বেলার শরীরে। এ তো বেলার অসুখ নয়। এ যে মহাকালের পরীক্ষা! কবি রথীন্দ্রকে লিখলেন, জানি বেলার যাবার সময় হয়েছে। আমি গিয়ে তার মুখের দিকে তাকাতে পারি এমন শক্তি আমার নেই।
সময় যখন সত্যিই ঘনিয়ে এল, তখন কবিকে এসে বসতেই হল মেয়ের পাশে। বিছানায় মিশে থাকা, তিল তিল করে ক্ষয়ে যাওয়া রুগণ শরীর, দুখানি শীর্ণ সাদা হাত বাড়িয়ে মাধুরী ছেলেবেলার মতো আবদার করেন, বাবা গল্প বলো।
বাবার বুকে শেলাঘাত হয়। এই তো সেদিন, কদিন আর হবে, তার অবুঝ চঞ্চল মেজ মেয়ে রাণীও বেলার মতোই শীর্ণ হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরেছিল তাকে, বলেছিল বাবা গল্প বলো। আবার? এত শীঘ্র গল্প শোনাতে হবে আরেক জনকে, কথাকোবিদ পিতার গল্পের ঝুলিও বুঝি শেষ হয়ে যেতে চায়। রুদ্ধ হয়ে আসে কণ্ঠ। তবু বলেন। রেণুকা শুনেছিল ছোট ছেলের গল্প—শিশুর কবিতা —সে নিজেও যে শৈশবের সীমানা পার হয়নি। বেলা বুঝি শোনেন পলাতকার বিনুর গল্প, মুক্তি, হারিয়ে যাওয়া বামির কথা! এই গল্প শোনাও একদিন ফুরল।
মাধুরীলতার মৃত্যুসংক্রান্ত কিছু তথ্যঘটিত ভ্রান্তি রয়েছে। বেশির ভাগটাই শরৎকে নিয়ে। আমরা ঠিক না জানলেও একথা সত্য যে জোড়াসাঁকোর বাড়িতে যে অপ্রীতিকর অবস্থার উদ্ভব হয়েছিল মাধুরীর মৃত্যুর মতো বিশাল ঘটনাতেও তার জের মেটেনি। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় লিখেছেন, কবির সঙ্গে আর শরতের সাক্ষাৎ হয়নি। বেলা যখন মৃত্যুশয্যায় তখন কবি কন্যাকে দেখতে যেতেন দুপুরে—যখন জামাতা আদালতে। অপর দিকে হেমলতার উক্তি তুলে ধরেছেন মৈত্রেয়ী দেবী। তাতে দেখা যাবে হেমলতা বলেছেন, অত আদরের মেয়ে বেলা তার মৃত্যুশয্যায়, সব অপমান চেপে তিনি দেখা করতে যেতেন। শরৎ তখন টেবিলের উপর পা তুলে দিয়ে সিগারেট খেত। পা নামাত না পর্যন্ত—এমনি করে অপমান করত। উনি সব বুকের মধ্যে চেপে মেয়ের পাশে বসতেন, মেয়ে মুখ ফিরিয়ে থাকত।
দুটি উক্তিই আমাদের মনে সংশয় জাগিয়েছে। কারণ রবীন্দ্রনাথ এবং প্রশান্ত মহলানবিশ দুজনেই বলেছেন তারা মাধুরীকে দেখতে যেতেন সকাল বেলা। প্রশান্ত তাকে নিয়ে যেতেন গাড়ি করে, তাই তার ভুল হবার সম্ভাবনা কম। অপর দিকে রবীন্দ্রজীবনীকার বলেছেন দুপুরবেলা। অবশ্য এই সময়টা বেলা দশটার পর হলে, বোধহয় কোনো সংশয় থাকে না। অপর দিকে হেমলতার কথাকেও বিনা দ্বিধায় মেনে নেওয়া গেল না, কারণ কবি নিজে বলেছেন মেয়ে তাকে বলতেন বাবা গল্প বলে। বেলার মৃত্যুর পরে রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে লেখা চিঠিতেও দেখা যাচ্ছে, কবি লিখেছেন তিনি তার মেয়ের রোগযন্ত্রণা কিছুই লাঘব করতে পারেননি, পারা সম্ভবও ছিল না অথচ পিতার উপর শেষ পর্যন্ত তাহার নির্ভর ছিল। তাই মেয়ের মুখ ফিরিয়ে থাকার মধ্যে সন্দেহ থেকে যাচ্ছে। শরতের চাপা অভিমানী স্বভাবের সঙ্গেও যেন এই ব্যবহার খাপ খায় না। বরং তার সঙ্গে কবির দেখা না হবার সম্ভাবনাই বেশি। যেদিন দেখা হতে পারত অর্থাৎ বেলার মৃত্যুর সময়, সেদিন কবি ফিরে গিয়েছিলেন সিঁড়ি থেকেই। স্ত্রীর মৃত্যুর পরে শরৎ চলে গিয়েছিলেন মজঃফরপুরে, একটা পুরনো নীলকুঠি কিনে সেখানে গাছপালা ফুলের বাগান করে নিরালায় বাস করতেন। অনেকের মতে মাধুরীলতার বিবাহিত জীবন সুখের হয়নি। রবীন্দ্রনাথ তার ব্যর্থ-বিড়ম্বিত জীবন থেকেই সংগ্রহ করেছিলেন হৈমন্তী গল্পের বীজ। হৈমন্তীর সঙ্গে মাধুরীর সাদৃশ্য আছে ঠিকই তবে শরৎ ও মাধুরীর বিবাহিত জীবন ব্যর্থ হয়েছিল মনে হয় না। ইন্দিরা লিখেছেন, শরং তাদের স্বল্পকালস্থায়ী বিবাহিত জীবনে বেলার প্রতি বিশেষ অনুরক্ত ছিলেন। তবে ক্ষুব্ধ অভিমানের দুস্তর সেতু কবি বা শরৎ কেউই কোনদিন পার হতে পারেননি।
১১. রেণুকার কথায় আসা যাক
