রামভজের সঙ্গে বিয়ের পরে সরলার কর্মজীবন শুরু হয় পাঞ্জাবে। রাজনৈতিক জীবনে রামভজ ছিলেন সরলার মতোই তেজস্বী ও চরমপন্থী। বাংলার বাঘিনী যেন খুঁজে পেল যথার্থ দোসর। তবে পাঞ্জাবে সরলা শুরু করলেন সমাজ সেবা। সখিসমিতি আর বিধবা-শিল্পাশ্রমের মধ্যে যে অভাব ছিল সেটা পূরণ করবার জন্যে তিনি স্থাপন করলেন ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল। নারীর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। পর্দানশীন মেয়েদের শিক্ষা দেওয়াই ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই, প্রথমে এলাহাবাদে, পরে লাহোর, অমৃতসর, দিল্লী, করাচী, হায়দ্রাবাদ, কানপুর, বাকীপুর, হাজারীবাগ, মেদিনীপুর, কলকাতা ও আরো কয়েক জায়গায় এর শাখা খোলা হয়। কলকাতা শাখার ভার ছিল কৃষ্ণভামিনী দাসের ওপর। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি ও তার সহকারিণীরা কলকাতার প্রায় তিন হাজার অন্তঃপুরবাসিনীকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। বিধবা হবার পর সরল আবার ফিরে এসে মহামণ্ডলেরই আরেকটা শাখা স্থাপন করেন ভারত স্ত্রীশিক্ষা সদন। এঁদের চেষ্টায় কলকাতায় পর্দাপ্রথা খুব দ্রুত উঠে যায়। মেয়েদের স্কুলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রীরাও দলে দলে আসে স্কুলে ভর্তি হতে। শিক্ষার সুবিধের জন্যে মহামণ্ডল থেকে এ সময় বেবিক্রেস আর মেয়েদের হস্টেল খোলার ব্যবস্থাও হয়েছিল।
পাঞ্জাবে সরকার কার্যকলাপ খুব স্পষ্ট নয়। সেখানে রামভজের উপযুক্ত সহধর্মিণী হয়ে তিনি হিন্দুস্থান পত্রিকাটির ভার নেন। শোনা যায়, লাহোরের চিফ কোর্ট আদেশ দিয়েছিল যে পত্রিকার সম্পাদক ও স্বত্বাধিকারী হিসেবে রামভজের নাম থাকলে তার ওকালতির লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হবে। সরলা প্রস্তাব করলেন পত্রিকায় তাঁর নাম দেওয়া হোক। তাই হল। হিন্দুস্থানের একটা ইংরেজী সংস্করণ বার করে সরলা তাতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা প্রকাশ করতে থাকেন। রোলট এ্যাক্ট চালু হলে হিন্দুস্থান বন্ধ করে প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হল, রামভজ নির্বাসিত হলেন। একাকিনী সরলা শক্ত হাতে হাল ধরে পাঞ্জাবের বিদ্রোহকে নিয়ে গেলেন পরিণতির পথে। পাঞ্জাবের ব্রিটিশ অত্যাচার চরমে উঠল জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডে। এসময় সরলাকেও গ্রেপ্তারের কথা হয়েছিল, কিন্তু তখনও পর্যন্ত ব্রিটিশ আইনে রাজনৈতিক কারণে মেয়েদের আটক করার নিয়ম চালু হয়নি।
এরপর থেকে সরল মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের অতিমাত্রায় সমর্থক হয়ে পড়লেন। তাই চরকা-খদ্দর প্রবর্তনেও সরল গান্ধীজীর ডান হাত। সবে তার একমাত্র পুত্র দীপকের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর নাতনী রাধার বিয়ে হয়েছিল। এই বিবাহ দুটি ভিন্ন পারিবারিক ধারার যোগ ঘটাল। স্বামীর মৃত্যুর পরেও সরলাকে দেখা যায় সমাজসেবিকারূপে। ১৯২৫ সালে তিনি নিখিল ভারত সামাজিক মহাসমিতির সভানেত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু বাঙালীর কাছে তার প্রথম জীবনের তেজস্বিনী মূর্তিটিই বেশি আদর পেয়েছে।
মহর্ষি ভবনে যখন গুণবতী মেয়েদের ভিড় তখন পাশের বৈঠকখানাবাড়িতেও দুটি পিঠোপিঠি বোন বড় হয়ে উঠেছেন। তারা গুণেন্দ্রনাথের মেয়ে বিনয়িনী ও সুনয়নী। এখন আর সৌদামিনীর দুঃখ নেই। তার তিন ছেলে বড় হয়েছেন! অবন-গগনের ছবি ফিরিয়ে এনেছে দেশের সম্মান। অবশ্য সে পরের কথা। তার অনেক আগেই বেজেছিল বিনয়িনীর বিয়ের সানাই, বড় করুণ সুরে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল খুব ধুমধাম করে বিয়ে হবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর। গুণেন্দ্রনাথের ছত্রিশ বছরের জীবন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ জানলে না কিসের দুর্দমনীয় বেগ তাঁকে এমন নির্মমভাবে আত্মহত্যার পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এ উক্তি গুণেন্দ্র-দৌহিত্রী প্রতিমার। মায়ের অভিমান ও বেদনার স্পর্শ পেয়েছিলেন তিনি, নয়ত মাতামহকে দেখবার কোন সুযোগই তাঁর হয়নি। গুণেন্দ্রের আকস্মিক মৃত্যুর পর খুব সাধারণ ভাবে বিয়ে হল বিনয়িনীর। হ্যাঁ, পূর্বনির্ধারিত পাত্র শেষেন্দুভূষণের সঙ্গেই। তারপর?
তারপর আবার কি? মসৃণভাবে দিন কেটে গেছে ঘর-সংসার জপ-তপ আর রান্না-বান্না নিয়ে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সবাই বিকেলে গা ধুয়ে পছন্দমতো খোঁপা বাঁধতেন। তারপর শিউলি বা নটকনিয়াঙ্গা শাড়ি পরতেন সুন্দর করে। রূপটান করে মোমরাট, কাজল প্রভৃতি দিয়ে প্রসাধন সেরে আসতেন কর্তৃঠাকরুণকে সাজ দেখতে। তিনি প্রত্যেকের খোঁপায় জড়িয়ে দিতেন ফুলের মালা। হয়ত এ নিয়ম অন্যান্য সাবেকী বাড়িতেও ছিল। বিনয়িনী খোপা বাঁধতে পারতেন সুন্দর করে। বেনিঝি-ভাইঝিদের চুলে ফুটে উঠত নানা রকম ছাদবেনেবাগান, মনভোলানো, ফঁশজাল, কলকা, বিবিয়ানা আরো কত কী! হয়ত বিনয়িনী চিরকাল এভাবে সবার চোখের আড়ালে থেকে যেতেন যদি না তার নিজের লেখা আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপিটি অকস্মাৎ পাওয়া যেত। এটি এখনো অপ্রকাশিত আকারে তাঁর পৌত্র শ্রী সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের কাছে রয়েছে। তিনি তাঁর ঠাকুরমার হাতে লেখা জীর্ণ খাতাটি পান পিসীম। প্রতিমা ঠাকুরের কাছ থেকে। প্রচলিত রীতি অনুযাধী ঠাকুরমা বললুম বটে তবে ঠাকুরবাড়িতে পিতামহীকে বলা হত দাদু আর পিতামহ হতেন দাদামশায় বা কর্তাবাবা। দাদুর বদলে সম্ভ্রমে ঠাকুরমাকে অনেক সময় বলা হত কাম।
বিনয়িনী তাঁর জীবনী, যার নাম তিনি দিয়েছেন কাহিনী, লেখা শুরু করেন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। খাতার ওপরে ১৯১৬-১৭ লেখা থাকলেও তিনি নিজের কাহিনী শুরু করেন আরো পরে। ১২৮০ থেকে ১৩৩০-এর জীবনবৃত্তে তিনি কাহিনী লেখেন ১৩২৫ সালে, মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে। এ বয়সে তার নিজের কথা বলতে ইচ্ছে করল কেন তা তিনি নিজেই জানেন না। ঠাকুরবাড়িতে আত্মকাহিনী লেখার রেওয়াজ বহুদিনকার। মহাভবনে পুরুষরা তো বটেই মেয়েরাও আত্মকথা লিখতে এগিয়ে এসেছিলেন। অবশ্য আত্মজীবনী রচনায় মেয়েদের পথ দেখিয়েছিলেন রাসসুন্দরী দেবী, তিনি ঠাকুরবাড়ির কেউ নন। প্রমথ চৌধুরীর মনে হয়েছিল, বাংলা ভাষায় মাত্মজীবনী লেখেন শুধু মেয়েরা। বলাবাহুল্য এই মন্তব্যের কারণও রসি সুন্দরী। কেশবচন্দ্র দেনের মা সারদাসুন্দরী দেবীর আত্মরিত আর এক থানি উল্লেখযোগ্য বই। বিনয়িনী কাহিনী লেখার আগে সৌদামিনীর পিতৃ স্মৃতি, স্বাকুমারীর সেকেলে কথা ও আরো অনেক আত্মজীবনী বেরিয়ে গেছে। এদের যে কোন একটা বিনয়িনীর মনে আগ্রহ জাগতে পারে। তবে লেখবার সময়, তিনি কাউকে অনুকরণ না করে, নিজের মনে নিজের কথা বলে গিয়েছেন।
