ভারতী সম্পাদনাসূত্রে সরল। এ সময় পরিচিত হয়েছিলেন আরো দুটি অলোক সামান্য প্রতিভার সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতা। স্বামীজী চেয়েছিলেন সরলা বিদেশে যাবেন ভারতীয় নারীর প্রতিনিধি হয়ে। প্রতীচ্যের মেয়েদের শোনাবেন প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক বাণী। চিঠিতে লিখেছিলেন?
যদি আপনার ন্যায় কেউ যান তো ইংলণ্ড তোলপাড় হইয়া যাইতে পারে, আমেরিকার কা কথা!
স্বামীজী নিবেদিতাকেও বারবার বলেছিলেন সরলার কথা। নিবেদিতা লিখেছেন, তিনি (স্বামীজী) বলেন—সরলা নারীকুলের রত্ন; অনেক বড় জিনিয করবে। নিবেদিতা গল্প করেছিলেন সরলাকেও, স্বামীজী তাকে বলেছেন—সরলার education perfect; এইরকম education ভারতের সব মেয়েদের হওয়া দরকার। এরপরই নিবেদিত প্রস্তাব নিয়ে এলেন— স্বামীজীর সঙ্গে inext trip-এ সরলারও বিলেত যাওয়ার, সেখানে ভারতের মেয়েদের প্রতিনিধি হয়ে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক বার্তা প্রতীচ্যের মেয়েদের শোনাবার জন্যে।
স্বামীজীর আশা অবশ্য সফল করতে পারেননি সরলা, কারণ তিনি তার সঙ্গে বিদেশ যেতে পারেননি। স্বামীজী ও নিবেদিতার সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ রাখাও সম্ভব হয়নি সরলার পক্ষে, তার পেছুটান ছিল ঠাকুরবাড়ি ও ব্রাহ্ম সমাজের। বরং স্বামীজীর স্বপ্ন আংশিকভাবে সফল করেছিলেন সুষমা। তাঁর আমেরিকাযাত্রার কথা আগেই বলেছি। সরলা ঝড় তুলেছিলেন বাংলায়, পাঞ্জাবে, সারা ভারতবর্ষে।
এর মধ্যে হঠাৎ একটা সভানেতৃত্বের আহ্বান এল। সরলা ইতস্তত করতে লাগলেন। মহীশূর ঘুরে এসেছেন বটে, তা বলে কলকাতা শহরে প্রকাশ্যে ছেলেদের সভায় যোগ দেওয়া! এ যে কল্পনার অতীত! মাঝে মাঝে স্বামীজীর আশ্রমেও গিয়েছেন কিন্তু তখন সঙ্গে থাকতেন মামাতো দাদা সুরেন কিংবা অগ্নিশিখার মতো অলোকসামান্য নিবেদিত। তবু রাজী হতে হল। তার নির্দেশে সভা হল পয়লা বৈশাখ। ঐ দিন যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। উৎসবের নাম হল প্রতাপাদিত্য উৎসব। তার জীবনী আলোচনা করে ছেলেরা দেখাল লাঠি খেলা, কুস্তি, বকসিং!
দিন বদলেছে বলে সরলাকে বিরূপ সমালোচনা শুনতে তো হলই না, উন্টে কাগজে কাগজে সমালোচনার বদলে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শোনা গেল। মরি মরি কি দেখিলাম! এ কি সভা! বক্তিমে নয়, টেবিলে চাপড়াচাপড়ি নয়—শুধু বঙ্গবীরের স্মৃতি আবাহন, বঙ্গযুবকদের কঠিন হস্তে অস্ত্রধারণ ও তাদের নেত্রী এক বঙ্গললনা…দেবী দশভুজা কি আজ সশরীরে অবতীর্ণ হইলেন?
কিংবা, কলিকাতার বুকের উপর যুবক সভায় একটি মহিলা সভানেত্রীত্ব করিতেছেন দেখিয়া ধন্য হইলাম।
কাগজে লিখল, সরলাদেবীর সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে হাঁপিয়ে পড়ছি। রোজ ভোরে উঠে মনে হয়-অতঃ কিম?
আসলে সরলা বাঙালী মানসিকতার গতিপ্রকৃতিকে ঠিকমতো ধরতে পেরেছিলেন। যুক্তির চেয়ে আবেগ উত্তেজনায় তারা মেতে ওঠে বৈশি। তাদের জাগাতে হলে তাদের প্রবণতার পথ ধরেই এগোতে হবে। তাই তিনি বীরাষ্টমী, রাখিবন্ধন, প্রতাপাদিত্য উৎসব, উদয়াদিত্য উৎসবের সূচনা করে নিজের বাড়িতে শরীর চর্চার আখড়া খোলেন। তবে এই প্রতাপাদিত্য উৎসব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সরলার মতবিরোধ শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ প্রতাপাদিত্যকে জাতীয় বীর বলে গ্রহণ করতে রাজী ছিলেন না কারণ তার চারিত্রিক আদর্শ মহান নয়। বৌঠাকুরাণীর হাটে তিনি প্রতাপাদিত্যকে সেভাবেই এঁকেছেন। অথচ সরলা সেই ব্যক্তিকে নিয়ে, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সত্যিই আছে কিনা বিচার না করে, মেতে ওঠায় তিনি বিরক্ত হন। সরলার উত্তর, তিনি প্রতাপাদিত্যকে নীতির নিক্তিতে বিচার করেননি, করেছেন রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে। একলা এক জমিদার হয়ে তিনি যে মোগল বাদশার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, নিজের নামে সিক্কা চালিয়েছিলেন সে কথা তো সত্যি।
সব মিলে সরলা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ বাঁধিয়ে দিলেন। এর ওপর ছিল তার গান! সে যেন রুদ্রবীণার ঝঙ্কার! ১৯০১ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে গাওয়া হয় তার নিজের গান নমে হিন্দুস্থান। প্রবল উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ল। বিবেকানন্দের। আলমোড় আশ্রমের অধিনেত্রী মিসেস সেভিয়ার গান শুনে সরলাকে বলেছিলেন, আর কিছু না, শুধু যদি জাতীয় গান গেয়ে ফেরো তুমি ভারতের নগরে নগরে গ্রামে গ্রামে, সমস্ত দেশকে জাগাতে পারবে। কিন্তু সরল নিজে সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে মিশে যেতে পারেননি। পেরেছিলেন নিবেদিতা। সরলা চেয়েছিলেন যুবমানস গড়ে তুলতে, তাদের ধমনীতে শক্তি সঞ্চার করতে। থুন বা স্বদেশী ডাকাতিতে তার সমর্থন ছিল না। শরীর শিক্ষা, আখড়া স্থাপন, লাঠি খেলা, কুস্তি, তলোয়ার শিক্ষা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপন প্রভৃতি কাজেই তার উৎসাহ। পাঞ্জাবেও তাঁর সংগঠন শক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশের মেয়েরা এ সময় অভূতপূর্ব স্বাদেশিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে যে তারা খুব এগিয়ে ছিলেন তা নয়, কিন্তু দেশের কাজে সাড়া দিয়েছিলেন সবাই। বেশির ভাগ এসেছিলেন সাধারণ সমাজ থেকে। তুলনায় উচ্চবিত্ত সম্ভ্রান্ত মহিলাদের সংখ্যা কম। সরলা অবশ্য ব্যতিক্রম। তার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ভরে উঠল স্বদেশী জিনিষে। সরলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার খুলেছিলেন স্বদেশী জিনিষ ব্যবহার ও প্রচার করবার জন্যে। তিনি অবাক হয়ে দেখেছিলেন, সেসময় যে-সমস্ত জাপানীরা সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আসতেন তারা নিজেদের দেশ থেকে বয়ে সব কিছু জিনিষ আনতেন, এমনকি চিঠি লেখার কাগজ পর্যন্ত। একদিন সরলা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এত কাগজ এনেছেন কেন? তারা জানালেন, ভারতবর্ষে কিছুই পাওয়া যায় না ভেবে তাদের বাড়ির মেয়েরা চিঠি লেখার কাগজ দিয়েছেন যাতে তাদের চিঠি লেখা বন্ধ না হয়ে যায়। আশ্চর্য! সরলা ভাবেন, জাপান জানে পরাধীন অসভ্য ভারতবর্ষ ভারতবর্যের লোক কিছুই করতে পারে না, করতে জানে না। তিনি স্বদেশী জিনিষ ব্যবহার শুরু করলেন। ভারতীর মলাট দিলেন দেশী হলুদ রঙের তুলট কাগজে। খুললেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। যোগেশ চৌধুরী প্রমুখ কয়েকজনের সাহায্যে বৌবাজারেও খুললেন স্বদেশী স্টোস। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আগেই তারা স্বদেশী দোকান খুলেছিলেন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-এ বিক্রী হত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা, শুধু মেয়েদের জন্যে, স্বদেশী কাপড় ও জিনিষপত্র। কোন উৎসবে যেতে হলে সরলা আপাদমস্তক স্বদেশী বেশভূষায় সেজে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পরিচালনা উপলক্ষে পাওয়া স্বদেশী মেডেলটি দিয়ে তৈরি করা ব্রোচটি কাঁধের কাছে লাগিয়ে যেতেন। অপরূপ বেশে তার অনুপম লাবণ্য সকলকেই মুগ্ধ করত। এ সময় তাঁর ভারতী আর সরযূবাল দত্তের ভারত-মহিলা পত্রিকা ভার নিয়েছিল জাতীয়তাবোধে মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করবার। তারা সফল হয়েছিলেন নিশ্চয়, না হলে স্বদেশী আন্দোলনে মেয়েরা এমন গৌরবময় ভূমিকা নেবেন কেন? নাটোরের মহারাণী গিরিবালা দেবী, অবলা বসু, সরোজিনী বস্তু বা বঙ্গলক্ষ্মী, ননীবালা দেবী, দেশবন্ধুর বোন উর্মিলা দেবী, শ্রী অরবিন্দের ভাইঝি লতিকা ঘোয—সকলেই এগিয়ে এসেছিলেন রক্তাক্ত শপথ নিতে। মেয়েদের দিক থেকে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালনা করেন সন্তোষ কুমারী গুপ্তা। বিখ্যাত মেথর ধর্মঘট পরিচালনা করে তাদের সজাগ করে তুললেন প্রভাবতী দাসগুপ্তা, সরোজিনী বসু প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যতদিন বন্দেমাতরুম্ ধ্বনির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হয় ততদিন তিনি সোনার বালা পরবেন না। আসলে এই স্বদেশী আন্দোলনের যুগে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বহু নারী নীরবে সকলের অলক্ষ্যে আন্দোলনকে সাহায্য করে গেছেন। একেবারে সামনে এসে প্রত্যক্ষ কাজ না করলেও তাদের এই নীরব দানের মূল্য কম ছিল না। তবে এসব ঘটনা পরের কথা। সরলা তখন আর বাংলার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেই। চলে গেছেন পাঞ্জাবে। সে সময় সর্বভারতীয় রাজনীতিক্ষেত্রে বাঙালী-মেয়েরা বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেননি। হায়দ্রাবাদের সরোজিনী নাইডু, মাদ্রাজের ম্যাজিস্টেট যতীন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী বিভাবতী কিংবা এলাহাবাদে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দুই মেয়ে সীতা ও শান্ত স্বদেশী আন্দোলনে প্রবাসে কিছু কিছু আলোড়ন জাগিয়েছিলেন। সরলা ঝড় তুলেছিলেন পাঞ্জাবে। লাহোরে প্রায় পাঁচশ জন বাঙালী যুবক সংগ্রহ করে তিনি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন।
