নিয়মিত লেখাপড়ার চর্চা না থাকলেও বিনয়িনীর সাদামাটা আটপৌরে ধরনের লেখার হাতটি ভাল—কৃত্রিমতার স্পর্শ নেই। যেন আপন মনে আয়নায় নিজের মুখ দেখা! সহুজ, স্বচ্ছ, স্বচ্ছন্দ। প্রথমদিকে খানিক বাপের বাড়ির কথা লিখে বিনয়িনী লিখেছেন শ্বশুরবাড়ির কথা। অনেক তথ্য আছে, তবে সব। ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার ধর্মপরায়ণ ভক্তিনত রূপটি। ধর্মচেতনার উন্মেষ হয়েছিল শৈশবেই। মায়ের কথামতো ভোরবেলায় উঠে বাগান থেকে ফুল কুড়িয়ে আনতে হত তাদের দুবোনকে। কার্তিক মাসে হত শ্ৰীধর ঠাকুরের। পূজো। ভোর ছটার মধ্যে ফুল নিয়ে তারা হাজির হতেন ঠাকুরঘরে। বড় পিসী কাদম্বিনী নানা ভাবে ঠাকুরকে সাজাতেন। কোনদিন হলদে কলকে, কোনদিন রক্তকরবী, কোনদিন সাদা রজনীগন্ধা দিয়ে সাজিয়ে ভাইঝিদের ডেকে দেখাতেন। পাঁচ নম্বর বাড়ির এই ছবিটি আমরা পেয়েছি বিনয়িনীর ডায়রি কাহিনী থেকেই। দুটো বাড়ির মেয়েদের জীবনে এই যে আকাশপাতাল বিভেদ সেটা বেশি করে ধরা পড়ে ইন্দিরা-প্রতিভা-প্রজ্ঞা-সুষমার জীবনযাত্রার সঙ্গে বিনয়িণী-সুনয়নীর জীবনযাত্রার তুলনা করলে। তার শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ প্রসন্নকুমার ঠাকুরের বাড়ির কথাও কাহিনীতে আছে। সেখানে দুর্গোৎসব হত ঘটা করে। সন্ধ্যারতির মনোজ্ঞ ও মূল্যবান বিবরণ পাওয়া যায় বিনয়িনীর রচনায়! ..তখন সন্ধ্যায় আরতি আরম্ভ হল, চারজন ব্রাহ্মণব্রতী এসে বসলেন। দুইজন চণ্ডীপাঠ করতে আরম্ভ করলেন অর একজন পুরোহিত ঠাকুরকে পুথি দেখে মন্ত্র বলে দিতে লাগলেন। সেই আশী বংসরের পুরোহিত ভক্তিপূর্ণ হয়ে মাকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন। রূপোর প্রদীপদানীতে ১০০৮ ঘৃত-প্রদীপ দিয়ে রূপোর ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি আরম্ভ হল। প্রতিমার দু পাশে মস্ত দুইটা পিতলের প্রদীপ, যার বুক পর্যন্ত উজ্জ্বল। প্রদীপে একসের ঘৃত ধরে। এইরূপ প্রদীপ তিন দিন তিন রাত জ্বলতে থাকল। নতুন উদ্যমের পাশে পুরনো। নিস্তরঙ্গ জীবনের অমন সহাবস্থান আর দেখা যাবে না।
বিনয়িনীর লেখা সর্বত্রই আশ্চর্য রকমের সাবলীল। স্বামীর মৃত্যুর কথাও তিনি ব্যক্ত করেছেন শান্তভাবে। পড়তে পড়তেই বোঝা যায় বিনয়িনী লিখেছেন একেবারে নিজের জন্যে। আর কারুর জন্যে নয়। একটু তাকে অনুসরণ করা যাক :
আগের দিন থেকে তার অসুখ বেড়েছে। আমাকে কোথাও উঠে যেতে। বারণ করলেন। পরদিন বিকেল ছটার সময় অকস্মাৎ তিনি চলে গেলেন। হাতে আমার হাত রেখে কি যেন বলে গেলেন সেটি আমি অনেক করেও বুঝতে পারলাম না। জীবনের সমস্ত সুখ এই সঙ্গে শেষ হল। তখন আমার যে ধৈর্যগুণ এল, এখন মনে হলে আশ্চর্য হয়ে থাকি। মনে হল এই যে যাওয়া আসা। এ তে কতকগুলো তৃণগুচ্ছ নদীর ঢেউয়ে কখনও একত্র হচ্ছে আবার সরে যাচ্ছে। এর জন্যে এত কাতরতা হচ্ছে কেন?
একজন সাধারণ নারীও যে শোকের সময় মাঝে মাঝে নির্বেদ বৈরাগ্যের সন্ধান পান তার দ্বিতীয় প্রমাণ বিনয়িনী। এর আগে পুত্রশোকে আচ্ছন্ন প্রফুল্লময়ীও দুঃখের মধ্যে হারানিধি সন্তানের বিচ্ছেদ ভুলতে পেরেছিলেন। যাইহোক, বিনয়িনীর কাহিনীর আরো একটি গুরুত্ব আছে। যতদূর মনে হয়, অবনীন্দ্রনাথের ঘোয়, জোড়াসাঁকোর ধারে এবং আপনকথা ও প্রতিমা ঠাকুরের স্মৃতিচিত্র লেখার প্রেরণা যুগিয়েছিল ৰিনঘিনীর আত্মকাহিনী। কেউ একজন পুরনো কথা বলতে বসলে সকলেরই স্মৃতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এখানে সেই পুরনো কথা বলবার দায়িত্ব প্রথমে নিয়েছিলেন বিনয়িনী।
০৯. দিদির মতো সুনয়নী
দিদির মতো সুনয়নীও ঘর–সংসার, ঠাকুর–দেবতা নিয়ে থাকতে ভালবাসতেন। তারই ফাঁকে ফাঁকে তিনি আঁকতেন রাধাকৃষ্ণ, হরপার্বতী, বালগোপাল, ননীচোরা, কৃষ্ণশোদার ছবি। কি করে ছবি আঁকতে হয় সুনয়নী শেখেননি। দুই দাদাকে নিবিষ্ট মনে দক্ষিণের বারান্দায় বসে ছবি আঁকতে দেখে-দেখে একটু বেশি বয়সে আপন মনেই ছবি আঁকা শুরু করেছিলেন। ছবি আঁকা তো নয়, আঁকা-আঁকা খেলা। আগে থেকে কিছু না ভেবে, তুলি বুলিয়ে জলে ডুবিয়ে ডুবিয়ে ধোয়া—তারই মধ্যে কখনো আভাস এল নাদুসনুদুস বালগোপাল কেষ্টঠাকুরের, কখনো লাজুকলতা কনে বৌয়ের হেসে ওঠা চোখ দুটির—আগে থেকে কিছু বোঝা যায় না। কিন্তু শিল্পী দাদাদের কোন প্রভাব সুনয়নীর ছবিতে নেই। আধুনিক ভারতীয় চিত্রকলার নব উদ্বোধনের যুগে তিন ভাইবোন বেছে নিলেন তিনটি পথ। অবনীন্দ্র গ্রহণ করলেন পারশিয়ান ও মোগল টেকনিক! গগনেন্দ্র নিলেন জাপানী ও কিউবিষ্টিক ধারা আর সুনয়নী একেবারে জনসাধারণের আট অর্থাৎ পটশিল্পের ভিত্তির ওপর আঁকলেন তার একান্ত নিজস্ব ছবি। পটের ছবির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ টানা-টানা দীঘল দুটি কালো চোখের গহিন ছায়ায়। সুনয়নীর ছবিতেও স্বভাবশিল্পী পটুয়াদের আঁকা চোখদুটি চোখে পড়ে। এ ধরনের চোখ আঁকার ব্যাপারে সুনয়নী যামিনী রায়েরও পূর্ববর্তিনী।
সুনয়নী ছবি আঁকতেন আপন খেয়ালে। তিনিই বাঙালী মহিলা চিত্রশিল্পীদের পথিকৃৎ। তখনকার দিনে যে মেয়ের ছবি আঁকত না তা নয়। বিশেষ করে যারা পশ্চিমের ফ্যাশান দুরস্ত ছিলেন তাদের তো কথাই নেই। ঘোড়ায় চড়া, ইংরেজীতে কথা বলা, পিয়ানো বাজানোর মতোই ছবি আঁকাঁটাও ছিল তাদের গুণের নিদর্শন। ঠাকুরবাড়ির ট্রাডিশন ভেঙে হেমেন্দ্রনাথও তার স্ত্রী ও মেয়েদের ছবি আঁকা শিখিয়েছিলেন। প্রতিভার আঁকা দু-একটা ছবি ছাপা হয়েছিল পুণ্যে। প্রজ্ঞার আঁকা দু-তিনটে পোট্রেট বেশ ভাল হয়েছিল। সুতরাং ছবি আঁকার চেষ্টা যে সুনয়নীর পক্ষে খুব নতুন তা নয়। নতুন তার দৃষ্টিভঙ্গির নতুনত্বে। এতদিন যারা ছবি এঁকেছেন তাঁর আঁকার চেয়ে বেশি ওপরে ওঠেননি। মানুষ বা প্রতিকৃতি যাই হোক না কেন তারই অনুকরণ করেছেন তারা। নীপময়ী, প্রতিভা, প্রজ্ঞা সম্বন্ধেও একথাই খাটে। কিন্তু সুনয়নী যা দেখলেন তাই আঁকলেন না। ছবির সঙ্গে মিশে রইল এক অধরা সৌন্দর্য। তাই তার ছবিতেই প্রথম দেখা দিল স্বকীয়তা। প্রথম প্রথম তিনি ছবি নিয়ে দেখাতে যেতেন দাদাদের।
