শুধু নতুন লেখক আবিষ্কার নয়, সরলা ভারতীকে সমৃদ্ধ করেছিলেন কয়েকজন মনীষীর দুল ভ ইংরেজী রচনার অনুবাদ করিয়ে। এই রচনাগুলি হল?
ক) ভগিনী নিবেদিতার প্রত্যেক মা ছেলের জন্য কি করতে পারে (জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬), বঙ্গমাতার কর্তব্য। শ্রাবণ ১৩০৬)
খ) মহাদেব গোবিন্দ রানাডের-পূর্বকালের সমাজ শাসন (শ্রাবণ ১৩০৭)
গ) মোহনদাস করমচঁদ গান্ধীর-দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতোপনিবেশ (বৈশাখ ১৩০৯)।
শোনা যায় এই ভারতী সম্পাদনাসূত্রেই সরলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের। বিপত্নীক, উন্নতরুচি, সাহিত্যপ্রেমিক প্রভাতকুমারের সঙ্গে বোধহয় সরলার বিবাহের কথাবার্তাও হয়েছিল এবং নিজেকে আরো যোগ্য করে তোলার জন্যে প্রভাতকুমার ব্যারিস্টার হবার জন্যে বিলেত যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বিয়ে হয়নি। প্রভাতকুমারের গোড়া হিন্দু জননীর প্রবল বিরোধিতায় বিয়ের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যার। আরো কয়েকজনের নামও শোনা গেছে সরলার ভাবী বর হিসেবে। তবে মনে হয়, এ সবই অলীক কল্পনা। আমাদের দেশে বয়স্থা অনুঢ়া মেয়েকে নিয়ে জল্পনা করা চিরকেলে স্বভাব। সরলা বহুদিন অবিবাহিত ছিলেন, প্রায় তেত্রিশ বছর। বিয়ের বয়স হিসেবে বয়সটা আজকের যুগেও বেশি। তাই কথা তো উঠবেই। আসলে এ ব্যাপারে প্রথম দিকে সরলার আগ্রহ ছিল না। স্বদেশপ্রেমিকা তেজস্বিনী মেয়েকে দেশের কাজে কুমারী রাখার আগ্রহ ছিল স্বর্ণকুমারীরও। এমনকি মহষি ও প্রস্তাব করেছিলেন সরলার বিয়ে হবে খাপখোলা তলোয়ারের সঙ্গে। ফলে বয়স বাড়ে। শেষে যার সঙ্গে সরলার বিয়ে হল তিনি সত্যিই সরলার যোগ্য স্বামী, পাঞ্জাবের বিপ্লবী নেতা খাপখোলা তলোয়ারের মতো তেজস্বী রামভজ দত্ত চৌধুরী।
ভারতীতে সরলা নিজেও নানারকম রচনা লিখতেন। গান-কবিতা-গল্পউপন্যাস-রম্যরচনা সমালোচনা-অনুবাদ-আর বাকী রইল কী! স্মৃতিকথা? তাঁর শেষ জীবনে লেখা জীবনের ঝরাপাতা একটি অসাধারণ রচনা। সমসাময়িক যুগের দর্পণ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এছাড়া তার সংস্কৃত কাব্য আলোচনা করে লেখা কয়েকটা প্রবন্ধ রতিবিলাপ, মালতীমাধব, মালবিকাগ্নিমিত্র, মৃচ্ছকটিক অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্ৰ শ্ৰশ মজুমদারকে এই প্রবন্ধগুলো দেখিয়ে বলেছিলেন, লেখিকার বয়স বিবেচনা করিলে বলিতে হয় ও বয়সে আমাদেরও অমন লেখা সহজ হইত না। তাহার সমালোচনা পড়িয়া নাটকগুলি আবার নতুন করিয়া পড়িতেছি। সরলার সব রচনার কোন সংকন আজও প্রকাশিত হয়নি।
মৌলিক রচনার হিসেবে সরলার প্রথম উল্লেখযোগ্য রচনা প্রেমিক সভ লেখকের নামহীন লেখাটি বেশ প্রশংসা পায়। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং অভিনন্দন জানিয়ে ভগ্নীকে লিখলেন, নাম দিসনি বলে তোর এ লেখার ঠিক যাচাই হল। নতুন হাতের লেখার মতো নয়, এ যেন পাকা প্রতিষ্ঠ লোকের লেখা। এ যদি আমারই লেখা লোকে ভাবত, আমি লজ্জিত হতুম না। এর চেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট আর কি হতে পারে? এরপর সরলা বেশ কয়েকটা সুখপাঠ্য গল্প লেখেন।
কিন্তু আগেই বলেছি, সরলার জীবনে সাহিত্য বা সঙ্গীত প্রধান নয়। তার জীবনে সবচেয়ে বড় ছিল তার স্বদেশপ্রেম। সাহিত্য বা সঙ্গীত তাঁকে স্বদেশহিতৈষণার পথে সাহায্য করেছিল কিংবা বলা যায় সরলা তার রাজনৈতিক কাজে এ দুটিকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। ঠাকুরবাড়ির কোন ছেলেও তখন সরলার মতো চরমপন্থী রাজনীতি নিয়ে মেতে ওঠেননি। সৌম্যেন্দ্রনাথ এসেছেন অনেক পরে। সরলার মধ্যে স্বদেশচেতনার আগ্রহ জাগিয়ে দিয়েছিলেন তার বাবা-মা। জানকীনাথ ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের মেরুদণ্ড। স্বর্ণকুমারী প্রথমে হিন্দুমেলায় যোগ দিয়ে মেয়েদের মধ্যে সর্বপ্রথম স্বদেশিয়ানার সুচনা করেন। তার সখিসমিতি, শিল্পমেলার মধ্যেও স্বদেশপ্রেমের বীজ লুকিয়েছিল। রল। স সেরি এলেন রাজনীতিতে। ১৮৯৫ সাল থেকেই তিনি ভারতীর মারফত বাঙালী যুবমানসকে বীমন্ত্রে দীক্ষা দেবার চেষ্টা করেন। মৃত্যুচর্চা, ব্যায়াম চর্চা, বিলাতি ঘুষি বনাম দেশী কিল বাঙালীর মুমূযু আত্মসম্মানকে জাগিয়ে দিল। সুস্থ সবল জীবন যাপন ও অপমানের প্রতিরোধে মৃত্যুও ভাল এই বোধে সবাই উদ্বুদ্ধ হতে শুরু করল। সারা দেশে বইল উদ্দীপনার জোয়ার। দলে দলে স্কুল কলেজের ছেলেরা এল সরলার কাছে। সরলা তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজনকে বেছে বেছে একটা দল করলেন। ভারতবর্ষের কখানি। [চত্র তাদের সামনে রেখে প্রতিজ্ঞা করাতেন তনু মন দিয়ে ভারতের সেবা করার। শেষে হাতে একটি রাখি বেঁধে দিতেন তাদের আত্মনিবেদনের সাক্ষী হিসেবে। অবশ্য সরলার এই সমিতি ঠিক গুপ্ত সমিতি ছিল না তবে মুখে মুখে রটানো বারণ ছিল।
বছর কয়েক পরে এই লাল সুতোর রাখিবন্ধন দেশময় ছড়াল রবীন্দ্রনাথের জন্যে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের দিনে তিনি হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার হাতে পরিয়ে দিলেন মিলনরাখি। সরলার রাখিবন্ধনের কথা মনে হলেই মনে পড়ে যায় চার অধ্যায়ের এলাকে। তার হাতের রক্ততিলক ছেলেদের মনে দারুণ উদ্দীপনা সৃষ্টি করত। এই জাতীয় দলনেতৃত্ব ঠাকুরবাড়িতেই প্রথম নয়, বাংলাদেশেও প্রথম। বিদেশেও কি সুলভ ছিল? ইংলণ্ডে তখন মেয়েরা ভোটাধিকারের জন্যে লড়াই করছেন। কল্পনা করা যায় কি ঠিক সেই সময়ে ছেলেদের বীর্যমন্ত্রে দীক্ষিত করছেন একটি বাঙালী মেয়ে!
