সরলার সঙ্গীতচর্চা মহর্ষিরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি তাকে হাফিজের একটি কবিতায় সুর বসাতে দিলেন। এক সপ্তাহ পরে সরলা বেহালা বাজিয়ে গেয়ে শোনালেন হাফিজ। দেবেন্দ্রনাথ মজে মজে শুনলেন। খুব ভাল গান না হলে তিনি শুনতে চাইতেন না। বাড়ির লোকদের মধ্যে তিনি ভালবাসতেন রবীন্দ্রনাথের গান আর প্রতিভার পিয়ানো বাজানো শুনতে। যাইহোক, সরলার গান শুনে শুধু খুশিই হলেন না, গায়িকাকে উপহার দেবার ব্যবস্থাও করলেন। এল হাজার টাকা দামের হীরে-চুনি সেট করা জড়োয় নেকলেস। ঘরোয়া সভায় নেকলেসটি সরলার হাতে তুলে দিয়ে মহর্ষি বললেন, তুমি সরস্বতী! তোনার উপযুক্ত না হলেও এই সামান্য ভূষণটি এনেছি তোমার জন্যে।
গান সংগ্রহ ও সুর সংগ্রহ ছিল সরলার নেশার মতো। বাউল গান, আর দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতে ভরা একটি গানের ডালি তিনি উপহার দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। কবি সেই গানকে ভেঙে-ভেঙে অনেক নতুন গান সৃষ্টি করেছেন। ইন্দিরাও এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের ত্রিবেণীসঙ্গমে। সরলার আনা সুরে রবীন্দ্রনাথ নিজের কথা বসিয়ে যে গান রচনা করেন সেগুলো হচ্ছে, আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, এসো হে গৃহদেবতা, এ কি লাবণ্যে, চিরবন্ধু চিরনির্ভর ইত্যাদি।
এ তো গেল গানের কথা। অনেকেই জানেন না বন্দেমাতরম্ গানের প্রথম সুর রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে সরলাই দিয়েছিলেন। কবি প্রথম দু লাইনের সুর বসান। সরলা নিজেও গান লিখতেন এবং সেইসব দেশাত্মবোধক গান প্রচুর উন্মাদনা সৃষ্টি করত। কিন্তু সে প্রসঙ্গে আমরা পরে যাব। আপাতত সরলার সাহিত্যচর্চার কথা সেরে নিই। এত কাজের ফাঁকে সরলা লিখেছেনও প্রচুর। বারো বছর বয়সেই একটা কবিতা লিখে পুরস্কার পেয়েছিলেন সখা পত্রিকা থেকে। প্রথম প্রবন্ধ পিতামাতার প্রতি কি ব্যবহার করা কর্তব্য। সেই শুরু, তারপর থেকে তো নিয়মিত লিখছেন ভারতীতে। প্রথমবারে যুগ্ম সম্পাদিকা থাকার সময় না হলেও পরে এককভাবে ভারতী সম্পাদনার সময় তিনি লিখতেন। প্রচুর। এ সময় তিনি মহীশূর থেকে ফিরে এসেছেন। বছর কয়েক আগে তিনি এম. এ. পড়া ছেড়ে মহীশূরের মহারাণী পাল স্ স্কুলে চাকরি নিয়ে চলে যান দক্ষিণ। ভারতে। ঠাকুরবাড়িতে এও নতুন ঘটনা। বাইরের অনেকেও সরলার চাকরি করতে যাওয়াটা ভাল চোখে নেয়নি। বঙ্গবাসী কাগজ ফোঁস করে মন্তব্য করল, এ ঘরের মেয়ের একলা একল। বিদেশে চাকরি করতে যাওয়ার দরকারটা কি? খাওয়া-পরার তো অভাব নেই? কেন খামোকা নিজেকে বিপদগ্রস্ত করা? এই ছিল সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য। যেন খাওয়া-পরার প্রয়োজনই সব। এর মেয়েদের এগিয়ে যাওয়াকে চিরকাল সন্দেহের চোখে দেখে এসেছেন। আর ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের তো কথাই নেই। তাদের কার্যকলাপ এদের একেবারে ভাল লাগেনি। মনে হয়েছে সব তাতেই বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টা! কিন্তু ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা এগিয়েছেন প্রাণের দুর্বার আবেগে। বিপদকে তুচ্ছ করেছেন সরলা, তিনি কি ঘরে বসে থাকতে পারেন? আর তিনি তো একলা নন, আরো কত মেয়েই এগিয়ে গেছেন। তিনি যখন মহীশূরে গেলেন। তার আগেই সেখানে গিয়েছেন কুমুদিনী খাস্তগির।
যাইহোক, দেশে ফিরে আবার ভারতী নিয়ে বসলেন সরলা। কাগজে একেবারে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিলেন আগামী মাসে শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি সামাজিক প্রহসন লিখবেন। কাগজ পড়ে তো রবীন্দ্রনাথের চক্ষুস্থির। সে কী! তিনি কিছুই জানেন না আর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়ে গেল! বকতে আরম্ভ করলেন, কেন তুই আমাকে না জানিয়ে বিজ্ঞাপন দিলি? আমি লিখব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখতেই হল। সরলা নতুন সম্পাদিকা, তাকে বিপদে ফেলতে মন চাইল না। লেখা হয়ে গেল চিরকুমারসভা। তবে সরলার এই রকম কাজের জন্যে কিংবা লেখার তাগিদে কবি পরবর্তীকালে বেশ বিরক্ত হয়ে ওঠেন। কিন্তু নিরপেক্ষ বিচারে দেখা যাবে সরলার খুব একটা দোষ ছিল না। সম্পাদিকা হিসেবে সরলা খুবই বিচক্ষণতার পরিচয় দিতেন। লেখকদের পারিশ্রমিক দেবার প্রবর্তন করেন তিনিই। ভারতীকে নানাভাবে তিনি সার্থক করে তুলেছিলেন। বালক, সাধনা, পুণ্যর মতো ভারতী শুধু ঠাকুরবাড়ির কাগজ হয়ে যে। থাকেনি সে কেবল সরলার গুণে। তিনি গুণী লেখকদের খুঁজে বার করতেন এবং সুযোগ দিতেন। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। শরৎচন্দ্র বোধহয় সবে তখন গল্প লেখা শুরু করেছেন। কুণ্ঠা যায়নি। রয়েছেন বর্মায়। সেই সময় তার মামা বড়দিদি গল্পটির পাণ্ডুলিপি দিয়ে এলেন প্রবাসীতে। কিছুদিন পড়ে থাকার পর রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সেটি ফেরৎ দিলেন অমনোনীত রচনা বলে। সুরেন গঙ্গোপাধ্যায় আর কি করেন? তিনি সেটি নিয়ে এলেন ভারতীর অফিসে। সে সময় সরলা পাঞ্জাব থেকে এসেছেন কিছুদিনের জন্যে। ভারতীর সুব্যবস্থা করতে। তাঁকে গল্পটি দেখানো হল। তিনি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বললেন, চমৎকার! এক কাজ কর, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় তিন মাসে ছাপাও বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় নাম দিও না, সকলে মনে করবে রবীন্দ্রনাথের লেখা। আমাদের দেরির ক্রটি ঘুচবে এবং গ্রাহক-গ্ৰাহিকা বাড়বে। আষাঢ় সংখ্যায় বড়দিদি শেষ হবে, আর সেই সংখ্যায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখকের নাম ছাপবে। তাই হল এবং দেখা গেল সরলার সব অনুমানই সত্যি। অনেকে রবীন্দ্রনাথকে গিয়ে প্রশ্ন করলেন বড়দিদির কথা। বিস্মিত রবীন্দ্রনাথ জানালেন লেখক তিনি নন, তবে গল্পটি নিঃসন্দেহে কোন শক্তিশালী লেখকের লেখা। তিনিও কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। ঔৎসুক্য প্রকাশ করলেন গগনেন্দ্র অবনীন্দ্র ও আরো অনেকে। নাম না থাকায় বড়দিদি ক্রমশই কৌতূহল বৃদ্ধি করে এবং এরপর শরৎচন্দ্রের প্রতিষ্ঠাও সহজ হয়ে গেল।
