স্বর্ণকুমারীর মধ্যে যে রাজনৈতিক চেতনা ও দেশভক্তির উন্মেষ দেখা দিয়েছিল। তার পূর্ণ বিকাশ ঘটল তাঁর মেয়ে সরলার মধ্যে। সরলার মতো তেজস্বিনী নারী বিরল-যেন কোষমুক্ত-কৃপাণলতা, বাংলার জোয়ান অব আর্ক, ভারতের প্রথম চারণী। সাহিত্য-সঙ্গীত-স্বাদেশিকতার ত্রিধারাকে তিনি বইয়েছিলেন এক খাতে, তবে আমাদের মনে হয় সঙ্গীত ও সাহিত্য দুই-ই তাঁর স্বদেশচেতনার অনুগামী। সরলার প্রথম জীবন কেটেছিল জোড়াসাঁকোতে আর সব বোনেদের মতোই—শুধু মনে ছিল একটা চাপ বেদনা। লেখাপড়ায় মগ্ন মা তাঁকে ভালবাসেন না। বাসেন না কি আর? তবে বহিঃপ্রকাশটা বড় কম। সেকেলে অভিজাত পরিবারের এই তো দস্তুর! একান্নবর্তী বিশাল পরিবার। সেখানে মা কেন মেতে থাকবেন নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে? তাদের জন্যে তে দেখাশোনা করবার জন্যে ঝি আছে। ঠাকুরবাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের জন্যে এক বা একাধিক খাস চাকর বা খাস ঝি থাকত। ছেলেদের জন্যে চাকর, মেয়েদের ঝি আর দুগ্ধপোষ্যদের জন্যে দুধ মা-এর নড়চড় হত না। সব দেখে মনে হয় সেকালের বড়লোকদের বাড়িতে শিশুরাই ছিল সবচেয়ে অসহায়। অবশ্য সরলা দেখতেন তার মা-মাসীরা নিজেদের সন্তানদের সম্বন্ধে যতটা উদাসীন ছিলেন মামীরা অর্থাৎ ঠাকুরবাড়ির বৌয়েরা তা ছিলেন না। তারা বাইরে থেকে আসতেন ভিন্ন পারিবারিক ধারা নিয়ে, সন্তানদের টেনে নিতেন বুকে। বিশেষ করে জ্ঞানদানন্দিনী, তিনি তার ছেলেমেয়েদের খুব ভালবাসতেন, তাদের ঘটা করে জন্মদিন হত। তাদের জন্যে দুধ মা বা খাস ঝি-চাকর থাকলেও মাতৃস্নেহে ভঁটা পড়ত না। দুঃখ শুধু সরলার। ক্ষুব্ধ অভিমানে ছোট্ট বুকটা ভরে উঠত।
হয়ত মায়ের উদাসীনতা অভিমানী মেয়ের বুকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস সৃষ্টি করেছিল, তাই সরলা মন দিয়েছিলেন লেখাপড়ার দিকে। মাত্র তেরো বছর বয়সে বেথুন থেকে এনট্রান্স পাশ করে সরলা বোধহয় প্রথম সবার চোখে পড়লেন, এমনকি মায়েরও। চোখে পড়ার কারণও ছিল। এনট্রান্স পরীক্ষার সময়, ইতিহাসের প্রশ্নের মধ্যে মেকলের লেখা লর্ড ক্লাইভ গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে ক্লাইভের বঙ্গবিজয় সম্বন্ধে একটা প্রশ্ন করা হয়েছিল। সরল মেকলের আঁকা বাঙালী চরিত্রের হেয় তার প্রতিবাদ করে নিজেই বিপরীত মন্তব্যপূর্ণ উত্তর এমন যুক্তি তেজ ও আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন যে, পরীক্ষক এন. ঘোষ এই ছাত্রীকে সর্বাধিক নম্বর দিয়ে, খোঁজ করেছিলেন মেয়েটি কে? ইতিহাসের পরীক্ষায় সরলাই সেবার প্রথম হয়েছিলেন। সবাই দেখলেন সরলা রাতারাতি বড় হয়ে উঠেছেন। তাই তো! কখন বড় হয়ে উঠল সরলা? রূপের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা সরলা এগিয়ে গেলেন সবার আগে। ঠাকুরবাড়িতে এর আগে কোনো মেয়ে পরীক্ষায় বসেনি। শুধু এনট্রান্স নয়, সরলা এরপর পাশ করলেন বি. এ. (১৮৯০)। সতেরো বছর বয়সে। বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজীতে অনার্স নিয়ে। ইন্দিরা তখনও পরীক্ষা দেননি। সরলা সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান পদ্মাবতী স্বর্ণপদক। তিনিই এ মেডেল প্রথম পান। সংখ্যার দিক থেকে তিনি ছিলেন সপ্তম মহিলা গ্র্যাজুয়েট। এরপর তিনি ভেবেছিলেন সংস্কৃতে এম. এ. পড়বেন, নানা কারণে পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। বিষয় নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য থেকেই সরলার খেয়ালখুশি ও জেদের পরিচয় পাওয়া যায়। বি. এ. পড়বার আগে তিনি স্কুলে পড়েছিলেন সায়েন্স। সে সময় মেয়েদের সায়েন্স পড়ার সুযোগ ছিল না তাই সরলা জেদ করে দাদাদের সঙ্গে ডাক্তার মহেন্দ্রনাথ সরকারের সায়েন্স এ্যাসোসিয়েশনের সান্ধ্য-লেকচারে যাবার অনুমতি নিলেন। সেখানে সরলা একমাত্র ছাত্রী, তাই তিনি বসে থাকতেন অধ্যাপকদের ঘরে! তাঁরা ক্লাসে এলে সরলাও আসতেন। দুপাশে দুই দাদা—জ্যোৎস্নানাথ ও সুধীন্দ্রনাথ। তিনটে স্বতন্ত্র চেয়ার থাকত সামনের লাইনে, সেখানে বসতেন দুপাশে দুই দাদাকে নিয়ে সরলা আর বাকী ছাত্ররা বসত বেঞ্চে। আড়ালে ফিসফিস করে দুই দাদাকে দেখিয়ে ছেলেরা বলত বডি গার্ডস। কিন্তু এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে যে সায়েন্স পড়া, সেই সায়েন্সের ওপর কোনো আকর্ষণই ছিল সরলার। থাকলে তিনি কাদম্বিনী গাঙ্গুলী বা অবলা বসুর মত চিকিৎসক হতে চাইতেন। কিংবা বিধুমুখী বসু ও ভার্জিনিয়া মিত্রের মতো। মনে রাখতেন ঐ মহিলাদের অবিস্মরণীয় ডাক্তারী পড়ার কাহিনীকে। কাদম্বিনীকে দেখে মনে হয় কোন বাধাই বুঝি বাধা নয়। অবলাও কম যান না, তিনি মাদ্রাজে গিয়েও ডাক্তারী পড়তে রাজী হয়েছিলেন। এমনকি স্বর্ণকুমারীর মতো বিজ্ঞানমনস্কতা থাকলেও সরলা বিজ্ঞানচর্চায় অনেক উন্নতি করতে পারতেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির কোনো মেয়েই বিজ্ঞান-সচেতনতার পরিচয় দিতে পারেননি। পরবর্তী যুগেও তারা শুধু চর্চা করেছেন সাহিত্য ও শিল্পকলার। আর সরলার আগ্রহ ছিল অন্য দিকে তাই তিনি বিচিত্র বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন, হয়ত খুজেছেন ঈপ্সিত পথ।
শুধু লেখাপড়া নয়, গানেও সরলার আগ্রহ কম ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাংলা গানে ইংরেজী কর্ড ব্যবহার করে ইংরেজী piece রচনা করতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা গানের স্বরলিপি তৈরি করা ছাড়াও তিনি কয়েকটা গানকে য়ুরোপান্বিত করলে কবি খুব খুশি হয়ে ওঠেন। সকাতরে ঐ কঁদিছে গানটিকে সরলা যখন রীতিমতো একটা ইংরেজী বাজনার piece-এ পরিণত করলেন তখন সেটা পুরোদস্তুর ব্যাণ্ডে পিয়ানোতে বাজাবার যোগ্য হল। উৎসাহিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে বললেন নিঝরের স্বপ্নভঙ্গের পিয়ানো সংগত তৈরি করতে। সেও হল। সরলার তখন বয়স মাত্র বারো। কবি তাকে জন্মদিনে উপহার দিলেন একটা য়ুরোপীয় গান লেখার খাতা। দিয়ে বললেন, এইতে লিখে রাখ, ভুলে যাবি।
