আগে বলেছি, সুদক্ষিণার পোষাকী নাম ছিল পূর্ণিমা। এই নামে তিনি একটি গানে সুর দিয়েছিলেন। সেই সুরের নাম দি ইনডিয়ান ভিলেজগার্ল। রেকর্ডে এই অর্কেস্ট্রা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল কিন্তু সুদক্ষিণা এর কৃতিত্ব সবটাই দিতে চাইতেন তার দাদা হিতেন্দ্রনাথকে। সম্ভবত হিতেন্দ্রের নির্দেশেই তিনি এই রেকর্ডটির সুর সৃষ্টি করেন।
মহর্ষির পৌত্রীদের মধ্যে বাকি রইলেন আর তিনজন, রবীন্দ্রনাথের তিন কন্যা। কিন্তু কবির মেয়েদের আগে আরও দুজনের কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। এঁরা দুজন আর কেউ নয়, স্বর্ণকুমারীর দুই গুণবতী মেয়ে হিরন্ময়ী ও সরলা। সময়ের দিক থেকে তারা প্রতিভা, ইন্দিরা, সরোজা, প্রজ্ঞাদের সমসাময়িক। আসলে হিরন্ময়ী ও সরলা ঘোষাল বংশের মেয়ে কিন্তু তাদের ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হতে তেমন বাধা ছিল না। বরং তাঁরা ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হিসেবেই সর্বজনপরিচিত। সেটাই স্বাভাবিক। হিরন্ময়ী ও সরলার শৈশব কেটেছে এই বিশাল মায়াপুরীর সোনালি দিনগুলোতে। স্বর্ণকুমারী থাকতেন তিন তলার এক অংশে। মেয়েরা থাকতেন বাড়ির অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে। পরে স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথ যখন অন্য বাড়িতে গিয়েছেন তখনও তার প্রতিদিন আসতেন ঠাকুরবাড়িতে কিংবা ঠাকুরবাড়ি থেকে কেউ না কেউ যেতেন তাদের বাড়ি। সুতরাং হিরন্ময়ী ও সরলা ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের সদস্য। রূপেই পরিচিত।
হিরন্ময়ী ছিলেন সব কাজেই মায়ের যথার্থ সঙ্গিনী। ভারতী পত্রিকা সম্পাদনায়, সখিসমিতি পরিচালনায় স্বর্ণকুমারী হিরন্ময়ীর সাহায্য পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু হিরন্ময়ীর হাতে যখন ভারতী সম্পাদনার ভার এল তখন তিনি প্রবাসিনী সরলাকেও সম্পাদনার কাজে টেনে নিলেন। তাই দেখা যাবে হিরন্ময়ীর সব কাজেই জড়িয়ে আছেন সরলা। এমনকি কর্মজীবনের শুরুতেও তারা দুই বোনে মিলে মেয়েদের জন্যে একটা পাঠশালা খুলেছিলেন কাশিয়াবাগানে, তাদের নিজের বাড়িতে। এখনকার বয়স্ক শিক্ষার আদিরূপ বলা যায় সেটাকে। তাদের বাড়ির পুকুরে জল নিতে আসত পাড়ার বৌঝিরা। তাদের মধ্যে থেকে গোটা কুড়ি কুমারী ও বালবিধবা নিয়ে এই স্কুল শুরু হয়েছিল। প্রধান শিক্ষিকা হিরন্ময়ীর তখন বয়স চোদ্দ-পনেরো বছর। সহশিক্ষিকা সরলা। দশে পড়েছেন। দুজনে মিলে ছাত্রীদের শেখাতেন বাংলা, ইংরেজী, গান আর সেলাই। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে চারটে থেকে সাড়ে ছটা পর্যন্ত এই স্কুল বস্ত। জোড়াসাঁকো থেকে যারা আসতেন তারা ছাত্রীদের পরীক্ষা নিতেন। পুরস্কার দেওয়া হত। একবার রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে প্রাইজ বিতরণ করান হয়।
বিয়ের পরে হিরন্ময়ী তার মায়ের সখিসমিতিকে একটু অদলবদল করে বিধবা শিল্পাশ্রমে পরিণত করেন। সখিসমিতির তখন জীর্ণাবস্থা। ইতিপূর্বে হিরন্ময়ী শশিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত বরানগরের একটি বিধবা শিল্পাশ্রমের সঙ্গে পরিচিত হন। তারপর তিনি সখিসমিতিকেও নতুন আদলে গড়ে তৈরি করলেন বিধবা শিল্পাশ্রম। তাঁর মৃত্যুর পরে এই আশ্রমের নাম হয় হিরন্ময়ী বিধবা শিল্পাশ্রম। মেয়েদের হাতের কাজ, সেলাই প্রভৃতির জন্যে এখান থেকে মেডেল দেওয়া হত। গগনেন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে সুজাতাও এখান থেকে মেডেল পেয়েছেন হাতের কাজের জন্যে।
হিরন্ময়ীর সামাজিক কাজকর্মের আড়ালে লুকিয়েছিল একটি শিল্পীসত্তা। বেথুন স্কুল থেকে মাইনর পরীক্ষা পাশের পর হিরন্ময়ী আর স্কুলে পড়েননি তবে সাহিত্যের সঙ্গে তার যোগ ছিল। সখা, বালক ও ভারতীতে তার অনেক লেখা ছাপা হয়। সে সব লেখা আজও পুরনো পত্রিকার পাতাতেই ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে। কেউ সযত্নে সংগ্রহ করে প্রকাশ করার চেষ্টা করেননি। ভারতী সম্পাদনা করবার সময় তিনি একাই সব কিছু দেখাশোনা করতেন। প্রবাসিনী সরল। ছিলেন নামে মাত্র যুগ্ম-সম্পাদিকা। কাজ হিরন্ময়ীকে ই করতে হত। তাঁর নিজের লেখা ভারতীতে আছে বোধহয় চব্বিশটি। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি রাশিয়া নিয়ে লেখা। প্রবন্ধগুলি মৌলিক নয়, অনুবাদ-তাহলেও ভাষার ওপর তাঁর দক্ষতা ও বিষয় নির্বাচনের ক্ষমতা প্রশংসার যোগ্য। রুশিয়া, রুশিয়ার কারাগার, রুশিয়ার বাণিজ্য, রুশিয়ার ভাষা ও বাণিজ্য, রুশিয়ার শাসনপ্রণালী বেশ মননধর্মী রচনা।
হিরন্ময়ীর মৌলিক রচনা কয়েকটি সনেট। সরলার ভাষায় বলা যায়, যেমন কারুর কারুর গানের গলা মিষ্ট ও করুণ অথচ সে বড় গাইরে নয় তেমনি হিরন্ময়ীর কবিতাগুলোও করুণ-মধুর। ভারতীর প্রতি ছিল তার আন্তরিক অনুরাগ। তাই তার ভার নিয়েও মনে জমেছিল শংকা। কি জানি কি হয়? তিনি অনেক চেষ্টা করে ভারতীর ভার তুলে দিলেন তার মামা রবীন্দ্রনাথের হাতে। কবি ভার নিয়েছিলেন মাত্র এক বছরের জন্যে। তারপর কি হবে? সে কথাই হিরন্ময়ী প্রকাশ করেছেন একটি সনেটে। তাতে তিনি বলেছেন রবি যদি অস্ত যায় আসে অন্ধকার, তবু রব কাছে, বাস্তবিকই পরম আদরে তিনি রবিহারা ভারতীকে তুলে নিয়েছিলেন বুকে। তাঁর জীবৎকালে ভারতীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়নি। ভারতী যখন বন্ধু হয়ে যায় হিরন্ময়ী তখন পরলোকে। হিরন্ময়ীর সাহিত্যানুরাগ সঞ্চারিত হয়েছে তার বিদুষী কন্যা কল্যাণীর মধ্যেও। নাথকাল্টের ওপর অত্যন্ত মূল্যবান ও পরিশ্রমসাধ্য গবেষণা করে তিনি পি-এইচ. ডি. উপাধি লাভ করেন বেশ কয়েক বছর আগে। তার গবেষণ! গ্রন্থটির নাম নাথসম্প্রদায়ের ইতিহাস দর্শন ও সাধনপ্রণালী।
