আট বোনের মধ্যে সবার ছোট বোন সুদক্ষিণা। পোষাকী নাম পূর্ণিমা। জন্মের পরই বাবাকে হারিয়ে সুদক্ষিণা বড় হয়েছিলেন দাদা-দিদিদের আদর যত্নে। বাপের বাড়িতে যতদিন ছিলেন ততদিন তাকে চেনাই যায়নি। চাঁদের ষোলকলার মতো যখন তার রূপ আর অভিমান দুকূল ছাপিয়ে বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়ল তখন যেন সবার চোখ খুলল। তাই তো! এ যে রাজরাজড়ার ঘরে যাবার উপযুক্ত। সুদক্ষিণা কি শুধু সাধারণ ঘরের শিক্ষিত ছেলের জীবনসঙ্গিনী হবেন, না হতে পারেন? তার জন্যে খুঁজতে হবে মনের মতো বর। অচিরেই পাওয়া গেল। বুধাওনের অধিবাসী হরদৈ জেলার জমিদার পণ্ডিত আলাপ্রসাদ পাণ্ডে। শোনা যায়, জমিদার হওয়া সত্ত্বেও তিনি নাকি ছিলেন। আই-সি-এস অফিসার। হিন্দুস্থানী কেতায় পালকি চেপে উত্তরপ্রদেশে স্বামীর ঘর করতে চলে গেলেন সুদক্ষিণা। ঠাকুরবাড়ির একটি স্ফুলিঙ্গ গিয়ে পড়ল অনেক দূরে। তারপর দাবানলে যখন পরিণত হলেন তখন জলপ্রসাদ পরলোকে।
সুদক্ষিণার কার্যক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশের হরদৈ-বুধওন-শাজাহানপুরে, তাই বাংলা দেশে তিনি একরকম অপরিচিত। আমরা সুনৃতার মতো তাকেও পাই পুণ্য পত্রিকার পাতায়। রান্নার লক্ষ্মৌ প্রণালী লিখতেন তিনি। প্রজ্ঞার মতো হয়ত তাঁরও রান্নার হাতটি ভাল ছিল কিংবা বাপের বাড়ির দেশের লোকের মুখে শ্বশুরবাড়ির দেশের সুখাদ্য তুলে দেবার স্বাভাবিক ইচ্ছেয় তিনি কলম ধরেছিলেন। নয়ত রান্নাঘরের ঘোমটা-ঢাকা বৌটির ভূমিকায় তাকে মানায় না।
জ্বালা প্রসাদ সস্নেহে স্ত্রীকে জমিদারী পরিচালনা শিখিয়েছিলেন। তার কাছে সুদক্ষিণা শিখেছিলেন ঘোড়ায় চড়া ও বন্দুক ছোঁড়া। অর্থাৎ উগ্র আধুনিকারা সেকালে যা যা শিখতেন সে সবই শিখেছিলেন তিনি। ইংরেজী বলতেন মেম সাহেবের মতো। স্বামীর মৃত্যুর পরে ঘোড়া ছুটিয়ে তিনি গ্রামেগ্রামান্তরে গিয়ে নিজের জমিদারী দেখে আসতেন। বিধবা হয়েছিলেন মাত্র সাতাশ বছর বয়সে। কার্বাঞ্চল হয়ে হঠাৎ জলাপ্রসাদের মৃত্যু হয়। সবাই ভেবেছিল স্বদেশ থেকে এতদূরে অল্পবয়স্ক। নিঃসন্তান বিধবা-বিরাট জমিদারীটা এবার লাটে উঠতে দেরি হবে না। সাহেব-মহলেও আলোড়ন জাগেনি তা নয়। বিপুল সম্পত্তির অধিকারিণী, রূপসী বিধবা, ভরা যৌবন—কিন্তু হতাশ হতে হল সবাইকে। শোনা যায়, একজন ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মচারী নাকি পাণিপ্রার্থনা করেছিলেন সুদক্ষিণার। দোষ ছিল না তাতে। কিন্তু সুদক্ষিণা কর্ণপাত করেননি। তবে এ সবই শোনা কথা। নিশ্চিত কি ঘটেছিল তা জানাবার মতো কেউ আর ইহজগতে নেই। অবশ্য এসব কথাকে অবিশ্বাস করারও কোন কারণ নেই। সুদক্ষিণা ছিলেন সত্যিকারের দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিত জমিদারের দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিতা পত্নী। তার প্রতাপে ইংরেজ অফিসাররাও তটস্থ হয়ে থাকতেন।
সুদক্ষিণা ইংরেজ কর্মচারীদের ওপর এত প্রতাপ দেখাতেন কি করে? কেন ভয় পেতেন না কাউকে? শোনা গেছে, জলপ্রসাদের পিতা সিপাহীবিদ্রোহের সময় কয়েকজন ইংরেজকে আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেন, তাই এর পুরস্কাররূপে তিনি লাভ করেন একটা বিশেষ অধিকার। তাঁর জমিদারীকে কোন কারণে নীলামে চড়ান চলবে না। ব্রিটিশ-আইন তাদের প্রতিজ্ঞা রেখেছিল। ফলে সুদক্ষিণা এবং জলাপ্রসাদের শক্তি অনেক বেড়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর জমিদারীর ভার হাতে এলেও, সুদক্ষিণা ইংরেজ কর্মচারীদের মনে মনে বেশ অপছন্দ করতেন, যদিও প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগ রাখতেন ঠিকই কিন্তু একটু বাড়াবাড়ি বা বেটাল দেখলে, তৎক্ষণাৎ ওপরে নালিশ জানাতেন। তাই ইংরেজ রাজকর্মচারীরা পারতপক্ষে তাকে চটাতেন না।
শোনা গেছে, সুদক্ষিণা তার জমিদারীতে ছিলেন মুকুটহীন রাণী। ব্রিটিশ শাসকেরা তাকে দিয়েছিলেন C. I. E. খেতাব। দিতে চেয়েছেন মহারাণী খেতাব। একবার নয় তিন তিনবার। প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেন সুদক্ষিণা! কি হবে ওদের দেওয়া খেতাব নিয়ে? কি সম্মান বাড়বে? মাঝ থেকে আমার জমিদারীতে ওদের উৎপাত বাড়বে। তার চেয়ে এসব দরকার নেই। তিনি থাকতেন তার নিজের সন্তানতুল্য প্রজাদের নিয়ে। অন্য গ্রামে বা অন্য জমিদারীতে ডাকাতি হয়, অনাচার হয়। সুদক্ষিণার জমিদারী এসবের ঊর্ধে। প্রজারা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলত, রামরাজত্বে বাস করি। তিনি বেছে বেছে কয়েকটা ডাকাতকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন ভয়ানক রক্ষীবাহিনী। নিজে ঘোড়ায় চেপে বন্দুক হাতে যেতেন গ্রাম দেখতে। লোকে বলত অভ্রান্ত নিশানা। রাইফেল সুটিংয়ের প্রতিযোগিতায় তিনি ইংরেজ পুরুষ প্রতিযোগীদেরও হারিয়ে দিতেন। এমন রণচণ্ডীর মতো তেজস্বিনী মেয়ে যেন বাংলাদেশেও খুব বেশি নেই। অবশ্য বাঙালী মেয়ের জমিদারী চালনায় চিরকালই দক্ষ। রাণী ভবানী বা রাণী রাসমণির কথা আমরা জানি। তারাও বিচক্ষণতার সঙ্গে জমিদারী চালাতেন। সত্যিকারের রাণী না হলেও প্রজাদের চোখে, শ্রদ্ধায় সম্মানে তিনি রাণীর আসনই পেয়েছিলেন। সুদক্ষিণা জমিদারী পেয়েছিলেন খুব অল্পবয়সে তায় বিদেশে, তবু কোন অসুবিধে হয়নি।
জমিদারী দেখা ছাড়াও সুদক্ষিণা মন দিয়েছিলেন জনকল্যাণে ও লোকসেবায়। তার জন্যে বলাবাহুল্য, পারিবারিক ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তিনি একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন উত্তর প্রদেশের অশিক্ষিত ও অনুন্নত মানুষের জন্যে। ঐ সব অঞ্চলে তখন মেয়েরা একেবারে অন্ধকারে বাস করত। সুদক্ষিণা তাদের মধ্যেও শিক্ষাপ্রসারের চেষ্টা শুরু করলেন। তবে অসহযোগ আন্দোলনের সময় যখন আংরেজী হঠাও আন্দোলন শুরু হল তখন সুদক্ষিণা আপত্তি জানালেন। ইংরেজ হঠাও তাতে ক্ষতি নেই কিন্তু ইংরেজী হঠাও কেমন কথা! সে তো একটা দরকারি ভাষা। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ করে দিয়েছে সে। প্রচণ্ড প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বললেন যে, ইংরেজী না পড়ানো হলে তার স্কুল তিনি তুলে দেবেন। সাহেবী চালচলনে অভ্যস্ত সুদক্ষিণাকে তাই ভুল বোঝা সম্ভব ছিল। অথচ সমসাময়িক সমস্ত ইংরেজ রাজকর্মচারী জানতেন, সুদক্ষিণার মতো ইংরেজবিদ্বেষী আর দুটি নেই।
