প্রথমেই সুষমার চোখ পড়ল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাভাবিকভাবেই নিঃস্ব ক্ষতবিক্ষত য়ুরোপের চেয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব অনেক বেশি। তার ওপর সেখানে গিয়ে স্বামীজী যে উন্নতমনা ও উদারহৃদয় মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন সেকথাও সবার জানা, বিশেষ করে সুষমার কাকা রবীন্দ্রনাথ সেখানে বক্তৃতা দিয়ে এসেছেন ১৯১৬ সালে। সুতরাং একবার সে দেশের উন্নতি ও নারীপ্রগতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে আসার জন্যে সুষমা প্রস্তুত হলেন। সেখানকার মেয়েদের বহুমুখী জীবন-প্রবাহ এদেশের মেয়েদের যদি বিভিন্ন দিক থেকে প্রভাবিত করতে পারে তাহলে তো ভালই হয়। আমেরিকায় সুষমা তার পৈতৃক উপাধিটি ব্যবহার করেছিলেন শুধু সহজে পরিচিত হবার জন্যে।
সুষমার বিদেশ সফর সাড়া জাগিয়েছিল। আমেরিকানদের মনে হয়েছিল এ আবার কি? তাঁরা যখন ভারতীয় মেয়েদের সম্বন্ধে একটা ভাসা ভাসা ধারণা গড়ে নিয়েছেন তখন কোথা থেকে এল এই গ্রহান্তরের মানবী? হিন্দু কবি ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ একবার তাঁদের মনকে নাড়া দিয়ে গিয়েছেন। এবার এসেছেন তারই ভাইঝি; ভাইপো হলেও এতে চমকাতেন না আমেরিকার মানুষ। যত না বক্তৃতা শোনার জন্যে হোক ভারতীয়াকে একবার চোখে দেখবার জন্যে সবাই মনে মনে উৎসুক হয়ে উঠলেন।
সুষমা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছলেন ১৯২৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। আমেরিকার নরনারী অবাক হয়ে দেখলে লুচিস্মিত-লাবণ্যে পূর্ণতঃ এক গরিয়সী তেজস্বিনীকে। যেন দীপ্ত অগ্নিশিখা। বক্তার দিকে শ্রোতারা চেয়ে থাকতেন মুগ্ধ হয়ে। ঘনপক্ষ্ম কৃষ্ণভ্রমর বিশাল দুটি চোখ তুলে তিনি সহজ স্বচ্ছন ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতেন মঞ্চের ওপর। বিদেশীদের চোখে পড়ত a sari of purple silk with sleeves of green embroidered in gold, আপনিই বুঝি উত্তেজনায় ঝিমঝিম করে উঠত নীল রক্ত। বিস্ময় ঝরে পড়ত কলমের মুখে:
Miss Tagore is a charming bit of the Orient in an occidental settiug. Short of stature, quiet and demure, with lazy dark eyes that can flash fire when the occasion arises, it takes the native garb of India to really do justice to her Hindu beauty.
এরপর যখন নিখুঁত উচ্চারণে মিষ্টি অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সুষমা বক্তৃতা শুরু করলেন তখন উল্লাসের হিল্লোল বয়ে গেল শ্রোতাদের মধ্যে। এত সুন্দর, স্পষ্ট উচ্চারণ, এত নিপুণ, নিখুঁত? উচ্চারণ বিভ্রাটের জন্যে অধিকাংশ ভারতীয়ই বিদেশীদের মনে ছাপ ফেলতে পারে না। সুষমা ভঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া মেশালেন কঠে। বিদেশী সাংবাদিকরা লিখলেন :
She speaks softly, with never a trace of bitterness of the lot of her people, and her expression never changes, except when her deep dark eyes seem to sinile. আসলে সুষমার চোখ দুটি আকর্ষণ করেছিল বিদেশীদের। অনেকেই লিখেছেন :
Her eyes are very large, and very black. ডেলি টেক্সাসের সাংবাদিক সুষমার বক্তৃতার প্রশংসা করে শেষে তো বলেই। ফেললেন :
Not only is Miss Tagore ably qualified to discuss this subject (The Ideals of India) through extensive study and experience, but she is also capable of preseuting it iu clear and forceful English, which none of the people of India can do.
আমেরিকাবাসিনীদেরও নতুন লেগেছিল সুষমাকে। তাঁরা যখন শুনলেন সুষমা লম্বা চুল কাটতে রাজী নন বরং দীর্ঘ কেশকেই নারীর সৌন্দর্য মনে করেন তখন যেন চমকে উঠলেন। বিস্ময় চরমে উঠল সুষমা রুজ লিপস্টিক ব্যবহার করেন না শুনে; এমন কি তিনি ধূমপান করতেও রাজী নন। কেননা, এ সবই সুষমার কাছে most unladylike। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুটে এল। সব উত্তরই তিনি দিলেন হাসিমুখে। হ্যাঁ, তিনি মনে করেন বৈকি, শিক্ষার প্রয়োজন আছে। এখানকার শিক্ষাপদ্ধতি দেখতেই তো এসেছেন। তবে তার মতে ভারতীয় মেয়েদের বিবাহিত জীবনের জন্যেই শিক্ষা দেওয়া উচিত : কারণ ভাল স্ত্রী ও ভাল মা হবার শিক্ষাই তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। অর্থাৎ প্রথম জীবনে বিবাহ সম্বন্ধে তাঁর মনে যত বীতরাগই জমে থাকুক না কেন, পরবর্তী জীবনে তিনি সনাতন ভারতীয় রীতিকেই সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বের নানাবিধ সমস্যার সমাধান সম্পর্কে তিনি তার নিজস্ব অভিমত জানিয়েছিলেন আমেরিকার মেয়েদের :
When women are united as wives, mothers and daughters they have more influence on man than has man on woman. If we would only remember that we are all children of one God, our women united would establish world peace.
তিনি আরো বলেন :
The supreme, traditional virtutes of the Hindu woman are fidelity, sincerity and self sacrificing love. A wife subordinates her wishes to those of her husband.
সুষমার মতে :
Real satisfaction lies in control and self restraint. Let us enjoy the inaterial side of life, but not lose ourselves in its glamour.
এসব বক্তৃতার কথা প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকার বিখ্যাত কাগজের পাতায় পাতায়। কিন্তু তার এসব বক্তৃতার প্রতিলিপি ভারতের কোথাও পাওয়া যায় না। আর একটু শোনা যাক সুষমার কথা। পশ্চিমের বিবাহ প্রথার প্রতি তার কোন শ্রদ্ধা ছিল না। নিউইয়র্কের একটা হলে, তিনি রক্তলাল শাড়ি পরে দৃপ্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যাতারার মতো দুটি উজ্জ্বল চোখ তুলে যখন বললেন :
