অবশেষে পথের সন্ধান পেলেন সুষমা। কোথা থেকে হাতের কাছে এসে পড়ল অঙ্কল টমস কেবিন বইটা। পাতার পর পাতা এগিয়ে যেতে চোখের পাতা ভিজে ওঠে। এই বইয়ের লেখক কে? হারিয়েট বিচার স্টো? তিনি একজন মহিলা। আচ্ছা তার কি ঘর-সংসার নেই। তবু কি করে তিনি এমন বই লেখেন? সুষমা মাদাম স্টোর জীবনচরিত পড়তে বসেন আগ্রহ নিয়ে। অসীম আগ্রহ! অবশেষে একটা তৃপ্তির আমেজ নেমে আসে। হ্যাঁ, এই তো। এই তো পথের সন্ধান পাওয়া গেছে। হারিয়েট যদি পেরে থাকেন সুষমাই বা পারবেন না কেন?
সুষমা মন দিলেন নারী জাগরণের দিকে। প্রথমেই তিনি স্থির করলেন মেয়েরা জাগো বা মেয়েদের জাগাতে হবে এসব ধুয়ে না ধরে তাদের সামনে কতকগুলো উদাহরণ তুলে ধরবেন। যারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন তাদের যদি চোখের সামনে রাখা যায় তবে সবার পক্ষেই দাঁড়ানো সম্ভব। তার মনের দ্বিধা দ্বন্দ্ব যিনি ঘুচিয়েছিলেন সেই মাদাম স্টোর কথাই সবার আগে লিখলেন সুষমা। সমসাময়িক বিচারে সেটা বেশ নতুনও বটে। এর আগে বাঙালীরা কেউ খ্যাতনাম্নী মহিলাদের জীবনী লেখায় তেমন আগ্রহ দেখাননি। আর সেরকম মেয়েই বা তখন কোথায়? আজ আমরা যাদের মহিয়সী বা প্রগতিশীল বলে থাকি সমসাময়িককালে তো সেভাবে বিচার করা সম্ভব ছিল না। তবে ভক্তিমতী মহিলাদের নিয়ে কিছু লেখা হয়েছিল। তাই সুষমা শুরু করলেন বিদেশিনীদের নিয়ে। ইচ্ছে ছিল বাংলায় বিদেশিনীদের কথা বলে ভারতীয়দের নিয়ে লিখবেন ইংরেজীতে। একে একে পুণ্যে ছাপা হল হারিয়েট বিচার স্টো, হারিয়েট মার্টিনো, মাদাম দ্য স্টেল, সুইডিস গায়িকা লিণ্ডের জীবনী। এসব জীবনী সংগ্রহ করে সুষমা দেখাতে চেয়েছিলেন সাহিত্যিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাঙ্গীতিক ক্ষেত্রে নারীর চরম সাফল্য। নিজের দেশের ললনাদের চোখ ফোঁটানোর জন্যে তো বটেই, সেইসঙ্গে সুষমা কলম ধরেছিলেন তাদের জন্যেও যাহারা বলেন যে স্ত্রীলোকদিগের বুদ্ধি পরিচালনা দ্বারা কোন কর্ম করিবার শক্তি নাই, মহিলাগণ কেবল সন্তান পালন করিতেই জানেন। স্বীয় বুদ্ধি বিবেচনা দ্বারা কিছুই করিতে পারেন না। চোখ থাকতেও যারা দেখতে পায় না তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায়ই বা কি?
সুষমার লেখা এসব বাংলা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল পুণ্য পত্রিকায়। বাংলা ভ্রমণকাহিনী ছাপা হয় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। তাঁর কাশ্মীর ভ্রমণকাহিনীতে পথের বর্ণনা ও সৌন্দর্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কাশ্মীরবাসীর জীবনযাত্রা দুঃখদুর্দশার কথা! প্রায় একই সময়ে তিনি ইংরেজীতে লেখা শুরু করেন আইডিয়ান্স অব হিন্দু উওম্যানহুড। ভারতীয় নারীর আদর্শরূপে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সতী, সীতা, শৈব্যা, সাবিত্রী, দময়ন্তী ও শকুন্তলাকে। লেখা হয়েছিল তবে ছাপা হয়নি। আজও পাণ্ডুলিপি আকারেই জীর্ণ খাতাটি পড়ে আছে, তাঁর নাতিদের কাছে। নারী নির্বাচনেও তিনি সনাতন দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দিয়েছেন। ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দাম্পত্য প্রেমে যারা উজ্জ্বল সেইসব নারীদের আত্মমর্যাদা ও সমবোধ তাকে আকৃষ্ট করেছিল।
সুষমার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া গেল আরো কিছুদিন পরে। ১৯২৭ সালে সাতটি সন্তানের জননী ও গৃহবধূ হয়েও যখন তিনি নারীপ্রগতি ও শিক্ষাধারার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্যে যাত্রা করলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। এর প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে জ্ঞানদানন্দিনীও একা গিয়েছিলেন ইংলণ্ডে। সে যাত্রাও ছিল দুঃসাহসিক তবে তার সঙ্গে সুষমার যাত্রার তুলনা হয় না। সুষমা গিয়েছেন বিজয়িনী বেশে এবং গিয়েছেন বক্তৃতা দিতে। না, না, সর্বপ্রথম ভারতীয় বক্তা নন সুষমা। তার আগে মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়, প্রতাপ মজুমদার, স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ আমেরিকায় অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় রেখে এসেছেন। শুধু পুরুষেরা নয়, ভারতীয় নারী রমাবাঈও গিয়েছেন আমেরিকায়। এঁদের পরে সুষমা। তবু Hindi Poet and Philosopher রবীন্দ্রনাথের ভাইঝিকে নিয়ে সাড়া পড়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রে। হা, রবীন্দ্রনাথকে যুক্তরাষ্ট্রের খবরের কাগজ কবি ও দার্শনিক রূপেই ব্যাখ্যা করেছে এবং সেই সঙ্গে সব সময় যোগ করা হত হিন্দু শব্দটি। সুতরাং Niece of Tagore সবার মনেই প্রচণ্ড আগ্রহ ও উৎসাহ জাগালেন।
কেন সুষমা বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন? বেড়াতে? উহুঁ, বেড়াতে নয়। সুষমার দিদি মনীষা ও শোভনা হয়ত বেড়াতেই গিয়েছিলেন, বেড়িয়ে-টেড়িয়ে ফিরে এসেছেন সেযুগের অনেক শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল। মেয়ের মতো। কিন্তু সুষমার কথা স্বতন্ত্র। ছোটবেলার সেই না-মেটা সাধ সার্থক করতে হবে না? ঘরে-বাইরে সমানভাবে কাজ করবার জন্যে তৈরি হলেন সুষমা। ছেলেমেয়েরা সবাই বড় হতে, বাইরের জগতের দিকে একটু তাকাবার সুযোগ পেলেন এতদিনে। প্রথমে একটা ছোটখাট স্কুল খুলে ফেললেন ১৯২২ সালে। একেবারেই মেয়েদের জন্যে। নাম বালিকা শিক্ষা সংঘ। স্কুল খোলার পর সুষমা বুঝতে পারলেন ভারতে অশিক্ষিতার সংখ্যা কত বেশি। এতদিন তিনি চিনতেন শিক্ষিত সমাজকে। এবার দেখলেন দেশের শতকরা নিরানব্বই জন মেয়েই নিরক্ষর। তাই তো প্রথম এম-এ পাশ চন্দ্রমুখী বসু এবং প্রথম ডাক্তার কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখবার জন্যে ভিড় জমে যেত। জমবে না কেন? শিক্ষিতা মেয়ে কই, সে তো গোনাগুন্তি কয়েকটা পরিবারে। অথচ তখন বিদুষীর সংখ্যা বাংলা দেশে মোটেই কম নয়। চন্দ্রমুখী-কাদম্বিনীর যুগ অনেকদিন কেটে গেছে। অধলা দাসের মাদ্রাজে মেডিকেল পড়তে যাওয়ও পুরনো খবর। বিধুমুখী বসু ও ভার্জিনিয়া মিত্রও কলকাতায় মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। ভার্জিনিয়া সমস্ত ছাত্রছাত্রীর। মধ্যে প্রথম স্থান পেলেন (১৮৮৮)। তথন তটিনী গুপ্তও (দাস) সম্মিলিত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন, লিলিয়ান হয়েছেন ঈশান স্কলার, হিন্দু ঘরের বিধবা সরলাল মিত্র শিক্ষণশিক্ষার জন্যে বৃত্তি নিয়ে গেছেন ইংলণ্ডে। হরিপ্রভা গেছেন জাপানে। রাজনীতি ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছেন প্রীতিলতা ওহদেদার, কল্পনা দত্ত কিংবা বীণা দাসের মতো সাহসী মেয়েরা। পুলিশের অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করেও দেশের জন্যে হাসিমুখে কারাবরণ করেছেন ননীবালা ও দুকড়িবালা। সুতরাং আপাতদৃষ্টিতে তো চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ারই কথা। সুষমার দিদিরাও শিক্ষিতা। ইন্দিরা আর সরলা। রীতিমতো অনার্স গ্র্যাজুয়েট। সুতরাং স্কুল খোলার আগে সুষমা বুঝতেই পারেননি নিরক্ষর মেয়েদের সংখ্যা কত বেশি। শুধু স্কুল নয়, এসময় সুষমা জড়িয়ে পড়েন উইমেন এডুকেশনাল সোসাইটি অব ইনডিয়ার সঙ্গে। এই সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হয়ে তিনি অশিক্ষিত মেয়েদের জন্য আরো বেশি ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগ পেলেন।
