শুধু ইংরেজী বই লেখা নিয়েই ভুলে থাকেননি শোভন। শেষজীবনে আবার বাংলা রচনায় হাত দিয়েছিলেন য়ুরোপ ভ্রমণ সেরে ফিরে আসার পরে। তাঁর কয়েকটি ভ্রমণবৃত্তান্ত য়ুরোপে মহাসমরের পরে, লগুনে, রণক্ষেত্রে বঙ্গমছিলা ও মহাযুদ্ধের পর প্যারী নগরীতে নামে বিভিন্ন পত্রিকার প্রকাশিত হয়। তাছাড়া তিনি মেতে উঠেছিলেন স্কুল নিয়ে। ঠাকুরবাড়ির ছেলেমেয়েদের স্কুল খোলার নেশা এক আশ্চর্য নেশা। সেই নেশা ছিল শোভনারও। তার নিঃসন্তান জীবনের অনেকখানি কেটে যেত হাওড়া গার্লস স্কুলের তত্ত্বাবধানে। স্কুলে তিনি পড়াতেন ইংরেজী। এখনও ঐ স্কুলে তার নামাঙ্কিত একটি রৌপ্যপদক স্কুলের সেরা ছাত্রীকে প্রতিবছর দেওয়া হয়। এ ছাড়াও তিনি খুলেছিলেন একটা ছোট্ট গানের স্কুল। বেশ চলছিল। আকস্মিকভাবে সব শেষ হয়ে গেল। সন্ন্যাস বোগে মৃত্যু হল শোভনার। শোকার্ত পত্নীপ্রেমিক নগেন্দ্রনাথের লেখা একটি শোকগাথা প্রেমাঞ্জলি নামে ছাপা হল, রবীন্দ্রনাথ তার ভূমিকায় লিখেছিলেন একটি ছোট্ট কবিতা শোভনা।
শোভনাসুন্দরী ও সুষমাসুন্দরী—দুটি কর্মব্যস্ত বোনের মাঝখানে একটু ক্ষীণ। যতির মতো ছিলেন সুনৃতা। হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের মধ্যে সবচেয়ে অপরিচিত। তাঁর জীবনদীপও নিভেছিল অভিজ্ঞার মতো নিতান্ত অসময়ে। তবে অভিজ্ঞার মতো ভাগ্যবতী নন তিনি! মৃত্যুর পরেও অভিজ্ঞ বেঁচে ছিলেন সবার স্মৃতিতে, সুনৃতাকে তার নিকট আত্মীয়রাও মনে রাখেনি। হয়ত দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে তিনিও কোন কোন ক্ষেত্রে প্রতিভার পরিচয় দিতে পারতেন। এখন তার সম্বন্ধে প্রায় কিছুই জানা যায় না। তার স্বামী নন্দলাল ঘোষাল ছিলেন বারুইপুরের প্রসিদ্ধ ঘোষাল পরিবারের সন্তান। পরে অবস্থা বিপর্যয়ে তাদের চলে যেতে হয় শ্যামনগরে। সুনৃতার সঙ্গে বাপের বাড়ির যোগ ছিন্ন হয় দারিদ্র্য ও দূরত্বে। তবে সুন্বত এখনও বেঁচে আছেন পুণ্য পত্রিকার পুরনো ফাইলে। আছেন নন্দলালও। তারা দুজনেই সাহিত্যানুরাগী এবং পুণ্যর লেখক-লেখিকা ছিলেন। তাঁদের প্রাকৃবিবাহপর্বে পূর্বরাগ-অনুরাগ ছিল কিনা জানা যায়নি। অবশ্য সুনৃতার মন ছিল প্রজ্ঞার মতো গৃহিনীপণার। তার ইচ্ছে ছিল পুণ্যর মাধ্যমে পাঠিকাদের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবেন নানারকম মুখরোচক আচার। আমের আচার, কুলের আচার, তেঁতুলের আচার প্রভৃতির প্রস্তুত প্রণালী প্রকাশ করতেন সুনৃতা। সাহিত্য জগতে তার ভীরুকুষ্ঠিত প্রবেশ একটিমাত্র রচনা নিয়ে ব্রহ্মে শূলীনাথ। বর্ষায় শূলীনাথ শিব খুব বেশি পরিচিত নন। তথাগত মন্দিরের প্রাধান্যের মধ্যে শূলীনাথ কোন রকমে নিজের অস্তিত্বটুকু বাঁচিয়ে রেখেছেন। সুন্বত তার খবর পেলেন কি করে? বৌদ্ধ-প্যাগোডার বদলে পুরনো মন্দিরের প্রতি আগ্রহ দেখে মনে হয় তিনি ঝুকেছিলেন মন্দির-শিল্প ও তার বৈশিষ্ট্যের দিকে। কিন্তু একটির বেশি প্রবন্ধ লেখা হয়ে ওঠেনি।
০৮. সুনৃতার ছোট বোন সুষমা
সুনৃতার ছোট বোন সুষমার মন প্রথম থেকেই বিদ্রোহী। তাঁর দিদিরা সবাই লরেটোতে পড়লেও সুষমা বাড়িতেই লেখাপড়া শিখতেন, সেই সঙ্গে স্বপ্ন দেখতেন সব বন্ধন ছিঁড়ে এগিয়ে যাবার। অগ্রগতির পথে প্রথম বাধা বিবাহ। সুতরাং সুষমা ঠিক করলেন বিয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির ট্র্যাডিশন আর মায়ের দৃঢ়তা ষোড়শী সুষমাকে নতুন পথে এগিয়ে যেতে বাধা দিল। নতুন ভাবে পথ দেখালেও ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা কেউই পরিণয়ে প্রগতি দেখাতে পারেননি। প্রেম ভালবাসার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন কি? মনে পড়ে না। সুষমার বান্ধবী প্রথম মহিলা ঈশান স্কলার লিলিয়ান পালিত প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা এনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। তাঁর স্বামী। ছিলেন ব্যারিস্টার শিশির মল্লিক। বিবাহ বিচ্ছেদের পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন ভাগলপুরের জমিদার দীপনারায়ণ সিংকে। কেশব সেনের নাতনীরাও কম যান না। কুচবিহারের রাজকন্যা প্রতিভা ও সুধীর বিয়ে করেছিলেন জন ম্যাণ্ডার ও হেনরি ম্যাণ্ডারকে। সে নিয়েও কি কম হৈচৈ হয়েছে? কিংবা হরিপ্রভা তাকেদা? বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরীর ওয়েমন তাকেদার সঙ্গে তার বিয়ে হয় ১৯০৭ সালে। ১৯১২ সালে জাপানী স্বামীর সঙ্গে চলে গেলেন জাপানে। আত্মীয়দের আপত্তি ও অনিচ্ছা অগ্রাহ্য করে। সেদিন সবাই চমকে উঠেছিল। কত আগ্রহ নিয়ে যে বাঙালীরা হরিপ্রভার লেখা বঙ্গ মহিলার জাপান যাত্রা পড়েছে তার তুলনা হয় না। তুলনায় ঠাকুরবাড়ির অনেক মেয়েই বেশ প্রাচীনপন্থী এমনকি ভিন্ন প্রদেশের বরের সঙ্গে বিয়ে হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাতে পূর্বরাগের ছিটে-ফোঁটা থাকত না।
সুষমার বিয়ে হয়েছিল গতানুগতিকভাবে যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে। বুধবার ১৯০৫ সালের ৭ই মার্চ। সুষমা তখন সবে টি-নিটি কলেজ থেকে পিয়ানোর পরীক্ষায় ফাস্ট হয়েছেন। য়ুরোপীয় ছাত্রীরাও পিয়ানোয় সুষমার কাছে হার মেনেছিলেন। কিন্তু গান-বাজনা বা সাহিত্য বা রান্নাঘর দিদিদের বাঁধাধর গতের কোনটার মধ্যেই সুষমা নিজেকে বেঁধে রাখেননি। তিনি সব কিছু শিখে তারপর এগিয়ে যেতে চেয়েছেন নারী প্রগতির বন্ধুর পথে। পায়ে বেড়ি পড়ত। যোগেন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার কিন্তু তার মন ছিল অন্য দিকে। তিনি ভালবাসতেন অঙ্ক কষতে। তার মডার্ণ এরিথমেটিক খুব জনপ্রিয় স্কুলপাঠ্য অঙ্কের বই। স্ত্রীর প্রগতির পথে কোন বাধা দেবার প্রশ্নই ওঠে না। তবু সুষমা যেন শান্তি পান না। এগিয়ে যাবার মতো একটা পথ! একটা পথের খবর কি কেউ দিতে পারবে না? চিন্তায় ঘুম আসে না। মনের মধ্যে গুমরে ওঠে বোবা কান্না!
