আর দি ওরিয়েন্ট পার্লস রূপকথা সংকলন। শোভনা জয়পুরী উপকথা সংগ্রহ দিয়ে যে সাহিত্য-জীবন শুরু করেছিলেন এখানেও তারই জের চলেছে। এবং এই চারটি বইয়েই ইতিহাস পুরাণ লোককথা সংগ্রহে অসামান্য প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তবু সংস্কৃত সাহিত্য থেকে পৌরাণিক গল্প সংগ্রহ আর বাংলাদেশের লোকের মুখে মুখে ছড়ানো রূপকথা সংগ্রহ অন্য জিনিষ। শোভন। এ সব গল্প সংগ্রহ করেন এক অন্ধ ভৃত্যের কাছ থেকে। তিনি এই রূপকথাসংগ্রহ যদি বাংলাতেও লিখতেন তাও অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকত। সেকালে ইংরেজীতে বই লেখার চল্ মেয়েদের মধ্যে ছিল। কনভেন্টে পড়া, বিদেশিনী গভর্নেসের কাছে মানুষ হওয়া মেয়েরা য়ুরোপীয় ভাবাপন্ন হবেন এ আর বেশি কথা কি? তারকনাথ পালিতের মেয়ে লিলিয়ান, লর্ড সিনহার মেয়ে রমলা কিংবা কুচবিহারের তিন রাজকুমারী সুকৃতি, প্রতিভা ও সুধীরার কথাই ধরা যাক না কেন, তাদের চালচলনে সেদিন বিদেশিয়ানাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। এঁরা লেখিকা হলে মনের কথা ইংরেজীতেই প্রকাশ করতেন তাতে সন্দেহ নেই। হেমেন্দ্রনাথের আট মেয়ে এবং ইন্দিরাও অভ্যস্ত ছিলেন বিদেশী চালচলনে। সুতরাং শোভনার পক্ষে ইংরেজীতে বই লেখা খুবই স্বাভাবিক। যেমন ইংরেজীতে কবিতা লিখেছিলেন তরু দত্ত কিংবা সরোজিনী নাইডু। সরোজিনী শোভনার সমবয়সী কিন্তু শোভনার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত, বিশেষ করে রাজনীতিক্ষেত্রে সরোজিনীর ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তার কবিতার বই তিনটি— দি গোল্ডেন থেসোল্ড, দি বার্ড অব টাইম, ও দি ব্রোকেন উইঙ খুব জনপ্রিয়। হয়েছিল। ১৯০৫ থেকে ১৯২০ এই পনেরো বছরে গোল্ডেন থেসোরে পুনর্মুদ্রণ হয়েছিল সাত-আট বার। শোভনা এভাবে খ্যাতির চূড়া স্পর্শ করেননি, হয়ত সে ক্ষমতা তার ছিল না। কিন্তু যেটুকু তিনি দিয়েছেন তারই বা মূল্য কম কী? একেবারে প্রথম থেকে ১৯২৫ সাল পর্যন্ত যে সব ভারতীয় রূপকথা সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে তার মধ্যে দি ওরিয়েন্ট পার্ল-এর স্থান বেশ ওপরে। বাঙালী মেয়েদের মধ্যে শোভনাই সবার পূর্ববর্তিনী। আরো আট বছর পরে ১৯২৩ সালে মহারাণী সুনীতি দেবীর ইনডিয়ান্ ফেয়ারি টে লণ্ডন থেকে প্রকাশিত হয়।
শোভনার পূর্ববর্তী রূপকথা সংগ্রাহকের সংখ্যা যে খুব বেশি তা নয়। তাদের নাম—লালবিহারী দে ফোক টেল অব বেঙ্গল (১৮৮৩), রামসত্য মুখোপাধ্যায় ইনডিয়ান ফোকলোর (১৯০৪), কাশীনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় পপুলার টেস্ অব বেঙ্গল (১৯০৫), দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার ঠাকুরমার ঝুলি (১৯০৭), উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী টুনটুনির বই (১৯১০), ম্যাক কুলক বেঙ্গলি হাউসহোল্ড টেস্ (১৯১২), ডি. এন. নিয়োগী টেস্ সেক্রেড এ্যাণ্ড সেকুলার (১৯১২ }। এর পরেই প্রকাশিত হয় শোভনার দি ওরিয়েন্ট পার্লস্ (১৯১৫)।
শোভনার বইয়ে রূপকথা আছে আঠাশটি। সব গল্পই শুরু হয়েছে (Once upon a time বলে রূপকথার আমেজে। যে সব গল্প আছে তার মধ্যে আমাদের পরিচিত ও অপরিচিত উভয় ধরনের রূপকথাই পাওয়া যাবে। দি ওয়াক্স প্রিন্স, দি গোল্ডেন প্যারট, দি হারমিট ক্যাট, এ নোজ ফর নোজ, আঙ্কল টাইগার, দি ব্রাইড অব দি সোর্ড সকলের খুব ভাল লাগবে। তবে এসব রূপকথা যে বিদেশীদের একেবারে অপরিচিত তা হয়ত নয়, কারণ বিভিন্ন দেশের রূপকথার মধ্যে গল্পের অদৃশ্য যোগ চিরকালই ছিল।
আপাতভাবে স্বল্প পরিচিত টেলস্ অব দি গডস্ অব ইনডিয়াতেও নতুনত্ব আছে। এখানে দেবতাদের গল্প নির্বাচন করা হয়েছে ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। ইদানীংকালে বাংলায় প্রেমকথা নাম দিয়ে কয়েকটি পৌরাণিক প্রেমকাহিনী সিরিজ প্রকাশ করা হয়েছে, যেমন-ভারত প্রেম কথা, রামায়ণী প্রেমকথা, গ্রীক প্রেমকথা, অরণ্য প্রেমকথা, বাইবেল প্রেমকথা ইত্যাদি। এই লেখকদের অনেকেই হয়ত জানেন না তাদের অনেক আগে রামায়ণমহাভারত-বেদ-পুরাণ থেকে যুগল প্রেমের উৎস সন্ধান করেছিলেন শোভন। ভারতের দেবদেবী সংক্রান্ত বইটির জন্যে শোভনা সংগ্রহ করেছেন তিরিশটি গল্প। তিনি কোথা থেকে কোন গল্প নিয়েছেন তার উংস নির্দেশ করতেও ভোলেননি। নাম নির্বাচনও সুন্দর। ঋগ্বেদ থেকে তিনি নিয়েছেন পাচটি গল্প–দ্য ও পৃথিবী, যম ও যমী, ঋভুভ্রাতৃদ্বয় ও উষা, অশ্বিনীকুমারদ্বয় ও সূর্যা এবং বিবস্বান ও সরণু। মহাভারত থেকে সংগ্রহ করেছেন আরো চোদ্দটি গল্প। সে গুলি আমাদের খুবই পরিচিত, যেমন, পুরুরবা ও উর্বশী, সংবরণ ও তপতী, রুরু ও প্রমঘরা, সোম ও তারা, বশিষ্ঠ ও অরুন্ধতী, ইন্দ্র ও শচী, সাবিত্রী ও সত্যবান, বিষ্ণু ও লক্ষ্মী, শিব ও সতী, মদন ও রতি, অর্জুন ও উলু সী, ভীম ও তার রাক্ষসী বধূ, বলরাম ও রেবতী, দময়ন্তী ও তার দেব পাণিপ্রার্থী। রামায়ণ থেকে নেওয়া হয়েছে রাম ও সীতার গল্প, এবং অগ্নি ও স্বাহার গল্প। শতপথ ব্রাহ্মণ থেকে নেওয়া হয়েছে চ্যবন ও সুকন্যা এবং মিত্র, বরুণ ও অসির আখ্যান! কালিদাসের কাব্য থেকে শোভনা নিয়েছেন কুমারসম্ভব, অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ এবং মেঘদূতের গল্প। যম ও বিজয়ার কথা নেওয়া হয়েছে ভবিষ্যপুরাণ থেকে এবং বেহুলা ও লখীন্দরের কাহিনী মনসামঙ্গল থেকে তিনি সংগ্রহ করেন। কোন কোন গল্প দু-তিনটে বইয়ে আছে বলে তিনি তাদেরও উল্লেখ করেছেন, যেমন বিষ্ণু ও লক্ষ্মী আছে মহাভারত ও বিষ্ণুপুরাণে, আবার শিব ও সতী আছে মহাভারত ও ভাগবতপুরাণে। গল্প নির্বাচনে এবং তার উৎস নির্দেশে শোভনার এই সাবধানতা বিস্ময়কর। পরবর্তীকালে এই বইটি যতই দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে এই জাতীয় গল্পের চাহিদাও ততই বেড়েছে।
