পত্নীপ্রেমিক নগেন্দ্রনাথ উৎসাহ দিলেন। তার মধ্যেও একটি কবিমন লুকিয়ে ছিল। মাইকেলের অনুসরণে তিনি লিখেছিলেন যক্ষাঙ্গনা কাব্য। তার আরো অনেক লেখা পাণ্ডুলিপি আকারে রয়েছে—কৃষ্ণা, মেনকানন্দিনী কাব্য, স্বর্গোদ্ধার কাব্য এবং সোনার ঢেউ নামে গল্পগুচ্ছ। কিন্তু সেসব এমন কিছু উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠেনি, তার চেয়ে শোভনার কৃতিত্ব অনেক বেশি। কি লিখবেন তিনি? স্বর্ণকুমারীর মতো গল্প? না না, সে যেন অসম্ভব। তার চেয়ে—তার চেয়ে হারিয়ে যাওয়া-লুকিয়ে থাকা উপকথা-রূপকথাগুলোকে সংগ্রহ করলে কেমন হয়? ঠাকুরবাড়ির মেয়ে, গ্রাম বাংলার সঙ্গে-লোকগাথার সঙ্গে পরিচয় কম। তার চেয়ে বরং জয়পুরের গল্প সংগ্রহ করা যাক। আর এমনি করেই শোভন সত্যিকারের পথ খুঁজে পেলেন। পুণ্য পত্রিকায় ছাপা হল ভিন্ন স্বাদের, ভিন্ন পরিবেশের কয়েকটা গল্প—ফুলাদ ডালিমকুমারী, গঙ্গাদেব, লুব্ধবণিক তেজারাম, দিলীপ ও ভীমরাজ, লক্ষটাকার এক কথা। সবই জয়পুরী গল্পের ছায়ায় লেখা। প্রথমটা মনে হল, স্বর্ণকুমারীর মতোই শোভন টডের রাজস্থান থেকে গল্প সংগ্রহ করেছেন। আসলে কিন্তু তা নয়। শোভনা মন দিয়েছিলেন উপকথা সংগ্রহে। পরে তিনি জয়পুরী প্রবাদ বা কছাবৎও সংগ্রহ করেন। সেই সঙ্গে মন দিলেন শিল্প ও সাহিত্য সম্পর্কেও। লেখার জন্যে লোকসাহিত্য থেকে উপকরণ নির্বাচন যে অত্যন্ত সুষ্ঠু ও মনোজ্ঞ হয়েছে তাতে সন্দেহ নেই। তখনকার তুলনায় তার আগ্রহ বেশ নতুন ধরনের বলা বাহুল্য। কোন মহিলা তখনও লোককথা সংগ্রহ করবার জন্যে বেরিয়ে পড়েননি তবে রূপকথা সংগ্রহের কাজে হাত দিয়েছিলেন মৃণালিনী। সব কাজে অগ্রণী ঠাকুরবাড়ির মেয়ে শোভনাই বা পিছিয়ে থাকবেন কেন? লোককথার সরণি বেয়েই তিনি পৌঁছলেন প্রাচীন ভারতের পৌরাণিক সাহিত্যের জগতে।
জয়পুরী উপকথা সংগ্রহের সঙ্গে সঙ্গে শোভনা সংগ্রহ করেছিলেন কহাবৎ বা জয়পুরী প্রবাদ। ১৯০০/১৯০১ সালে প্রবাদ সংগ্রহের দিকে অনেকেই নজর দিয়েছেন। রেভারেণ্ড লঙ এবং আরো কয়েকজন তখন বাংলা প্রবাদ সংগ্রহ করেছিলেন। তবে ভিন্ন প্রদেশের প্রবাদ সংগ্রহ করে তার অর্থ উদ্ধার, অনুবাদ এবং বাংলায় সমার্থক প্রবাদ অনুসন্ধান করে শেভিনা সত্যিই একটা নতুনত্ব আনার চেষ্টা করেন। এইসব কহাবং-এ জয়পুর বা রাজস্থানবাসীর বিশ্বাস, শ্রদ্ধা, ব্যঙ্গপ্রবণতা ও এ অঞ্চলের কিছু কিছু স্থানীয় বৈশিষ্ট্য ধরা পড়েছে। আজকের দিনে অর্থাৎ শোভনার কহাবৎ সংগ্রহের প্রায় আশি বছর পরেও এই ধরনের প্রবাদ সংগ্রাহকের সংখ্যা খুবই কম। এবার কয়েকটা কহাবং শোনা যাক :
মূল : কাল কী জয়োড়ী গধেড়ী, পরসো কী গীত গাবে
অনুবাদ : কাল জন্মেছে গাধা, পরশুর গীত গাচ্ছে।
অর্থ : গর্দভ জন্মগ্রহণ করিয়াই পূর্বজন্মের অভ্যাসবশতঃ অমঙ্গল ডাক ডাকিতে থাকে।
বঙ্গীয় প্রবচন : রাসভবিনিন্দিত স্বর
***
মূল : জয়পুর কী কমাই ভাড়া বলিতা খাই
অনুবাদ : জয়পুরের উপার্জন ভাড়া ও ঘুটেতে ব্যয় হয়
অর্থ : জয়পুরে ঘর ভাড়া ও রন্ধনকাষ্ঠের মূল্য বেশি
***
মূল : সীতলা কুনসা ঘোড়া দে, আপ হী গধা চড়ে
অনুবাদ : শীতলা ঘোড়া কোথা থেকে দেবে, আপনিই গাধ চড়ে
অর্থ : নিজেই পায় না পরকে দেবে।
***
জয়পুরের উপকথা-রূপকথা-প্রবাদ-প্রবচন ছাড়াও শোভনাকে আকৃষ্ট করেছিল জয়পুরী শিল্প-একেবারে ঘরোয়া শিল্প। ছেড়া কাগজ দিয়ে তৈরি ধামা, চুপড়ী, থালা, বাটি, খেলনা, পুতুলকে ওখানে বলা হয় ডোমলা শিল্প। পুণ্যর পাঠিকাদের তিনি ডোমলার কাজও শিখিয়েছিলেন। কিন্তু এগুলি সবই উপক্রমণিকা, এরপর শোভনা নামলেন তার আসল কাজে।
বাংলা ভাষা ছেড়ে তিনি ইংরেজীতে লিখতে শুরু করলেন ভারতের বেদপুরাণ-ইতিহাস-লোককথার গল্প। ব্যাপারটা খুলেই বলা যাক। শোভনা মনে করতেন গল্প লেখার ইচ্ছে থাকলেও তার কল্পনার দৌড় খুব নয়, কাজেই সৃজনশীল রচনার চেয়ে অনুবাদেই তার হাত খুলবে বেশি। তাই প্রথমে তিনি সাহস করে অনুবাদ করে ফেললেন স্বর্ণকুমারীর জনপ্রিয় উপন্যাস কাহাকে। ইংরেজী অনুবাদের নাম টু হুম। খুব যে ভাল হল তা নয়। অনুবাদকের তো কোন স্বাধীনতা নেই। স্বর্ণকুমারী নিজে যখন কাহাকের অনুবাদ করলেন এ্যান অ্যাফিনিস্ট সঙ নামে তখন সে অনুবাদ হয়ে উঠল নতুন বই। যাইহোক, একই সঙ্গে শোভনা অনুবাদ শুরু করেছিলেন পুরনো দিনের গল্পের। এই ধরনের চারটি বই ছাপা হয়েছিল লণ্ডনের ম্যাকমিলান কোম্পানী থেকে।
প্রথম বই ইনডিয়ান্ নেচার মীথস। শোভনা লিখলেন ছোটদের মনের মতো ইংরেজীতে! ছোটদের মানে এই নয় যে রসরর্জিত নীতিসারসংগ্রহ আসলে ইংরেজী ভাষাটা লিখলেন সহজবোধ্য ও সবার উপভোগ্য করে। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ, বেদ, উপনিষদ এবং লোককথা থেকে পঞ্চাশটি গল্প সংগ্রহ করে শোভনা লিখেছেন নেচার মীথ্স্—অধিকাংশই সৃষ্টিতত্ত্বের দিকে তাকিয়ে লেখা। যেমন, দি অরিজিন অব তুলসী প্ল্যান্ট, দি অরিজিন অব ডেথ, দি অরিজিন অব ভলকানে, দি অরিজিন অব টোবাকো প্ল্যান্ট ইত্যাদি।
ইনডিয়ান ফেবস্ এ্যাও ফোকলোর একই জাতের গ্রন্থ। শোভনা এ বইয়ের গল্প সংগ্রহ করেছেন মহাকাব্য, পুরাণ, কথাসরিৎসাগর, পঞ্চতন্ত্র ও ভক্তমাল থেকে। সবশুদ্ধ গল্প আছে উনত্রিশটা। তার মধ্যে মীরাজ, ব্রাইডগ্রম (ভক্তমাল), এ র্যাট স্বয়ম্বর (পঞ্চতন্ত্র, একলব্য এণ্ড দ্রোণ (মহাভারত), কাউ অব প্লেন্টি (রামায়ণ) নিশ্চয় বিদেশী পাঠকদের বিস্মিত করেছিল। প্রায় প্রতিটা গল্পেই শোভনা বিস্ময়ের সঙ্গে আনন্দের খোরাক জুগিয়ে গিয়েছেন।
