অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে তার স্বামী দেবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনীষার বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের মাত্র একমাস পরেই বিদায় নিলেন অভিজ্ঞা তাঁর বাসরশয্যাই মৃত্যুশয্যায় পরিণত হল। দেবেন্দ্রের সেবা তাকে ফিরিয়ে আনতে পারল না। কিন্তু বোনের মৃত্যুর পর এই উদার উন্নতমনা যুবকটিকে ভালবেসে ফেলেছিলেন অভিজ্ঞার দাদারা। তারা প্রস্তাব করলেন তাঁদের বোন স্নেহবন্ধন ছিঁড়ে চলে গেছেন, কিন্তু দেবেন্দ্র যেন না যান। মনীষার সঙ্গে দেবেন্দ্রর আবার বিয়ে দেওয়া হোক। আপত্তির কারণ ছিল না। শুধু একটু বাধা। মহর্ষি নাতনীদের বিয়েতে তিন হাজার টাকা যৌতুক দিতেন। এবার দেবেন্দ্রকে নতুন করে যৌতুক দিতে তিনি রাজী হলেন না। মনে হয়, নাতজামাইকে পরীক্ষা করবার জন্যেই। বিব্রত হলেন হিতে-ক্ষিতীন্দ্র-ঋতেন্দ্র। তাঁরা দেবেন্দ্রকে অনুরোধ জানালেন এ বিয়েতে রাজী হতে, পরে যেমন করে হোক, তাঁরা এ টাকা জোগাড় করে দেবেন। দেবেন্দ্র এসব দাবি করেনইনি, তাই বিয়ে বন্ধ হল না। সব দেখে সন্তুষ্ট হয়ে, মহর্ষিও সমস্ত টাকা দিয়ে দিলেন। ক্ষিতীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত ডায়রি মহর্ষি পরিবারে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
মনীষা স্বামীর সঙ্গেই বিদেশে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁর পিয়ানোয় নিখুঁত ইংলিশ কোটেশন শুনে য়ুরোপীয়রা যেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন তেমনি বিস্মিত ইসছিলেন, পিয়ানোয় হিন্দু মার্গসঙ্গীতের ভাব প্রকাশের স্বাচ্ছন্দ্যে। বিদেশে যারা মনীষার পিয়ানো শুনেছিলেন তাদের মধ্যে ছিলেন মনীষী ম্যাক্সমুলার। শীষাকে লেখা তার একটি উচ্ছ্বসিত প্রশংসাপূর্ণ চিঠি আজও রবীন্দ্রভারতী মিউজিয়ামে মনীষার নিখুঁত সুরসৃষ্টির নীরব সাক্ষী হয়ে আছে। তাতে জানা যায় শুধু য়ুরোপীয় সঙ্গীত নয়, ভারতীয় সঙ্গীত বিশেষত হিন্দু মার্গসঙ্গীতের বিশুদ্ধ সুরসৃষ্টি দিয়ে মনীষা সমস্ত পশ্চিমী জগৎকে মুগ্ধ করেছিলেন।
অবশ্য এদেশের সঙ্গীত-সমাজের সঙ্গেও যে মনীষার যোগ ছিল না তা নয়। প্রতিভা ও ইন্দিরা যেমন সঙ্গীত-সংঘের প্রাণকেন্দ্র ছিলেন তেমনি সঙ্গীত সম্মিলনীর প্রাণ ছিলেন প্রমদা চৌধুরী। মনীষা এই সঙ্গীত সম্মিলনীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর স্বামীর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হিসেবেও প্রমদার স্বামী বনোয়ারীলাল চৌধুরী পরিচিত। প্রমদার সঙ্গে ছিল মনীষার গভীর সখ্য। তাঁর স্মৃতিকথা থেকেই জানা যায়, প্রথমদিকে সঙ্গীত সম্মিলনী আনন্দ সভার মতোই একটা ক্লাব ছিল। সেই ক্লাবের সদস্যদের আগ্রহ আর ইচ্ছেতেই গড়ে ওঠে সঙ্গীত সম্মিলনী গানের স্কুল। স্কুলের পরিচালন-ভার গ্রহণ করে প্রমদা। মনীষ ছিলেন উৎসাহী সভ্য। মাঝে মাঝে যোগ দিতেন বিভিন্ন সঙ্গীত ও নৃত্যের অনুষ্ঠানে, বাজাতেন পিয়ানো কিংবা বেহালা। মনীষার লেখার হাতও বেশ ভাল ছিল যদিও তিনি খুব বেশি লেখেননি। তাঁর সাহিত্যচর্চার বিবরণ পাওয়া যাবে তত্ত্ববোধিনী পত্রিকার পুরনো ফাইলে। কয়েকটা প্রবন্ধ ছাড়াও তিনি লিখেছিলেন একটা নাটক। ছোটদের অভিনয় করার জন্যে। কিন্তু লেখার পরে সেটিও আর যত্ন করে তুলে রাখেননি। প্রমদার মৃত্যুর পরে লেখা স্মৃতিকথাটির ভাষাও ঝরঝরে। তিনি লিখেছেন :
তারপর আমি শিলং বাস করাতে ক্ষণিক সম্বন্ধ ত্যাগ করতে হল। মাঝে মাঝে চিঠিতেও পরামর্শ দিতুম। সময় সময় প্রমদা সম্মিলনী ছাড়ি ছাড়ি করতেন। কিন্তু আমরা ছাড়তে দিইনি। সম্মিলনী যেন তার অঙ্গ ছিল।… তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। কিন্তু এই সম্মিলনীর ছেলেমেয়েরা তার সন্তান স্বরূপ ছিল। কেউ বা মিঠাপিসী, কেউ বা জেঠিমা, কেউ বা মিঠাদিদি বলে ডাকত। সকলেই তার আদরের ছিল! বিবাহ সম্বন্ধ পাকাতে তাঁর দ্বিতীয় আর কেউ ছিল না।
মনীষা সাহিত্যচর্চার সঙ্গে সঙ্গে পুণ্য পত্রিকার মাধ্যমে মাঝে মাঝে সেলাইফোড়াইয়ের কাজও শেখাতেন। বিশেষ করে সেকালে বসবার ঘরে পুতির পর্দা ঝোলানো ছিল আভিজাত্যের লক্ষণ। ঠাকুরবাড়িতেও এ প্রথা ছিল। মনীষা সেই পর্দা সেলাইয়ের বা বোনার পদ্ধতি, নকশা প্রভৃতি ছবি এঁকে, ঘর গুণে সেলাই দিয়ে বোঝাবার চেষ্টা করেছেন। হেমেন্দ্রনাথের অন্যান্য মেয়েদের মধ্যেও নানা গুণের সমাবেশ দেখা গেছে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা দেখিয়েছেন প্রগতির সঙ্গে শাশ্বতীকে বেঁধে রেখে কি করে সমাজকে গড়ে তোলা যায়। শুধু এই কারণেই বাঙালী মেয়েদের ওপর তারা যে প্রভাব বিস্তার করতে পেরেছিলেন আর কেউ তা পারেননি। লিলিয়ান পালিত, রমল সিংহ, রাণী নিরুপমা, সুনীতি দেবী, সুচারু দেবী, মৃণালিনী সেন ও আরো অনেকেই সেদিনকার ধনী সমাজে আলোড়ন জাগিয়েছিলেন, এনেছিলেন নতুন উদ্দীপনার জোয়ার কিন্তু তাদের প্রভাব কি পড়েছিল আমাদের সমাজে? না পড়ার কারণ, তারা ছিলেন আরো অনেক দূরবর্তিনী। বরং প্রভাব ফেলেছিলেন সরল৷ রায়, অবলা বসু, কুমুদিনী খাস্তগির, কাদম্বিনী গাঙ্গুলী, চন্দ্রমুখী বস্তু—দলে দলে মেয়েরা এগিয়ে এসেছিলেন তাঁদের মতো লেখাপড়া শিখতে।
হেমেন্দ্রনাথের পঞ্চম কন্যা শোভনাসুন্দরী। তিনি আবার গান-বাজনার চেয়ে লেখাপড়াতেই বেশি উৎসাহী। ঠাকুরবাড়িতে তখন রসের উংসে ভাটা পড়তে শুরু করেছে, একেবারে শুকিয়ে যায়নি, এমনি সময়ে শোভনা বড় হয়ে উঠলেন আপন মনে। দিদিরা ব্যস্ত গান-বাজনা ছবি আঁকা নতুন রকমের খাবারদাবার তৈরি করতে, ছোট বোনেদেরও হয়ত ওদিকেই বেকি কিন্তু শোভনা স্বপ্ন দেখেন পিসীমার মতো বই লেখার। কি সুন্দর গল্প! কেমন অবলীলায় লেখা! কি করে লেখিকা হওয়া যায়? পড়তে পড়তে শোভনা ভাবেন আর তারই ফাঁকে ইংরেজী শেখার ভিত গাঁথা হয়। হঠাৎ বিয়ে হয়ে গেল নগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে, সুদূর জয়পুরের ইংরেজীর অধ্যাপক। বাড়ি হাওড়ায়। চার ভাইয়ের বড় ভাই রায়বাহাদুর। নগেন্দ্রনাথ মেজ। সেজ ভাই যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল শোভনার সপ্তম বোন সুষমার। বিয়ের পর শোভনা গেলেন স্বামীর কর্মক্ষেত্রে। এক হিসেবে হয়ত ভালই হল। কলকাতার মেয়েরা তখন। এগিয়ে চলেছেন জোর কদমে। দুর্গামোহন দাসের মেয়েরা উঠে পড়ে লেগেছেন লোককল্যাণের কাজে। সরলা স্থাপন করেছেন গোখেল মেমোরিয়াল, অবলা খুলেছেন ব্রাহ্ম-বালিকা বিদ্যালয়। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সমাজের মধ্যমণি। প্রতিভা, প্রজ্ঞা, ইন্দিরা তো আছেনই আরো আছেন হিরন্ময়ী ও সরলা। আছেন মহারাণী সুনীতি, মণিকা, সুচারু, এসেছেন হেমলতা, প্রিয়ংবদা আরো কতজন। এঁদের মধ্যে নতুন কিছু করার কথা ভাবতেই পারতেন না শোভনা। তাই অনেক দূরে, নিভৃতে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র পরিবেশে গিয়ে শোভনা সংগ্রহ করে আনলেন ডালি ভর্তি মরুকুসুম, সেই সঙ্গে তার লেখার হাতটি গেল খুলে। চোখ পড়ল এমন সব জিনিষের ওপর যাদের সবাই দেখেছে অথচ কেউ লেখেনি তাদের ওপর।
