করুণ গানে অভিজ্ঞার জুড়ি ছিল না। বাল্মীকি প্রতিভার পর কবি লিখলেন কালমৃগয়া! বিদ্বজ্জনসভায় আবার এলেন অতিথিরা। ১৮৮২ সালের ২৩শে ডিসেম্বর, জমাট কুয়াশাভরা শীতার্ত সন্ধ্যা। তাদের সামনে শুরু হল কালমৃগয়া। বাল্মীকিপ্রতিভায় আত্মপ্রকাশ করেছিলেন প্রতিভা, এবার মঞ্চে অবতরণ করলেন অভিজ্ঞ। লীলার ভূমিকায় অভিজ্ঞর অভিনয় দেখে অনেকেই সেদিন চোখের জল রাখতে পারেননি। এই অভিনয়ে রবীন্দ্রনাথ সেজেছিলেন অন্ধমুনি আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দশরথ। কিন্তু অভিজ্ঞার অভিনয় সবার মনে যতটা দাগ কেটেছিল তার কাকারাও ততটা পারেননি। ভারতবন্ধু কাগজের সমালোচক লিখেছেন, লীলার গান শুনলে পাষাণ হৃদয়ও বিগলিত হয়।
অভিজ্ঞার পাষাণ-গলানো গনি আর শোনা গেছে বাল্মীকি প্রতিভা অভিনয়ের সময়ে। হাত বাঁধা বালিকা সেজে তিনি যখন গাইলেন, হা কী দশা হল আমার তখন বাঙালী দর্শকরা কেঁদে ভাসিয়ে দিলেন–এ একেবারে অবনীন্দ্রনাথের নিজের চোখে দেখা। আরো কিছু দিন পরে অভিজ্ঞ একটু বড় হয়েছেন। কণ্ঠে মাধুরীর সঙ্গে মিশেছে দরদ। ভালবাসার কুঁড়ি ধরল তাতে রবীন্দ্রনাথ এবার লিখলেন মায়ার খেলা। কথা ও সুরের সত্যিকারের মিলন হল যেন। তাকে আরো সুন্দর করে তুলল অভিজ্ঞার কণ্ঠ। ইন্দিরা ও তার স্বামী প্রমথনাথের সাক্ষ্যে জানা যায়, অভিজ্ঞ এ,সনে বসে বাল্মীকিপ্রতিভা বা মায়ার খেলার সমস্ত গান গাইতে পারতেন। বাল্মীকি প্রতিভার সমস্ত গান অভিজ্ঞার মতো মর্মস্পর্শী করে গাইতে প্রমথনাথ আর কাউকে শোনেননি। অপর দিকে মায়ার খেলার গান শুনে বহু দিন পরে প্রায়-বৃদ্ধ অবন ঠাকুরের স্মৃতি উদ্বেল হয়ে ওঠে, হায়, যে ওসব গান গাইবে সে মরে গেছে। সেই পাখির মতো আমাদের ছোট বোনটি চলে গেছে।…সে সুরে যে গাইত সে পাখি মরে গেছে। অভিজ্ঞা তাই স্মৃতি হয়েও যেন স্মৃতি নন। যে একবার তার গান শুনেছে সে-ই তাকে মনে রেখেছে।
মায়ার খেলায় অভিজ্ঞ নিতেন শান্তার ভূমিকা। শান্তার করুণ-মধুর বিষণ্ণতা অভিজ্ঞার কণ্ঠে জীবন পেত। পরে বির্জিতলায় আরেকবারের অভিনয়ে ইন্দিরা নিয়েছিলেন শান্তার ভূমিকা, কারণ শান্তার ভূমিকাভিনেত্রী তখন আর ইহলোকে নেই। অভিজ্ঞ ছিলেন শান্ত, গম্ভীর, রোদনভরা বিষণ্ণ। দেহ বলে তার কোন জিনিষ ছিল না, মুখের মধ্যে দুটি বড় বড় জীবন্ত চোখ ছিল। আর সে চোখ দুটি মাধুর্যপূর্ণ। নিষ্ঠুর শিকারীর অব্যর্থ লক্ষ্যভে েরিত হয়েছিল। বুঝি পাখির মতো কোমল হৃদয়। কালব্যাধি যে তলে তলে বাসা বেঁধেছে সে কথা কেউ বুঝতেই পারেনি। বিয়ের রাতে ঘটল অঘটন। অনুষ্ঠানের শেষেই তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। হঠাৎ জ্বর, প্রবল জ্বর। দিনে দিনে অসুখ বেড়ে চলে এবং জানা যায় দুরারোগ্য ক্ষয় রোগ তাকে গ্রাস করে ফেলেছে। চিকিৎসার অসাধ্য। কৃশপাণ্ডুর চাঁদের মতোই একমাসের মধ্যে হারিয়ে গেলেন অভিজ্ঞ। মৃত্যু হল জোড়াসাঁকোর বাড়িতেই। চিকিৎসক স্বামী বধূকে আরোগ্য করবার সুযোগই পেলেন না।
অভিজ্ঞার মৃত্যুতে সবচেয়ে ক্ষতি হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের। সেই প্রথম পরীক্ষা-নিরীক্ষার যুগে অভিজ্ঞার মতো প্রতিভাময়ী গায়িকা বেঁচে থাকলে কবি প্রয়োগের দিক থেকেও রবীন্দ্রসঙ্গীতকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারতেন। কিন্তু সে বুঝি হবার নয় তাই অকালে ঝরে পড়ল অস্ফুট কোরটি, অকালে নিভে গেল বাংলা দেশের একটি রত্নপ্রদীপ। অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে কবি চারটি সনেট লিখেছিলেন— নদীযাত্রা, মৃত্যুমধুরী, স্মৃতি ও বিলয়। নতুন করে কবির যেন মনে পড়েছিল মৃত্যুমাধুরীমাখা দুটি আশ্চর্য সুন্দর চোখ আর প্রভাত-পাখির মতো সুমধুর কণ্ঠের অধিকারিণী অভিজ্ঞাকে। এখানে একটা কথা বলে নিই। কবিমানসী গ্রন্থের লেখক জগদীশ ভট্টাচার্যের মতে এই সনেট চারটি কবির নতুন বৌঠানের স্মৃতিসুধায় ভরপুর। কিন্তু একথা মেনে নিতে পারিনি। ক্ষিতিমোহন সেনের ডায়রিতে যে চৈতালি কাব্য আলোচনার অনুলেখন রাখা আছে তাতেও দেখা যাবে কবি এই সনেটগুলো সম্পর্কে মন্তব্য করেছেন, আমার ভাইঝি অভির মৃত্যুর পরে লেখা। অভিজ্ঞার মৃত্যুর পরে আর একজনও তার কথায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনি আর কেউ নন, প্রমথ চৌধুরী, যিনি কোন রকম ভাবালুতাকে প্রশ্রয় দেওয়া অনাবশ্যক মনে করতেন। তার কাছেও অভিজ্ঞ একটি বিস্ময়! তার মনে হয়েছিল অভিজ্ঞ সেক্সপীয়রের কল্পিত আরিয়েলের সগোত্র। অর্থাৎ অশরীরী সঙ্গীত। বারো তেরো বছর বয়সের এই কিশোরী তার মনে স্থায়ী ছাপ রেখে গিয়েছিলেন, জীবনে কোন কোন লোক প্রথম থেকেই আমাদের মনে বিশেষ ছাপ রেখে যায়, যা কখনো বিলুপ্ত হয় না। অভি ছিল সেই দু-চারটি লোকের ভিতর একজন। প্রমথনাথের মনে হয়েছিল, ইংরেজরা বলে whoin the gods love die young। অভি ছিল সেই দেবানাং প্রিয় একটি বালিকা। কেননা সে কখনো কিশোরী হয়নি।
সময় কারুর জন্যে বসে থাকে না; অভিজ্ঞার ঠিক পরের বোন মনীষাও বড় হয়ে উঠেছেন। তাঁর দিদির রবীন্দ্রসঙ্গীতে এত নাম কিন্তু তিনি বেছে নিলেন বিদেশী যন্ত্রসঙ্গীতকে। বড়দিদি প্রতিভার মতো তিনিও খুব ভাল য়ুরোপীয় গান এবং পিয়ানো বাজাতে পারতেন। পরে পিয়ানোর দিকেই ঝোঁক থাকায় এদেশের শ্রেষ্ঠ পিয়ানিস্টদের একজন হয়ে ওঠেন। তবে ভারতে মনীষা খুব পরিচিত ছিলেন না। কারণ আর কিছুই নয়, বিদেশী সঙ্গীতের চর্চা। অন্যান্য বোনেদের মত তিনিও লরেটোয় পড়তেন, বাড়িতে চলত ক্লান্তিবিহীন সঙ্গীতসাধনা। তবু দেশী গানের সঙ্গে তার অন্তরের যোগ ছিল না বললেই হয়। প্রতিভা গাইতেন বিলিতি গান, পিয়ানোয় বাজাতেন ওস্তাদি বাজনা, পরে তার ঝোঁক পড়ে হিন্দুস্থানী গানের ওপর। কিন্তু মনীষ প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পিয়ানো চর্চা করেই কাটিয়েছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথের পদপ্রান্তে রাখে সেবকে ও দু-তিনটি গানে গিয়ানোর সঙ্গত বসিয়েছিলেন কিন্তু সেগুলো তেমন জনপ্রিয় হয়নি। যেমন জনপ্রিয় হয়নি তমীশ্বরাণাং বেদমন্ত্রের পিয়ানো সংগত। এর ফলে মনীষা বাঙালীদের গানের জলসায় প্রায় অপরিচিতাই রয়ে গেছেন। আরো একটা কারণও আছে। এক সময় সাহেবিয়ানার অনুকরণে বাঙালীর ঘরে ঘরে পিয়ানোচর্চা শুরু হয়েছিল ঠিকই কিন্তু পিয়ানো কোনদিনই বাঙালীর ঘরের জিনিষ হয়ে ওঠেনি। এখন বিলিতি বাজনা সর্বস্বতার যুগ, তবু পিয়ানো, তার বিশাল আকার আর বিশাল দাম দিয়ে অভিজাত ড্রইংরুমের বাইরে বড় একটা এসে পৌঁছয়নি—তার স্থান নিয়েছে পিয়ানো-একর্ডিয়ান, গীটার প্রভৃতি ছোট ছোট বাদ্যযন্ত্র। তাই পিয়ানিস্টরাও সাধারণ সমাজে পরিচিত নন। মনীষা তার মোগ্য সম্মান পেয়েছিলেন বিদেশে।
