বাস্তবিকই ইন্দিরা যে কত গানের স্বরলিপি করেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। শুধু সুর এবং স্বরলিপি রক্ষা করা নয়, তিনি রবীন্দ্রসঙ্গীতের তথ্য ও তত্ত্ব দুটোকেই সমৃদ্ধ করেছেন। একদিক থেকে স্বরলিপি উদ্ধার করে ও গান শিখিয়ে অপর দিকে সঙ্গীত সংক্রান্ত প্রবন্ধ লিখে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে ত্রিবেণী সঙ্গম এমনই একটি ছোট্ট বই। এতে ইন্দিরা দেখিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ অপরের সুরে নিজের কথা গেঁথে গেঁথে কত নতুন গান সৃষ্টি করেছেন, আবার পরের কথায় তার সুর দেওয়ার সংখ্যাও যে একেবারে নেই তা নয়। কবির যাবতীয় ভাঙা গানের একটি লিস্ট তৈরি করে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন, সামান্য অদলবদলের মধ্যে কবি কি অসাধ্য সাধন করেছিলেন। সঙ্গীত জগতে এই পুস্তিকাটি অমূল্য সংযোজন। রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে এ যুগের অনেকেই নানারকম আলোচনা করেছেন। এ ব্যাপারে মহিলাদের সংখ্যা কম হলেও পুরুষদের সংখ্যা নগণ্য নয়। কিন্তু কেউই ইন্দিরার মতো রবীন্দ্রসঙ্গীত নিয়ে এত ব্যাপক আলোচনা বোধহয় কেরেননি। যারা করেছেন তাদের আলোচনারও আকর হিসেবে গৃহীত হয়েছে ইন্দিরার সঙ্গীত চিন্তা! যাইহোক, ইন্দিরার দেওয়া হিসেব থেকে জানা যায়, রবীন্দ্রনাথের দুশ সাতাশটা ভাঙা গানের বারোটির সুর নেওয়া হয়েছে স্কচ ও আইরিশ গান থেকে। রবীন্দ্রসঙ্গীতে হিন্দুস্থানী গানের দানও কম নয়। ভাবতে অবাক লাগে, আমাদের চির পরিচিত বিদায় করেছ যারে নয়ন জলের উৎস বাজে ঝননন। মোরে পায়েলিয়, তুমি কিছু দিয়ে যাও-এর উৎস কৈ কছু কহরে কিংবা শূন্য হাতে ফিরি হে নাথ-এর উৎস রুমঝুম বরষে হতে পারে। অপরের কথায় কবির সুর দেবার কথাও আছে। বিদ্যাপতির পদ কিংবা বঙ্কিমচন্দ্রের বন্দেমাতরম্-এর প্রথম স্তবক ছাড়াও কবি অক্ষয় বড়াল, সুকুমার রায়, হেমলতা ঠাকুরের গানে সুর দিয়েছিলেন।
ইন্দিরার লেখা রবীন্দ্রসঙ্গীত বিষয়ক প্রবন্ধের সংখ্যা অনেক। বহু পত্রিকায় তিনি এ নিয়ে আলোচনা করেছেন। এদের মধ্যে সঙ্গীতে রবীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রসঙ্গীতের শিক্ষা, রবীন্দ্রসঙ্গীতের বৈশিষ্ট্য, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতপ্রভাত, স্বরলিপি পদ্ধতি, শান্তিনিকেতনে শিশুদের সঙ্গীতশিক্ষা, হারমনি বা স্বরসংযোগ, রবীন্দ্রসঙ্গীতে তানের স্থান, রবীন্দ্রনাথের গান, বিশুদ্ধ রবীন্দ্রসঙ্গীত, হিন্দুসঙ্গীত, আমাদের গান, স্বরলিপি, দি মিউজিক অব রবীন্দ্রনাথ টেগোর, ইন্দিরার সঙ্গীত চিন্তার পরিচয় বহন করে।
শুধু কাজ দিয়ে বোধহয় ইন্দিরার বিচার করা যায় না। তিনি সারাজীবন নানারকম কাজ, মহিলা সমিতি, প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন। কিছুদিনের জন্যে বিশ্বভারতীর উপাচার্যের পদও তাকে গ্রহণ করতে হয়েছিল। পেয়েছিলেন দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক এবং বিশ্বভারতীর দেশিকোত্তমা। কিন্তু যারা তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত ছিলেন তারা জানতেন ইন্দিরার তুলনায় এসব সম্মানউপাধি-স্বর্ণপদক কত সামান্য। মর্ত্যের কুসুম দিয়ে কি স্বর্গের লক্ষ্মীকে সাজানো যায়?
এইখানেই ইন্দিরা প্রকৃত বৈশিষ্ট্য। কোন কাজ করে নয়, কোন কাজের মধ্যে নয়, শুধু উপস্থিতি দিয়েই তিনি ভরে দিতে পারতেন সব শূন্যতাকে। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্র-প্রয়াণের পর রবীন্দ্র ভাবধারাকে একটানা কুড়ি বছর ধরে ধচিয়ে রেখেছিলেন তিনি। সঙ্গে নিশ্চয় আরো অনেকে ছিলেন কিন্তু তাঁরা সঙ্গীমাত্র, তার বেশি কিছু নয়। ইন্দিরা একাই সব।
ইন্দিরার কমনীয় ব্যক্তিত্বে যে কমল হীরের দীপ্তি ফুটে উঠেছে তাকেই বলা যায় কালচার। এই কালচারের ছাপ ইন্দিরার সাজসজ্জায়-বাক্যবিন্যাসেঘরসজানোয়-আচার-ব্যবহারে-প্রেমপত্রে-সাহিত্যচর্চায় স্বামীসেবায়-গৃহিণীপনায় -সবুজপত্রে-কমলালয়ে-শান্তিনিকেতনের আশ্রম-কুটিরে সর্বত্র পড়েছিল। এই বিশিষ্টতাই তার সবচেয়ে বড় দান। বাংলার নারীদের সামনে তিনি তার প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত আদর্শ জীবনটিকে তুলে ধরেছিলেন। তারই মধ্যে ফুটে উঠেছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের নিজস্ব সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠ পরিচয়।
০৭. হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের কথা
আবার হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের কথায় ফিরে আসা যাক। প্রতিভা ও প্রজ্ঞার আরো ছটি গুণবতী বোন ছিলেন। তাঁদের সেজ বোন অভিজ্ঞাসুন্দরী বেঁচে আছেন সকলের স্মৃতিকথায়। তাকে অনেকেই দেখেননি কিন্তু যারা দেখেছিলেন তারা আর ভোলেননি। সবাইকে অবাক করা এই মেয়েটিই রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে প্রিয় ভাইঝি অভি। তার গলায় নিজের গান শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। শিলাইদহে থাকতে থাকতে অভিজ্ঞার গান শোনবার জন্যে তার মন উঠত হু হু করে। ইন্দিরাকে লেখা চিঠিতেও সেই ব্যাকুলতার আভাস, অভির মিষ্টি গান শোনবার জন্যে আমার এমনি ইচ্ছে করে উঠল যে তখন বুঝতে পারলুম, আমার প্রকৃতির অনেকগুলি ক্রন্দনের মধ্যে এও একটা ক্রন্দন ভিতরে ভিতরে চাপ ছিল।
কি ছিল অভিজ্ঞার কণ্ঠে?
অকালে, নিতান্ত অসময়ে হারিয়ে যাওয়া এই কিশোরীর কণ্ঠে কোন অনির্বচনীয় মাধুরী ধরা পড়ত, কে দেবে উত্তর? যারা দিতে পারতেন তারা সবাই তো পরলোকে। শোনা গেছে, রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের গানগুলি : অভিজ্ঞার কণ্ঠে মূতি লাভ করত। হিন্দী গানও অভিজ্ঞ মর্মস্পর্শী করে গাইতে পারতেন। ছায়ানটের ঠারি রহো মের আঁখন আগে গানটি কিশোরী অভির। কণ্ঠে শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন প্রমথ চৌধুরী। ঠাকুরবাড়িতে তখন সুবর্ণযুগ চলছে। রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টির আপন খেয়ালে তন্ময়। একের পর এক লিখে চলেছেন বাল্মীকিপ্রতিভা, কালমৃগয়া, মায়ার খেলা। আর ক্লান্তিহীন কণ্ঠে তাকে রূপ দিয়ে চলেছেন অভিজ্ঞ।
