এ ঘটনা আশুতোষ ও প্রতিভার বিয়ের সময়কার। তখন বিয়েতে কোন বাধা আসেনি। ইন্দিরাকে নিয়ে পারিবারিক মনান্তরের সূচনা হয়েছিল বলে বিয়ের পর নববধু শ্বরবাড়ির পরিবর্তে গিয়ে উঠলেন ছোট ননদ মৃণালিনীর বাড়িতে। তারপর তার নিজের বাড়ি কমলালয়ে। এরপরে তো একটানা কাজের ইতিহাস!
বাংলার নারী জাগরণের অন্যতম নেত্রী ইন্দিরাকে তার মায়ের মতো পদে পদে বাধা পেতে হয়নি। তাই খ্রীশিক্ষা, নারীজাগরণ, স্বাধীনতা, স্বেচ্ছাচার, মেয়েদের অধিকার ও কর্তব্য, আত্মরক্ষাসমিতি, সুবিধে-অসুবিধে, কাজকর্ম, এককথায় বলতে গেলে মেয়েদের সামগ্রিক ভূমিকার কথা নিরপেক্ষভাবে ভাববার অবকাশ ইন্দিরা পেয়েছিলেন। সেটা জ্ঞানদানন্দিনী, কাদম্বরী কিংবা অন্য কেউ পাননি। কোনটা সত্যি ভাল আর কোনটার সত্যি প্রয়োজন আছে আকস্মিক উত্তেজনাটা থিতিয়ে না গেলে সেটা ভাল বোঝা যায় না। ইয়ংবেঙ্গল গ্রুপকে যেমন নিছক সংস্কার ভাঙ্গার জন্যে কতকগুলো অর্থহীন কাজ করতে হয়েছিল তেমনি প্রথম যুগের মেয়েদেরও কিছু সাহস দেখাবার প্রয়োজন ছিল। দরকার। ছিল কয়েকটি অমূল্য আত্মাহুতির। মেয়েদের চোখের সামনে নতুন নজির সৃষ্টি করবার জন্যে কাদম্বরীর অশ্বারোহণ, জ্ঞানদানন্দিনীর একলা বিলেত যাওয়া, কাদম্বিনীর ডাক্তারি পড়া, সরলা রায় ও অবলা বসুর শিক্ষা, চন্দ্রমুখীর এম. এ. পড়া, ব্রাহ্ম সমাজে চিকের বাইরে এসে উপাসনা করা, জামা জুতো পরে খোলা গাড়ি চড়ে বেড়ানোর দরকার ছিল বৈকি। খুবই দরকার ছিল। নইলে অন্য মেয়েদের মন থেকে অবরোধের, পাহাড় নামবে কেমন করে? কিন্তু ইন্দিরা এঁদের পরের যুগের মানুষ। তিনি সেকেলে রক্ষণশীলতা আর একেলে উগ্র আধুনিকতা দুই-ই বর্জনের পক্ষপাতী ছিলেন। সব জায়গাতেই তিনি উগ্রতাবিরোধী এবং মধ্যপন্থাবলম্বী। তাঁর নিজস্ব মত :
সেকালের ধীর-স্থিরাদের সঙ্গে একালের বীৰা হতে হবে; অথবা সেকালের শ্রী ও হ্রীর সঙ্গে একালের ধী মেলাতে হবে-বঙ্কিমবাবু হলে যাকে বলতেন প্রখরে-মধুরে মেশা! এই সামঞ্জস্যই নারীজীবনের মূলমন্ত্র।
ইন্দিরার প্রতিটি লেখার স্টাইল ঋজু ও স্বচ্ছ। তাঁর কাকার ভাষায় সমুজ্জ্বল। তিনি ইন্দিরার লেখা প্রবন্ধ পড়েও বুঝতে পারেননি এই স্টাইল ইন্দিরার। কারণ খুব স্বাভাবিক। প্রবন্ধ লেখার ক্ষেত্রে এখনও পুরুষের অগ্রাধিকার সর্বজনস্বীকৃত। মেয়েরা যতই এগিয়ে যাক না কেন, গভীর মনন ও চিন্তার ফসল ফলেছে পুরুষের কলমেই একথা অস্বীকার করে লাভ নেই। বিশ্ব সাহিত্য সম্পর্কেই একথা প্রযোজ্য। বাংলা দেশে তো হবেই। তবে এদেশ বড় আশ্চর্য দেশ। এখানে অসম্ভব বলে কিছু নেই। তাই পর্দার আড়ালে, নিতান্ত অন্দরমহল থেকেও মাঝে মাঝে এমন একটি কূট বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া গেছে যাতে তাবৎ পুরুষ সমাজের ও তাক লেগে গেছে। মননের ক্ষেত্রেও কোন কোন মেয়ে এমন পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিতে পেরেছেন যে তাকে শ্রেষ্ঠ আসনে বসাতে কেউ দ্বিধা করেননি। ইন্দিরা সেই বিরলতমাদের একজন। তার লেখা নারীর উক্তির ছটি নারী সংক্রান্ত প্রবন্ধ, রাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ।
আবার ইন্দিরা যখন স্মৃতিকথা লিখতে বসতেন তখন তাতে মিশত গল্পের রস। প্রখর স্মৃতিশক্তির সাহায্যে তিনি রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের বহু গান উদ্ধার করেছেন। না হলে অনেক গানেরই সুর যেত হারিয়ে। স্মৃতিকথা হিসেবে ইন্দিরার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য রচনা রবীন্দ্রস্মৃতি। পাঁচ ভাগে ভাগ করে তিনি রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জড়িত সঙ্গীত, সাহিত্য, নাট্য, ভ্রমণ ও পারিবারিক স্মৃতির কথা বলেছেন। এতে রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের অনেক কথাই জানা। যায়। স্মৃতিকথা লেখবার সময় ইন্দিরা সবসময় একটি বিশেষ রীতি মেনে চলতেন, যাতে যার কথা বলতেন, তাঁর ঘরোয়া ব্যক্তিত্বের ছবি ফুটে উঠত। এই ছোট ছোট ব্যক্তিত্বের সমষ্টিকে তিনি বলতেনছোট ফুলের শ্রদ্ধাঞ্জলি। তাঁর শেষ রচনা শ্রুতি ও স্মৃতি যেন রূপকথার ঝাপি। এটি ইনিরার নিজের কথা—শুরু হয়েছে তার জন্ম থেকে আর শেষ হয়েছে দাদা সুরেন্দ্রনাথের পৌত্র সুপ্রিয়ের জন্মবৃত্তান্তের সঙ্গে সঙ্গে। ঠাকুরবাড়ির এবং চৌধুরীবাড়ির বহু খবর এতে পাওয়া যাবে। গ্রন্থটি এখনও প্রকাশিত হয়নি, ফাইলবন্দী হয়ে বিশ্বভারতীর রবীন্দ্রভবনে পড়ে আছে।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে ইন্দিরার ভূমিকা যে কী এক কথায় তা বলা যাবে না। তাঁর দিদি প্রতি গানের জগতে মেয়েদের মুক্তি দিয়েছিলেন। আর ইন্দিরা উদ্ধার করেছিলেন প্রায় লুপ্ত প্রথম দিকের রবীন্দ্রসঙ্গীতকে। তার চেয়ে পনের দিনের ছোট অভিজ্ঞার কণ্ঠেও রবীন্দ্রসঙ্গীত নতুন রূপ পেতে শুরু করেছিল কিন্তু অকালে মৃত্যু হওয়ায় অভিজ্ঞা স্থায়ীভাবে কিছু রেখে যেতে পারেননি। সে অভাব পূরণ করেছিলেন তার বোনদিদি ইন্দিরা! দেশী ও বিলিতি উভয় সঙ্গীতে তিনিও তালিম নিয়েছিলেন শৈশবেই। এমন কি যন্ত্রসঙ্গীতেও তার হাত ছিল পাকা। সেন্ট পলস্-এর অর্গানিস্ট স্লেটার সাহেবের কাছে পিয়ানো ও সিনর ম্যাটোর (Signor Manzato) কাছে তিনি শিখেছিলেন বেহাল। ওস্তাদি হিন্দুস্থানী গান শেখেন বদ্রীদাস মুকুলের তত্ত্বাবধানে। হেমেন্দ্রর মেয়েরা গান নিয়ে মেতে থাকলেও অভিজ্ঞ ছাড়া আর কেউ রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চা বেশি করেননি। তাই ইন্দিরাকে একাই সব ভার নিতে হয়েছিল। তিনি নিজেও পরিহাসতরল কণ্ঠে বলতেন, আমার জীবনের যতদূর পর্যন্ত দেখতে পাই যেন সামনে এক বিস্তীর্ণ স্বরলিপির মরুভূমি পড়ে রয়েছে, তার মাঝে ম ঝ রেফ ও হসন্তের কাঁটাগাছ।
