অনুবাদের কাজটা বেশ কঠিন। অচেনা ভাষাকে রক্তে চেনা ভাষায় রূপান্তরিত করলেও তাতে প্রাণের রস আনা যায় না। কবির ভাষায় তর্জম মরা বাছুরের মূর্তি, তা সেই মরা বাছুরকেই প্রাণ দিতেন ইন্দিরা। রবীন্দ্রনাথের বহু কবিতা তিনি অনুবাদ করেছেন। কবি নিজেও স্বীকার করেছেন সে কথা। ইন্দিরা অনুবাদের ভার নিলে তিনি যতটা নিশ্চিন্ত হতেন ততখানি ভরসা আর কারুর ওপর ছিল না। চিঠিতে লিখেছেন, তোর সব তর্জমাগুলিই খুব ভাল হয়েছে। এইমাত্র তের তর্জমালি অপূর্বকে দেখালুমসে বললে আমার কবিতার এত ভাল তর্জমা সে আগে আর দেখেনি। [৬. ১. ১৯২৯ ] আবার। দেখা যাবে জাপান যাত্রী অনুবাদের ভার কবি ইন্দিরাকে দিয়েই নিশ্চিন্ত হতে চান।
কবে থেকে অনুবাদ করা শুরু করেছিলেন ইন্দিরা? ১২৯২ সালের বালকে রাস্কিনের ইংরেজী বুচনা তুলে দিয়ে এক প্রতিযোগিতা আহ্বান করেছিলেন জ্ঞানদানন্দিনী। পৌষ সংখ্যায় পুরস্কার পেলেন যোগেন্দ্রনাথ লাহা। তার অনুবাদের সঙ্গে আর একটা অনুবাদও ছাপা হল। অনুবাদিকার নাম দেখা গেল শ্ৰীমতী ইঃ–। সম্পাদিকা জানালেন একটি অল্পবয়স্কা বালিকার রচনা? অনেকের মতে এই শ্ৰীমতী ইঃ যে ইন্দিরা তাতে সন্দেহ নেই। তখন থেকেই ইন্দিরার আত্মগোপনের চেষ্টা শুরু হয়েছে। ফলে আজকের এই নিজের ঢাক পেটানোর কোলাহলে ইন্দিরা ঠিক কি করেছিলেন তা জানা যাচ্ছে না। এমনকি তার সমস্ত রচনার একটি তালিকাও বোধহয় এখনো তৈরী হয়নি। সাময়িক পত্রের পাতা থেকে সেসব সংগ্রহ করে একটা অখণ্ড গ্রন্থাবলী প্রকাশের চেষ্টা তো অনেক দূরের কথা।
রবীন্দ্র-রচনার অনুবাদ ছাড়াও ইন্দিরা অনুবাদ করেন প্রমথ চৌধুরীর চার ইয়ারী কথার। টেল অব ফোর ফ্রেণ্ডস্ বেশ উল্লেখযোগ্য অনুবাদ। এছাড়া তিনি সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে যুগ্মভাবে অনুবাদ করেন মহর্ষির আত্মজীবনী দি অটোবায়োগ্রাফী অব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ টেগোর। এ তো গেল বাংলা থেকে ইংরেজী অনুবাদের কথা। ইন্দিরা ফরাসী থেকে বাংলায় অনুবাদের ক্ষেত্রেও অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। ফরাসী ভাষা সকলে জানেন না। ইন্দিরা ফরাসী ভালই জানতেন। প্রমথ চৌধুরীর সান্নিধ্য তাকে আরও শাণিত করে তুলেছিল। তার যে চারটি অনুবাদের কথা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত সেগুলি হল রেনে গ্রুসের ভারতবর্ষ, পিয়ের লোতির কমল কুমারিকাম, মাদাম লেভির ভারত ভ্রমণ কাহিনী (কলম্বো থেকে শান্তিনিকেতন) এবং আঁদ্রে জীদের লেখা ফরাসী গীতাঞ্জলির ভূমিকা।
ইন্দিরা প্রথম প্রেমে পড়লেন কবে? সে এক মজার ব্যাপার। সেকথা তিনি জানিয়েছেন একেবারে জীবনের শেষপর্বে নিজের আত্মকাহিনী শ্রুতি ও স্মৃতিতে। বিশেষ করে তার আবদারেই রবীন্দ্রনাথ তাঁহার দুই ভাইবোনকে নিয়ে গিয়েছিলেন হাজারিবাগে। কারণ, তখনকার দিনে কনভেন্টের এক একজন মেয়ের এক একজন সিস্টারের প্রেমে পড়ার রেওয়াজ ছিল। বোধহয়। ভবিষ্যৎ জীবনের মকস স্বরূপ তা যাই হোক, ইন্দিরা লিখেছেন তাঁর প্রেয়সী ছিলেন সিস্টার এ্যালাইসি। তাঁকে হাজারিবাগের কনভেন্টে বদলি করা হয়েছিল বলেই ইন্দিরার এ অভিযান।
প্রেমের কথা যখন উঠলই তখন ইন্দিরার জীবনের কথাও এক ফাঁকে সেরে নেওয়া যাক। পূর্ণিমা ঠাকুরের লেখা ইন্দিরার জীবনকথা থেকে জানা যায়, তিনি যখন স্কুলে যেতেন তখন ফটকের বিপরীত দিকের মাঠে এক দর্শনপ্রার্থী যুবক দাঁড়িয়ে থাকত। কোন রকম আলাপ পরিচয় হয়নি। বাড়িতে হাসির ধুম পড়ে যায়। রবীন্দ্রনাথ এই ঘটনাটিকে নিয়েই লিখেছিলেন একটা গান–সখি প্রতিদিন হায় এসে ফিরে যায় কে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বাইরে বেরোতেন বা অভিনয় করতেন ঠিকই কিন্তু তারা কোন অনাত্মীয় পুরুষের সঙ্গে কথা বলতেন না। বেশ পরবর্তীকালে জসীমউদ্দীন যখন ঠাকুরবাড়ির ছেলেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে ওঠেন তখনও এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছিলেন। যাইহোক, ইন্দিরার এই নীরব দর্শনপ্রার্থীর সঙ্গে আকস্মিকভাবে দেখা হয়েছিল বহুকাল পরে। দুজনেরই বয়স তখন আশি পেরিয়ে গেছে। শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র সদনে সেই ভদ্রলোক এসেছিলেন তার ছেলের কাজের আবেদন নিয়ে। গল্পের মতো ঘটনা! তবু! কতদিন কেটে গেছে। দুজনেই অস্বস্তি বোধ করেছিলেন। হয়ত কেঁপে উঠেছিল চোখের পাতা কিংবা গলার স্বর। দুজনেরই। হায়! সেদিন কি আর ফেরে? কোনরকমে দরকারি কথা তাড়াতাড়ি সেরে উঠে পড়েছিলেন ইন্দিরা। গল্পটা তার আত্মকাহিনীতেও আছে।
ইন্দিরার পাণিপ্রার্থীর অভাব ছিল না। তার মধ্যে ছিলেন প্রমথ চৌধুরী এবং তাঁর দাদা যোগেশ চৌধুরীও। কয়েক বছর আগে আশুতোষের সঙ্গে প্রতিভার বিয়ে হয়েছে। দুই পরিবারের মধ্যে সৌহার্দ্য গড়ে উঠলেও এই মেলামেশার ফল সব সময় ভাল হয়নি। কোন অজ্ঞাত কারণে উভয় পরিবারের সম্পর্কে চিড় ধরে। চৌধুরীদের কোন কোন ছেলে ব্রাহ্ম হয়ে যাওয়ায় এই তিক্ততা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠে। ইন্দিরা ও প্রমথর বিয়েতেও নানা রকম বাধা আসে। কিন্তু কোন বাধাই টেকেনি। বিয়ের প্রস্তাব প্রথমে জানান প্রমথ তাতে সমর্থন ছিল ইন্দিরার, ঠাকুরবাড়ির আপত্তি তো ছিল না। তাদের সকলেই খুশি হলেন। কিন্তু বাধা এসেছিল চৌধুরীবাড়ি থেকে সম্ভবত যোগেশ চৌধুরীর জন্যেই। নাহলে প্রতিভার বিয়েতে আপত্তি হয়নি, এখন হবে কেন? প্রসন্নময়ী তার পূর্বকথায় জানিয়েছেন, ঠাকুর পরিবারে ভাতার বিবাহকালে দেশে আর নৃতন কোন আন্দোলন উপস্থিত হয় নাই, বরং বুদ্ধিমতী পিসিমাতারা এ কার্য অনুমোদনই করিয়াছিলেন ও সুশীল সুলক্ষণা ভ্রাতুস্পুত্রবধূ দেখিয়া পরম পরিতুষ্ট হইয়াছিলেন। পয়মন্ত ধুর আগমনে আমাদিগের গৃহের সর্বাংশে মঙ্গল হইয়াছে।
