ইন্দিরার সমস্ত কাজকর্মের মধ্যেও বড় হয়ে উঠেছিল তার অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। অপরূপ লাবণ্যময়ী ইন্দিরা তাই অনন্যা হয়েও সবার অতি আপন বিবিদিতে পরিণত হয়েছিলেন। মনে হয় তিনি সেই জাতের মানুষ যারা শুধুমাত্র তাদের জীবনযাপনের মধ্যেই সংসারকে মধুময় করে তোলেন। প্রতিদিনের জীবনযাত্রা পথে তাদের হৃদয়ের মর্য আর পবিত্রতাই অপরের পথের দিশারী হয়ে ওঠে। মাথা তখন আপনিই নত হয়ে আসে সেই পরমতমার। উদ্দেশ্যে। কিন্তু শুরুতেই এ কথা কেন? ইন্দিরার সমগ্র জীবন যে ভরা। অশেষের ধনে সুতরাং আবার পেছন ফিরে তাকানো যাক।
১৮৭৩ সাল। সন্তানসম্ভবা জ্ঞানদানন্দিীর ইচ্ছে এবার মেয়ে হোক। ঘর আলো করা, কোলজোড়া। খুব সুন্দর দেখতে হবে। প্রাণভরে তাকে সাজাবেন। মায়ের ইচ্ছে অপূর্ণ রইল না। মহারাষ্ট্রের কালাগি শহরে ভূমিষ্ঠ হল ঠাকুরবাড়ির একটি মেয়ে, আকাশ থেকে যেন নেমে এল একটি তারা। কাঁটা কাঁটা ধারাল মুখশ্রী, সুন্দর গায়ের রঙ, বড় বড় দুটি উজ্জ্বল চোখ, রজনীগন্ধার মতো সতেজ সুন্দর দেহলতার অধিকারিণীর নাম রাখা হল ইন্দিরা। কলকাতায় ইন্দিরার রূপের খ্যাতি কেমন ছড়িয়ে পড়েছিল তার একটি সমসাময়িক সাক্ষী উপস্থিত করি। বোধহয় ১৮৮৪ সাল হবে। সরস্বতী পুজোর দিন রবীন্দ্রনাথ এসেছেন এ্যালবার্ট হলে বক্তৃতা দিতে, সঙ্গে ইন্দিরা।
প্রমথ চৌধুরী তখন ছাত্র। অনেকখানি হেঁটে প্রেসিডেন্সী কলেজের মাঠে বন্ধু নারায়ণ চন্দ্র শীলের সঙ্গে দেখা। বন্ধুকে নারায়ণ সোৎসাহে জানালেন রবীন্দ্রনাথ এ্যালবার্ট হলে বক্তৃতা দিচ্ছেন, সঙ্গে নিয়ে এসেছেন তার ভ্রাতুস্পুত্রীকে। চল না, রাস্তাটা পেরিয়ে আমরা এ্যালবার্ট হলে যাই। প্রমথ রাজী হলেন না বক্তৃতা শুনতে যেতে। বন্ধু বললেন, রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতা না। শুনতে চাও, অন্তত তার ভ্রাতুস্পুত্রীটিকে দেখে আসি চল। শুনেছি মেয়েটি নাকি অতি সুন্দরী। রেগে উঠে গাছতলায় শুয়ে পড়ে প্রমথ বলেছিলেন, পরের বাড়ির খুকি দেখবার লোভ আমার নেই। কিন্তু অনেকেরই সেদিন সে আগ্রহ এবং কৌতূহল ছিল। পরে এই প্রমথর সঙ্গেই বিয়ে হয়েছিল ইন্দিরার। প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় এই ঘটনাটির উল্লেখ করায় ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সম্পর্কে সমসাময়িক কালের আগ্রহ এবং কৌতূহলের একটা ছোট্ট ছবি আমরা দেখতে পেয়ে যাচ্ছি।
শুধু কি রূপ? ইন্দিরার গুণের সংখ্যাও কম ছিল না। আরো একটা কাজ করেছিলেন তিনি। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের মধ্যে ইন্দিরাই সর্বপ্রথম বি. এ. পাশ করেন। এই পরিবার বাঁধাধরা শিক্ষাকে কোনদিন মূল্য দেননি। কিন্তু ডিগ্ৰীলাভ? তারও একটি মূলা আছে বৈকি। বিশেষ করে সেযুগে। যখন গ্র্যাজুটে মেয়েদের দেখবার জন্যে রাস্তায় ভিড় জমে যেত। চন্দ্র মুখী ও কাদম্বিনী কিছুদিন আগেই ঠেলাঠেলি করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ দরজা খুলে ফেলেছেন। এবার সেই পথে অগণিত মেয়ের ভিড়। অবশ্য ইন্দিরারও আগে গ্র্যাজুয়েট হয়েছেন স্বর্ণকুমারীর মেয়ে সরলা ঘোষাল। এবার খোদ ঠাকুরবংশের মেয়ে ইন্দিরা। তিনি লরেটো থেকে এনট্রান্স পাশ করে বাড়িতেই বি. এ. পড়েছিলেন ইংরেজীতে অনার্স ও ফরাসী ভাষা নিয়ে। ১৮৯২ সালে বি. এ. পরীক্ষায় সর্বোচ্চ স্থান লাভ করে ইন্দিরা পান পদ্মাবতী স্বর্ণপদক। তার আগে আরো এক ডজন মহিলা গ্র্যাজুয়েট কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়েছেন তবে তারা কই ফরাসী ভাষা নিয়ে পড়াশোনা করেননি। ইন্দিরার আট বছর পরে যাবার ফ্রেঞ্চ পড়েছিলেন তারকনাথ পালিতের মেয়ে লিলিয়ান পালিত, ভাররতবর্ষে প্রথম বিবাহ-বিচ্ছেদের মামলা এনে যিনি খুব চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরনো কাগজপত্র দেখে জানা গেছে ১৮৮২ থেকে ১৮৯১ সাল পর্যন্ত মাত্র বারোজন মহিলা গ্র্যাজুয়েট হয়েছিলেন। ইন্দিরা তেরো নম্বর। তিনজনের মধ্যে একজন মাত্র ডবল এম. এ. পাশ করেন তার নাম নির্মলবালা সোম। তিনি ১৮৯১-এ ইংরেজী ও ১৮৯৪-এ মর্যাল ফিলসফিতে এম, এ. পাশ করেন। তবে এই সংখ্যা যে হু হু করে বাড়ছিল তাতে সন্দেহ নেই। নাহলে ১৮৯২-এর এই সংখ্যা ১৯১০-এ সাতান্ন জন মহিলা গ্র্যাজুয়েটে পৌঁছবে কি করে? ১৮১৮ থেকে ১৯১০-এর মধ্যে এম. এ. পাশ করেছিলেন আটজন মহিলা, এঁদের কেউই ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
ইন্দিরা খুব ভাল ফরাসী জানতেন। ভাগ্যক্রমে তার স্বামী প্রমথ চৌধুরীও ছিলেন ফরাসী ভাষায় সুপণ্ডিত। তাঁর লেখায় ফরাসী রুচির ছাপ আছে। তাঁদের প্রাকবিবাহ পর্বের চিঠিপত্রের প্রিয় সম্ভাষণটিও ছিল ফরাসী Mon ami. ভাল করে লক্ষ্য করলে ইন্দিরার লেখাতেও প্রাথমিক গদ্যরীতির কারুকর্ম চোখে পড়বে। গল্প-উপন্যাস না হলেও তার যে কোন লেখা সরস-সহাস্য ও সুমিত লাবণ্যে সমুজ্জ্বল। প্রমথ চৌধুরীর অসামান্য ব্যক্তিত্বের প্রভাব ইন্দিরার ওপর পড়াও অসম্ভব নয় তবে যাকে বলে প্রসাদ গুণ, ইন্দিরার নিজস্বতায় সেটি প্রচুর মাত্রায় ছিল। প্রবন্ধ-গান-সমালোচনা-স্মৃতিকথা—বিষয় যাই হোক না কেন, সর্বত্র মিশে আছে তার রম্য ব্যক্তির স্বাদ।
নিরপেক্ষভাবে ইন্দিরার কাজের বিচার করতে বসলে মনে হয় যেন থৈ পাওয়া যাচ্ছে না। অথচ স্মৃতি-বিস্মৃতির মায়াজাল ছাড়িয়ে যেখানে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আমাদের নিজের স্বার্থেই সেই বিষয়গুলিকে পুনরুদ্ধার করতে হবে। তিনি যে শুধু কযেকটা বই লিখেছিলেন কিংবা গানের স্বরলিপি তৈরি করেছিলেন তা তো নয়, বাংলা সাহিত্য ও সঙ্গীতকে তিনি যেভাবে সমৃদ্ধ করে গিয়েছেন তাতে তার তুলনা মেলা ভার। বাংলায় যে কয়েকটি হাতে গোনা স্বল্পসংখ্যক মহিলা সত্যিকারের ভাল মননশীল প্রবন্ধ লিখতে পেরেছেন ইন্দিরা তাদের অন্যতম। ভাবতে অবাক লাগে, লেখার আশ্চর্য ক্ষমতা, কলমে অভাবনীয় জাদু থাকা সত্ত্বেও তিনি তাঁর পিসীমা স্বর্ণকুমারীর মতো গল্প-উপন্যাস রচনায় হাত দেননি। কেন? কেন লেখেননি। গল্প-উপন্যাস? প্রবন্ধ, সঙ্গীতচিন্তা, স্মৃতিকথা ও অনুবাদ এই চারটি শাখাতেই ইন্দিরার সাহিত্যকীতি চিরস্মরণীয় হয়ে রয়েছে।
