এস্পারোগাস স্যাণ্ডুইচ
শসার স্যাণ্ডুইচ
মাংসের স্যাণ্ডুইচ
মাছের স্যাণ্ডুইচ
পাউণ্ড কেক
স্পঞ্জ কেক
বিস্কুট
সিংয়াড়া
ডালমোট
ঝুরি ভাজা
আইসক্রীম।
আরেকটা :
পাতলা পাউরুটির ক্রূটোঁ।
জারক নেবু
বাদামের সুপ
ভেটকী মাছের মেওনিজ
মুরগীর হাঁড়ি কাবাব
মটনের গ্রেভি কাটলেট
শবজী ও বিলেতী বেগুনের স্যালাড
স্নাইপ রোস্ট
আলুর সিপেট
উফস আলানিজ
ডেজার্ট
কফি।
সে তুলনায় নিরামিষ ক্ৰমণীর আকার বেশ বড়। আর গৃহিণীর কৃতিত্বও যেন বেশি :
ভাত
আলু পোড়া, দুধ দিয়ে বেগুন ভর্তা, মূলা সিদ্ধ, আনারস ভাজা
মোচা দিয়া আলুর চপ
মুগের ফাঁপড়া
ডুমুরের হেঁচকি মোচা হেঁচকি
কুমড়া দিয়া মুগের ডালের ঘণ্ট
পালম শাকের ঘণ্ট
উচ্ছা দিয়া মসুর ডাল
ওলার ডালনা
ঢ়্যাঁড়সের ঝোল
ছানার ফুপু পোলাও
নিরামিষ ডিমের বড়ার কারী
করলার দোল্ম আচার
আলুর দমপক্ত
কচি কাঁচা তেঁতুলের ফটকিরি ঝোল
নারিকেলের অম্বল
পাকৌড়ী
খইয়ের পরমান্ন
কমলী।
আজকাল খুব বড় ভোজসভাতেও পদের সংখ্যা এত বেশি হয় না। নিরামিষ ভোজসভাও আজকের দিনে অচল। যত রকম তরকারি, পিঠে, পায়েস খালার পাশে সাজিয়ে দেওয়া যেত ততই সুগৃহিণীত্ব প্রমাণিত হত। বাঙালী জীবনের শান্ত নিরুদ্বেগ স্বচ্ছলতার প্রতীক এই সব ভোজসভা। বাঙালী কোনদিনই ভোজনবীর ছিল না, ছিল ভোজনরসিক। তাদের শিল্পবোধ স্থায়ী জিনিষগুলোকে ছাড়িয়ে অস্থায়ী তাৎক্ষণিকতার মধ্যেও রসের সন্ধান করেছে। আর বাঙালী মেয়েরা রান্নাঘরকে করে তুলেছে শিল্পমন্দির। প্রজ্ঞা যে সব রান্নার কথা বলছেন এত না হলেও অধিকাংশের সঙ্গেই তখনকার গৃহিণীরা পরিচিত ছিলেন এবং নিজেরাও রাঁধতেন। তবে তারা কেউ সেসব পাকপ্রণালী প্রজ্ঞার মতো লিখে অন্যের রান্না শেখার পথ সুগম করে যাননি। এক একটি বড় ক্ৰমণীতে ফুটে, উঠেছে প্রজ্ঞার শিল্পবোধ ও সৌন্দর্যরুচি :
কলাইশুটি দিয়া ফেনসা খিচুড়ি
পলতার ফুলুড়ি
বেশন দিয়া ফুলকপি ভাজা
কাঁচা কলাইশুটির ফুলুড়ি
পেঁয়াজ কলি ভাজা
ভাত
ছোলার ডালের দুধে মালাইকারী
বাঁধাকপির ছেঁচকি
তেওড়া শাকের চড়চড়ি
কচি মূলার ঘণ্ট
লাল শাকের ঘণ্ট
বাঁধাকপির ঘণ্ট
গাছ ছোলার ডালনা
মটর ডালের ধোঁকা
কমলানেবুর কালিয়া
ওলকফির কারী
পেঁয়াজের দোলা আচার
ফুলকপির দমপোক্ত
বেগুন দিয়া কাঁচা কুলের অম্বল
আনারসী মালাই পোলাও
ফুলিয়া।
কিন্তু সব সময়েই কি এত বড় বড় মাপের আয়োজন হত? ছোটখাট ক্ৰমণীও আছে। এখনকার তুলনায় সেও খুব ছোট নয় :
ডিম দিয়া মুলুকস্তানী সূপ
ভাত
আলু ফ্রেঞ্চ স্টু
চঁওচঁও, বড় রুই মাছের ফ্রাই
মাংসের হুশনী কারী
পোলাও
ফ্রুট স্যালাড
ফল।
কিংবা
অলিভ রুটি
নারিকেলের সূপ
ধুম পক্ক ইলিশ
মুরগী বয়েল, হ্যাম।
মটনের কলার
ঠাণ্ডা জেলী ও ব্লাঁমজ
নারিকেল টফি, আদার মোরব্বা
কফি।
আর নিরামিষ :
ভাত
মাখন মারা ঘি, নেবু, নুন
নিমে শিমে ছেঁচকি ছোলার ডাল ভাতে
বেগুন দিয়া শুল্ফা শাক ভাজি
ছোলার ডালের কারী কুমড়ো এঁতোর ফুলুরি
পুন্কো শাকের শশ্শরি।
ভর্তাপুরী
পালম্ শাকের চড়চড়ি
থোড়ের ঘণ্ট
তিলে খিচুড়ি
ছানার ডালনা পাকা শসার কারী
পটলের দোল্মা
তিল বাঁটা দিয়ে কচি আমড়ার অম্বল
পাকা পেঁপের অম্বল
লক্ষ্ণৌ কড়ই কাঁচা আমের পায়স।
এখনকার দিনে প্রজ্ঞার বইটি দুষ্প্রাপ্য। সেজন্যই গর কয়েকটি ক্রমণীর উদাহরণ তুলে দেওয়া হল। এই ক্ৰমণী দেখে মনে হয় তখনও ভোজসভায় ফরাসী কায়দায় ইচ্ছা নির্বাচনের সুযোগ ছিল, না হলে এত ব্যঞ্জন এবং একই সঙ্গে ভাত, খিচুড়ি এবং পোলাওয়ের ব্যবস্থা থাকত না।
প্রজ্ঞার রান্নার বই দুটি আমাদের মনে যে কৌতূহল জাগায়, সেটি হল ভাইঝির এই রন্ধন নৈপুণ্যে রবীন্দ্রনাথ কতখানি খুশি হয়েছিলেন! রান্না এবং নতুন খাদ্যদ্রব্য সম্বন্ধে তার উৎসাহ তো কম ছিল না। বহু মহিলাই তাঁদের স্মৃতিকথায় এ কথা বলেছেন। কবি কি তাদের কাছে কখনো প্রজ্ঞার রান্নার গল্প করেননি? না, প্রজ্ঞা তাঁর কাকাকে কিছু বেঁধে খাওয়াননি? ভাইঝির ক্রমণী আবিষ্কারে কাকার উৎসাহ ছিল কিনা কিছুই জানা গেল না। প্রজ্ঞা বিবাহসূত্রে অসমিয়া, স্বামীগৃহে যাওয়ায় তাঁর সঙ্গে কি কবির যোগ একেবারে ছিন্ন হয়েছিল? নয়ত উভয়ে উভয়ের সম্বন্ধে আশ্চর্যভাবে নীরব থেকে গেলেন কেন কে জানে! এবার অন্য প্রসঙ্গে যাওয়া যাক।
হেমেন্দ্রনাথের মেয়েদের মাঝখানে আমরা আরেকজনকে পেয়েছি। তিনি শার কেউ নন সর্বজন-পরিচিত সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনীর একমাত্র মেয়ে ইন্দিরা। সময়ের দিক থেকে তিনি হেমেরে সেজ মেয়ে অভিজ্ঞার বোন দিদি অর্থাৎ পনেরো দিন আগে জন্মেছেন। সৌভাগ্যবশতঃ তিনিও দীর্ঘ জীবনের অধিকারিণী হওয়ায় ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের আর একটি উজ্জ্বলতম রত্নকে আমরা পেয়েছি। ছোটবেলা থেকেই তিনি রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত ছিন্নপত্রাবলীর প্রাপক। অন্য কোন ক্ষেত্রে যদি তার কিছুমাত্র দান নাও থাকত তাহলেও ক্ষতি ছিল না। কেননা, রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে যিনি এই অসাধারণ চিঠিগুলি লিখিয়ে নিতে পেরেছিলেন তার অসামান্যতা সম্পর্কে সন্দেহ জাগতেই পারে না। আর কেউই কবির সমস্ত লেখাটা আকর্ষণ করে নিতে পারেন। কিন্তু ইন্দিরার পরিচয় এখানেই শেষ নয় বরং শুরু।
