রান্নাঘর নিয়ে প্রজ্ঞা ভাবতে শুরু করেন পুণ্য পত্রিকা সম্পাদনার সঙ্গে সঙ্গে। হেমেন্দ্রনাথের পুত্রকন্যাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই প্রকাশিত হত পুণ্য পত্রিকা। লিখতেন প্রজ্ঞার ভাইবোনেরা, প্রথম সম্পাদিকা ছিলেন প্রজ্ঞা নিজে। প্রথম থেকেই এর পাতায়-পাতায় হরেক রকম আমিষ ও নিরামিষ ব্যঞ্জনের পাকপ্রণালী ছাপা হতে থাকে। সুগৃহিণীর মতো তিনি আবার তৎকালীন বাজারদরটিও পাঠিকাদের জানিয়ে দিতেন যাতে কেউ অসুবিধেয় না পড়েন। কালের সীমানা পার হয়ে আজ সে বাজারদর আমাদের মনে শুধু সুখস্মৃতি জাগায়। মাছের দাম ছিল অবিশ্বাস্য রকমের সন্তা—আধসের পাকা রুই তিন বা চার আনা, চিতল মাছ তিন পোয়া ছয় আনা, বড় বড় ডিমওয়ালা কৈ আট নটার দাম নয় দশ আনা, একটি ডিম এক পয়সা, ঘি এক সের এক টাকা, দুধ এক সে চার আনা, টমেটো কুড়িটি দুই আনা—না, অকারণে মন খারাপ করে লাভ কি? শুধু এটুকু মনে রাখলেই হবে, এই দামগুলো সঠিক বাজারদর কিনা ধনী গৃহিণী প্রজ্ঞা যাচিয়ে নেননি। দরদাম করলে জিনিষপত্রের দাম হয়ত আরো একটু কমত।
আমিষ ও নিরামিষ আহার-এর তিনটি খণ্ড বেরিয়েছিল। প্রজ্ঞা ভেবেছিলেন পাকপ্রণালীর পরে লিখবেন গৃহবিজ্ঞানের বই। কিন্তু সে আর হয়ে ওঠেনি। এর ফলে অপূরণীয় ক্ষতি রয়ে গেল গৃহবিজ্ঞানের। প্রজ্ঞার মত এত যত্নে রান্নার বই লেখার কথা হোমসায়েন্সের শিক্ষিকারাও ভাবেন বলে মনে হয় না। তিনি বইয়ের প্রথম দিকে খাদ্য, পথ্য, ওজন, মাপ, দাসদাসীর ব্যবহার, পরিচ্ছন্নতা সব ব্যাপারেই প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়েছেন। সেই সঙ্গে তৈরি করেছেন রান্নাঘরে ব্যবহৃত শব্দের পরিভাষা। হয়ত শব্দগুলো আমাদের অজানা নয় তবু এ ধরনের শব্দের সংকলন এবং পরিভাষা থাকা যে সত্যিই খুব প্রয়োজনীয় তাতে সন্দেহ নেই। কতখানি উৎসাহ এবং নিষ্ঠা থাকলে একাজ করা সম্ভব পরিভাষার দীর্ঘ তালিকা দেখলেই বোঝা যাবে। প্রজ্ঞা চলিত এবং অপ্রচলিত কোন শব্দকেই অবহেলা করেননি। অধিকাংশই আমাদের পরিচিত শব্দ। যেমন :
বাখর=পাপড়ি
চুটপুট = ফোড়ন ফাটার শব্দ
হালসে=কাঁচাটে বিস্বাদ গন্ধ
রুটিতোষ= সেঁকা পাউরুটি
পিট্নী= যাহার দ্বারা মাংসাদি পেটানো হয়
বালিখোলা=কাঠ খোলায় বালি দিয়া জিনিষ ভাজা
সিনা=বুক
চমকান= শুকনা খোলায় অল্প ভাজা
তৈ= মালপোয়া ভাজিবার মাটির মাত্র
তিজেল হাঁড়ি= ডাল বঁধিবার চওড়া মুখ হাঁড়ি
তোলো হাঁড়ি=ভাত রাঁধিবার বড় হাঁড়ি
খণ্ড কাঁটা = ডুমা ডুমা টুকরো কাঁটা
চিরকাটা=লম্বাভাবে ঠিক অর্ধেক করিয়া কাঁটা
ছুঁকা=ফোড়ন দেওয়া
রান্না ঘরে যে এত রকম শব্দ প্রচলিত আছে প্রজ্ঞার আগে তা কে জানত? এখনও এসব শব্দ নিত্যব্যবহার্য, তবু গার্হস্থ্যবিজ্ঞান লেখার সময় এ জাতীয় পরিভাষার প্রয়োজন অস্বীকার করা চলে না।
এছাড়াও আছে নানারকম প্রয়োজনীয় কথা—গৃহিণীদের জ্ঞাতব্য নানারকম তথ্য—বিনা পেঁয়াজে পেয়াজের গন্ধ করা কিংবা ধরা গন্ধ যাওয়ার মতো আরো অনেক কথা আছে। কজন আর জানে, আদার রসে হিং ভিজিয়ে রেখে সেই হিংগোলা নিরামিষ তরকারিতে দিলে পিয়াজের গন্ধ হয় কিংবা ডাল-তরকারি হাড়িতে লেগে গেলে তাতে কয়েকটা আস্ত পান ফেলে দিলে পোড়া গন্ধ কমে যায়? তরিতরকারি রোদে শুকিয়ে কি ভাবে অনেকদিন রেখে দেওয়া যায় সেকথা জানাতেও প্রজ্ঞা ভোলেননি। তবে এসব ছোটখাট জিনিষ ছাড়া প্রজ্ঞা আরও একটা নতুন জিনিষ বাংলার ভোজসভায় এনেছিলেন। সেটি হল বাংলা মেনু কার্ড বা তার নিজের ভাষায় ক্রমণী। বিলিতি ধরনের রাজকীয় ভোজে মেনু কার্ডের ব্যবস্থা আছে। প্রজ্ঞা স্থির করলেন তিনিও নিমন্ত্রিত ব্যক্তিদের জন্যে ক্ৰমণীর ব্যবস্থা করবেন। ছাপা ক্রমণী যদি হাতে হাতে বিলি করা না যায় তাহলে সুন্দর করে লিখে খাওয়ার ঘরের দেওয়ালে ঝুলিয়ে দিলেও চলবে। শুধু নামকরণ করেই প্রজ্ঞা কর্তব্য শেষ করেননি। বাংলা ক্ৰমণী কেমন হবে, এক একবারের ভোজে কি কি পদ থাকবে, কোন্ পদের পরে কোষ্টা আসবে, কিংবা কেমন করে লিখলে শিল্পসম্মত হয়ে উঠবে সে কথাও ভেবেছেন। কয়েকটা ক্রমণী দেখলেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা। প্রথমে একটা নিরামিষ ক্ৰমণী :
জাফরণী ভুনি খিচুড়ি
ধুঁধুল পোড়া শিম বরবটি ভাতে
পাকা আম ভাতে
পটলের নোনা মালপোয়া
পাকা কাঁঠালের ভূতি ভাজা
কাঁকরোল ভাজা
ভাত
অরহর ডালের খাজা
লাউয়ের ডালনা
বেগুন ও বড়ির সুরুয়া
ছোলার ডালের ধোঁকা
বেগুনের দোল্মা
আলুবখরা বা আমচুর দিয়ে মুগের ডাল
পাকা পটলের ঝুরঝুরে অম্বল
ঘোলের কাঁঢ়ি
রামমোহন দোল্মা পোলাও
নীচুর পায়স
নারিকেলের বরফি।
যেন একটা আস্ত কবিতা। হঠাৎ চোখে পড়লে সেরকম ভুল হবারই সম্ভাবনা। যদিও নিরামিষ তবু সরস হয়ে ওঠে রসনা। সেকালের ভোজসভা সম্বন্ধেও একটা ধারণা গড়ে ওঠে। প্রজ্ঞা প্রতিটি রান্না নিজে হাতে বেঁধে তবে সেগুলি খাদ্যতালিকাভুক্ত করতেন। অনেক রান্নার আবিষ্কী তিনি নিজেই। মাঝে মাঝে সেগুলোর সঙ্গে যোগ করে দিতেন প্রিয়জনের নাম। যেমন, রামমোহন দোলা পোলাও, দ্বারকানাথ ফির্নিপোলাও, সুরভি—তার অকালমৃত মেয়ের নাম।
আবার অনেক রকম উদ্ভট এবং নতুন ব্যঞ্জনও আছে। খেজুরের পোলাও, লঙ্কা পাতার চড়চড়ি, রসগোল্লার অম্বল, বিটের হিঙ্গি, পানিফলের ডালনা, ঝিঙাপাত গোড়া, মিছা-দই মাছ, ঘণ্ট-ভোগ, কচি পুই পাতা ভাজা, কঁচা তেঁতুলের সরস্বতীঅম্বল, আমলকী তে, পেঁয়াজের পরমানু, কই মাছের পাততোলা, কাকড়ার খোলা পিঠে, মাংসের বোম্বাইকারী—আরো কত কী। ক্লাসে ওঠার মতো রান্না শেখারও ক্লাস আছে, হিঙ্গি করতে শিখিলেই বুঝিতে পারিবে ইহা ঠিক যেন ডালনার এক ধাপ উপরে উঠিয়াছে অথচ কালিয়াতে উঠিতে পারে নাই। আরো দু-একটা ক্ৰমণী দেখা যাক। আমিষ ক্ৰমণীর আকার খুব বড় নয়। যেমন :
