ভাল চিন্তা হৃদয়কে অধিকার না করিলে ভাল হইবার দিকে অগ্রসর হওয়া যায় না। চিন্তার ভালমন্দ গতি আমাদের আচার ব্যবহারের গতি নিয়মিত করে। চিন্তা সংযত না হইলে আমাদের স্বভাব যথেচ্ছাচারী ও শিথিল হইয়া পড়ে। কিন্তু কাহার চালনায় এই চিন্তাকে আমরা সংযত করিতে পারি? কুপথ হইতে ফিরাইয়া লইতে পারি? সে সারথি কে? সে আর কেহ নয়-জ্ঞান।
এই সংক্ষিপ্ত উক্তিই বিদুষী প্রতিভার জ্ঞানতৃষ্ণা ও সংযত চিন্তার প্রতি আগ্রহ প্রমাণ করে। নববর্ষের প্রীতি উপহার হিসেবে তিনি মাঝেসাঝে ছোট ছোট কবিতাও লিখতেন। একবার লিখেছিলেন বর্ষপ্রবেশ :
বর্ষ এল বর্ষ গেল নিয়তি তোমার,
সুমঙ্গল পাঞ্চজন্য বাজিল আবার
প্রকৃতির ঘরে ঘরে নব অনুরাগে
ভরিয়া উঠিল বিশ্ব নবীন সোহাগে।
কবিতা প্রসঙ্গে প্রতিভার পুত্রবধূ লীলার কথাও সেরে নেওয়া যাক। লীলা পাথুরেঘাটার রণেন্দ্রমোহন ঠাকুরের মেয়ে। বিদুষী কবি। বিয়ে হয়েছিল প্রতিভার বড় ছেলে আর্যকুমারের সঙ্গে। তার কাব্যগ্রন্থ কিশলয়, ঝরার ঝর্ণা, রূপহীনা ও সিঞ্চন বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পরে রণেন্দ্রমোহন তার নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর একটি পুরস্কার দেবার ও একটি বক্তৃতামালার ব্যবস্থা করেন। প্রথম লীলা পুরস্কার পান হেমলতা দেবী (১৯৪৪)। আর এই বক্তৃতামালার প্রথম বক্ত-অনুরূপা দেবী। তার বিষয় ছিল সাহিত্যে নারী-স্রষ্টী ও সৃষ্টি (১৯৪৫)। আপাতত আমরা প্রতিভার অন্যান্য বোনেদের কথায় আসি।
প্রতিভা যখন সংগীত চিন্তায় বিভোর, লুপ্ত সঙ্গীত শিল্পীদের পরিচয় উদ্ধারে তৎপর, ঠিক সেই সময় তার মেজ বোন প্রজ্ঞসুন্দরী ব্যস্ত ছিলেন আর একটা চিরপুরনো অথচ চিরনতুন জিনিষ নিয়ে। দিদির মতো তিনিও লেখাপড়া শেখা, গান শেখ, স্কুল যাওয়া, ছবি আঁকা দিয়ে জীবন শুরু করেছিলেন কিন্তু নদী যেমন এক উৎস থেকে বেরিয়েও ভিন্নমুখী হতে পারে তেমনি প্রজ্ঞাও ধরলেন একটি নতুন পথ ঠাকুরবাড়িতে সব রকম শিল্পচর্চার সুযোগ ছিল। মেয়েরাও শিখতেন নানারকম কাজ। কিন্তু প্রজ্ঞার মন টেনেছিল রান্নাঘর। এমন আর নতুন কি? ঠাকুরবাড়িতে সব মেয়ে-বৌই অল্পবিস্তর রাধতে শিখতেন; তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে গেছেন কাদম্বরী ও মৃণালিনী। শরৎকুমারী ও সরোজাসুন্দরীরও এ ব্যাপারে সুনাম ছিল। সৌদামিনীদের প্রতিদিন একটা করে তরকারি রাধা শিখতে হত। তবে আর প্রজ্ঞার নতুনত্ব কোথায়? বলতে গেলে উত্তরাধিকারসুত্রেই তিনি রান্না শিখেছিলেন। তা শিখেছিলেন ঠিকই। প্রজ্ঞার মা নীপময়ীও ভাল রাঁধতেন। মহর্ষিরও এ ব্যাপারে কম উৎসাহ ছিল না। অথচ তাদের বাড়িতে রোজকার ব্যঞ্জন ছিল ডাল—মাছের ঝোল—অম্বল, অম্বল—মাছের ঝোল-ডাল। বড়ি ভাজা, পোর ভাজা, আলু ভাতে ছিল ভোজের অঙ্গ। আসলে এ ব্যবস্থা ছিল বারোয়ারি। তবে ব্যঞ্জনে মিষ্টি দেবার প্রচলন শুরু হয় ঠাকুরবাড়ি থেকেই। মহর্ষি নিজে মিষ্টি তরকারি খুব ভালবাসতেন। বৌয়েরা ঘরে নানারকম তরকারি ও মিষ্টি তৈরি করতেন। প্রজ্ঞার বৈশিষ্ট্য এই যে তিনি শুধু নিজের হাতে রাধা খাবার প্রিয়জনদের মুখে তুলে দিয়ে নিরস্ত হননি। ঠাকুরবাড়ির চিরকেলে রেওয়াজ ছেড়ে নিজেদের আবিষ্কার করা পিঠে-পুলিপোলাও-ব্যঞ্জন তুলে দিতে চেয়েছেন সকলের মুখে। এখানেই তার অনন্যতা।
বাস্তবিকই রান্না এবং রান্নাঘর নিয়ে, কেতাবী ভাষায় রন্ধনতত্ত্ব ও রন্ধনবিদ্যা নিয়ে তিনি যত মাথা ঘামিয়েছেন তত চিন্তা আর কোন মহিলা করেছেন বলে মনে হয় না। ঘরের কোণে বসে রান্নার পরীক্ষা চালাবার সময় তিনি সেগুলো লিখে রেখেছিলেন ভাবীকালের আগন্তুকদের জন্যে। তাই তাঁর আমিষ ও নিরামিষ আহার-এর বইগুলি এত নতুন হয়ে দেখা দিয়েছিল। আধুনিক যুগে গার্হস্থ্য বিজ্ঞানের বহু বই লেখা হয়েছে ও হচ্ছে, কিন্তু পঁচাত্তর বছর আগে প্রজ্ঞার বইগুলি হাতে নিয়ে অবাক হয়ে যেতে হয়। অবশ্য এ ব্যাপারে আরো দু একজনের নাম করা যায়। কিরণলেখা রায়ের বরেন্দ্র বন্ধন ও জলখাবার, নীহারমালা দেবীর আদর্শ রন্ধন শিক্ষা ও বনলতা দেবীর লক্ষ্মীও রান্নার বই হিসেবে জনপ্রিয় হয়েছিল, তবে সে পরের কথা! পুরুষেরাও এ ব্যাপারে দক্ষতা দেখিয়েছিলেন, সংস্কৃত পাকরাজেশ্বর অনুবাদ করিয়েছিলেন বর্ধমানরাজ। বিপ্রদাস মুখোপাধ্যায়ের রান্নার বইও অনেক আগেই প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু প্রজ্ঞা ভেবেছিলেন বেশি। তার রান্নার বই দুটির ভূমিকাদুটিকে আমরা একাধারে রন্ধনতত্ত্ব ও গার্হস্থ্য বিদ্যার আকর বলে ধরে নিতে পারি। বিয়ের পরে বেশ গিন্নীবান্নি হয়েই প্রজ্ঞা এ কাজে হাত দিয়েছিলেন।
প্রতিভার মতো প্রজ্ঞারও বিয়ে হয়েছিল এক বিখ্যাত ব্যক্তির সঙ্গে। অসমিয়া সাহিত্যের জনক লক্ষ্মীনাথ বেজবড়ুয়া তার স্বামী। বিয়ের আগে লক্ষ্মীনাথের সঙ্গে তার কোন রকম সাক্ষাৎ হয়নি। লক্ষ্মীনাথ তার আত্মজীবনীতে জানিয়েছেন যে ঠাকুরবাড়ির এই গুণবতী, শিক্ষিত, সুশীলা ও ধর্মপ্রবণা মেয়েটির ছবি দেখেই তিনি তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন এবং বিবাহে সম্মত হন। যদিও তার নিজের বাড়ি থেকে এসেছিল প্রচণ্ড বাধা। কারণ তখনকার দিনে ঠাকুরবাড়িতে বিয়ে হওয়া মানেই ছেলেকে হারানো। তাই একমাসের মধ্যে বহু টেলিগ্রাম কলকাতা ও গৌহাটিতে আসা যাওয়া করলেও বিধির লিখন বদলাল না। ১৮৯১ সালের ১১ মার্চ, স্বপ্নরঙিন বাসন্তী-সন্ধ্যায় সপ্তপদী গমনের পর শুভদৃষ্টি। বেজবড়ুয়া। দেখলেন প্রজ্ঞা তার দিকে তাকিয়েই ফিক করে হেসে ফেললেন। হাসি ফুটল লক্ষ্মীনাথেরও ঠোটের কোণে। পরে অবশ্য তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন প্রজ্ঞাকে, শুভদৃষ্টির সময় ঐরকমভাবে হেসেছিলে কেন? প্রজ্ঞার উত্তর, বিয়ের অনেকদিন আগেই তোমাকে আমি স্বপ্নে দেখেছিলাম। স্বপ্নে দেখা মুখটার সঙ্গে লক্ষ্মীনাথের মুখের হুবহু মিল দেখে হেসেছিলেন প্রজ্ঞা। লক্ষ্মীনাথের আঁকা এই সব ছোট কথার-ছবি দেখে, ধরে নিতে অসুবিধে হয় না দাম্পত্যজীবনে প্রজ্ঞা কতখানি সুখী ছিলেন। নিজের জীবনে পর্যাপ্ত সুখের সন্ধান পেয়ে তিনি বুঝেছিলেন গৃহকে সুখের আগার করে তুলতে হলে গৃহিণীকে কোন দিকে নজর দিতে হবে। তাকে মায়ার খেলাতে অভিনয় করতে দেখা গেছে, ছবি আঁকতে দেখা গেছে কিন্তু সব ছেড়ে তিনি আঁকড়ে ধরেছিলেন আপাত অবহেলিত রান্নাঘরখানিকে।
