প্রতিভা না হয় প্রকাশ্যে গান গেয়ে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করলেন, তাকে নিত্য নতুন রস সিঞ্চন করে বাঁচিয়ে রাখতে হবে তো। সে। ওর ও নিলেন প্রতিভাই। স্বরলিপি নির্মাণের সঙ্গে সঙ্গে চলল গান শেখাবার চেষ্টা। তারও হাতে খড়ি বালকে। সেখানে তিনি কাগজে কলমে খুললেন একটি গানের ক্লাস সহজ-গানশিক্ষা। বালক ছোটদের কাগজ, ছোটদের দিয়ে শুরু করা ভাল তাই তিনি প্রথমে তাদের বলে নিলেন গান কাকে বলে। সেই বয়সেই প্রতিভা গানের সংজ্ঞা নির্দেশ করতে গিয়ে বলেছেন, গান মানুষের স্বাভাবিক। হাসি-কান্নার সময় মানুষের কণ্ঠস্বরের পরিবর্তন হয়। তাই বোঝা যায় নানা ভাবের নানা সুর আছে, সেই সুরের চর্চা করেই গানের উৎপত্তি হয়েছে। সঙ্গীতের সম্বন্ধে প্রতিভার এই সংজ্ঞা নির্ণয় তার একান্ত নিজস্ব। পরিণত বয়সে তিনি আরও মৌলিক সঙ্গীত চিন্তার পরিচয় দিয়েছিলেন।
গান এমন একটা জিনিষ যার জন্য শুধু জ্ঞান নয় রীতিমত চর্চার প্রয়োজন আছে। প্রতিভা সেই চেষ্টায় নিজের বাড়িতে প্রথমে আনন্দসভা পরে সঙ্গীতসংঘ স্থাপন করেন। গান শেখার স্কুল হিসাবে সঙ্গীত-সংঘ খ্যাতিলাভ করে। এখানে প্রতিভা শেখাতেন খাটি ওস্তাদী হিন্দুস্থানী গান। যদিও বিদেশী সঙ্গীতেও তার ছিল অবাধ অধিকার। শিখেছিলেন Nicolini-এর কাছে। বাঙালী মেয়েরা এখানে ভাল করে গান শেখার সুযোগ পেল। অবশ্য সঙ্গীত-সংঘের সঙ্গে সঙ্গীত-সম্মিলনী নামটাও অনেকেরই চেনা মনে হবে। সেটিও গানের স্কুল স্থাপন করেছিলেন মিসেস বি. এল. চৌধুরী, অর্থাৎ বনোয়ারীলাল চৌধুরীর স্ত্রী প্রমদা চৌধুরী। এই দুটি স্কুলের সুযোগ হওয়ায় বাঙালী মেয়েরা অনেকেই গান শিখতে শুরু করেন। প্রতিভার স্কুলটির দেখাশোনার কাজে ইন্দিরাও এসে যোগ দিয়েছিলেন, ঘটনাস্থত্রে তখন তিনিও এসেছেন চৌধুরীবাড়ির বৌ হয়ে।
গান শেখানোর সঙ্গে সঙ্গে প্রতিভা একটা সঙ্গীত বিষয়ক পত্রিকার কথাও ভাবছিলেন। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গীত প্রকাশিকা অনেকদিন আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু গানের চর্চার জন্য ঐরকম একটা পত্রিকা থাকা খুবই প্রয়োজন। তাই আনসভার নামে প্রতিভা নতুন পত্রিকার নাম দেন আনন্দ সঙ্গীত পত্রিকা। তবে কোন কিছু একা করায় প্রতিভার বড় সংকোচ তাই এবারও দলে টানলেন ইন্দিরাকে। যুগ্ম সম্পাদনায় আনন্দ সঙ্গীত আট বছর সগৌরবে প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকায় প্রতিভা শুধু নিয়মিত ভাবে স্বরলিপি প্রকাশ করতেন তা নয়, সেইসঙ্গে চলত লুপ্ত সঙ্গীত পুনরুদ্ধারের চেষ্টা। শুধু কি সঙ্গীত ও যন্ত্রসঙ্গীতের পুনরুদ্ধারের চেষ্টা? প্রতিভা প্রাচীন সঙ্গীত শিল্পীদেরও বিস্মৃতির অন্তরাল থেকে উদ্ধার করতে লাগলেন—তানসেন, স সদারঙ্গ, বৈজু বাওয়া নায়ক, মহারাজা শৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর ও আরো অনেক সঙ্গীতস্রষ্টার জীবনী রচনা তার সঙ্গীত সম্পর্কিত চিন্তার বৈশিষ্ট্যকে তুলে ধরেছে। আজ যখন কোন প্রাণহীন যান্ত্রিক কণ্ঠে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি তখন বুঝতে পারি প্রতিভা কেন সঙ্গীতচর্চার সঙ্গে সঙ্গে সঙ্গীতজ্ঞদের কথা ভাবতেন, তাদের সঙ্গীত সাধনাকে আদর্শের মতো তুলে ধরতে চাইতেন। শিল্প ও শিল্পী উভয়কে না জানলে যে সাধনা অপূর্ণ থেকে যায়। তাঁর চেষ্টায় বহু সঙ্গীতজ্ঞের জীবন ও সাধনার লুপ্ত ইতিহাস সংগৃহীত হয়েছে। গানের ক্ষেত্রে প্রতিভা তার কাকা-জ্যাঠাদের মতো খ্যাতি পাননি বটে কিন্তু সঙ্গীত জগতে তিনি তার গুরুজনদের মতোই সমান কৃতিত্বের অধিকারিণী। প্রতিভার মৃত্যুর পরে সঙ্গীত-সংঘের পুরস্কার বিতরণ সভায় তার কাকা রবীন্দ্রনাথ যে কথা বলেছিলেন তার মধ্যেই প্রতিভার প্রকৃত পরিচয় লুকিয়ে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ বলেন, সঙ্গীত শুধু যে তার কণ্ঠে আশ্রয় নিয়েছিল তা নয়, এ তার প্রাণকে পরিপূর্ণ করেছিল। এরই মাধুর্য প্রবাহ তার জীবনের সমস্ত কর্মকে প্লাবিত করেছে।
রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রতিভার প্রধান কৃতিত্ব স্বরসন্ধিসহ কয়েকটি রবীন্দ্রসঙ্গীতের স্বরলিপি রচনা করা। এর সার্থক উদাহরণ কোন আলোকে প্রাণের প্রদীপ গানের স্বরলিপি। সংস্কৃত স্তোত্রে সুর দিয়ে গাওয়ার পরিকল্পনা রবীন্দ্রনাথের একান্ত নিজস্ব। তার দেওয়া সুরে বেদগানের স্বরলিপিও তৈরি করেন প্রতিভা। মাঘোৎসবের সূচনা হত একটি বেদগানের ভাবগম্ভীর পরিবেশ দিয়ে। কখনও যদেমি প্রস্ফুন্নিব কখনও তমীশ্বরাণাং আবার কখনও গীতা স্তোত্র দিয়ে। প্রতিবাই প্রতিভা স্বরলিপি তৈরি করে অন্যদের গান শেখাতেন। তিনি নিজেও যে দু-একটা গানে সুর দেননি তা নয়, ত্বমাদিদেব পুরুষপুরাণ স্ত্রোত্রে তিনি কেদারা রাগিণীর সুর বসান। সংখ্যায় কম হলেও প্রতিভার নিজের লেখা গানও দুর্লভ নয়, বিশেষ করে সাঁঝের প্রদীপ দিনু জ্বালায়ে এবং দীনদয়াল প্রভু ভুলো না অনাথে জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
প্রতিভার জীবনে গানের সঙ্গে মিশে ছিল আরো দুটি জিনিস—ধর্ম ও জ্ঞানস্পৃহা। মহর্ষির অধ্যাত্মসাধনা এবং হেমেন্দ্রর উগ্র ধর্মানুরাগ সঞ্চারিত হয়েছিল প্রতিভার জীবনে। তাঁর ভক্তিগীতি বা নববর্ষের বক্তৃতাগুলোর ওপর নজর বোলালেই বোঝা যাবে ব্রাহ্মধর্ম প্রতিভার মনে কী গভীর ভাবে প্রভাব বিস্তার করেছিল। ঠিক সাহিত্যচর্চা না করলেও বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর প্রতিভার বেশ দখল ছিল। তিনি ইংরেজী, ফরাসী, ল্যাটিন, সংস্কৃত প্রভৃতি নানা ভাষা যেমন শিখেছিলেন, তেমনি ইতিহাস-ভূগোল ও অন্যান্য বিদ্যাচর্চাতেও আগ্রহী ছিলেন। ঠাকুরবাড়ির অন্যান্য মেয়েদের দু-চারটে লেখা যেমন ইতস্তত চোখে পড়ে প্রতিভার লেখা সেরকম দেখা যায় না। তার একটি বক্তৃতা সংগ্রহ আলোক ছাপা হয়েছিল অনেকদিন আগে। সেখান থেকে তার একটি প্রবন্ধের কিছু অংশ আমরা উদ্ধৃত করছি। সে অংশটির মধ্যেই প্রতিভার রচনারীতির বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে। প্রতিভা লিখছেন :
