প্রতিভা পরবর্তী জীবনেও গানের জন্যে অনেক সাধনা করেছেন। সৌভাগ্যক্রমে এঁকে কোন বাধা পেতে হয়নি। সরোজার স্বামীর মতো প্রতিভার স্বামীও ছিলেন বিখ্যাত ব্যক্তি, রবীন্দ্র-সুহৃদ আশুতোষ চৌধুরী। দ্বিতীয়বার বিলেত যাবার সময় রবীন্দ্রনাথ আশুতোষের সঙ্গে পরিচিত হন। পাবনার বিখ্যাত চৌধুরী পরিবারের সন্তান আশুতোষ এসেছিলেন ভিন্ন পরিবেশ থেকে। বন্ধনমুক্ত উদার সমাজ-পরিবেশ বা সংস্কৃতির আলো কোনটাই তিনি প্রথম থেকে পাননি কিন্তু যা করেছিলেন তারও নজির মেলে না। তারা সাত ভাই-ই বিবিধ গুণের অধিকারী ছিলেন। বিশেষ করে আশুতোষ ও প্রমথ-র তো কথাই নেই। বাংলা সাহিত্যের আসরে আশুতোষকে পাওয়া যায় সমালোচকরূপে। রবীন্দ্রনাথের কড়ি ও কোমলকে যথোচিত পর্যায়ে সাজিয়ে তিনিই প্রকাশ করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তার সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বছরে বি. এ. ও এম. এ পাশ করা (১৮৮০)। আশুতোষ বিলেত যাচ্ছিলেন বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে। তাঁর দিদি প্রসন্নময়ীর লেখা পূর্বকথা পড়ে জানা যায় আশুতোষের পথ মোটেই সুগম ছিল না। চৌধুরীবংশের মধ্যে আশুতোষই প্রথম বিলেত গেলেন। তার আগে তাদের জেলার আর কেউ বিলেত যাননি। ফলে জাত গেল, জাত গেল রব উঠল চারদিকে। চৌধুরীরা কেউ প্রায়শ্চিত্ত করে সমাজে ওঠবার চেষ্টা না করাতে সমাজপতিরা আক্রমণ করলেন আশুতোষের বাবা পিসীদের। তাদের প্রায়শ্চিত্তের ব্যবস্থা হল। প্রত্যেকে পাঁচ কাহন কড়ি দিয়ে মাথা মুড়িয়ে তবে অব্যাহতি পেলেন। প্রসন্নময়ী লিখেছেন, তাঁহারা তো বালবিধবা, আশৈশব ব্রহ্মচর্য প্রতিপালন করিয়া চলিতেন, অকারণ কেন তাহাদিগের জাতি লইয়া টানাটানি পড়িয়া গেল, সেটা বুঝিবার ক্ষমতা কাহারও ছিল না ও নাই। আসলে এই ছিল বাংলা দেশের খাঁটি ছবি। সে সময় হিন্দুর ছেলে বিলেত গেলেই বাড়িশুদ্ধ সকলকে এমনি সামাজিক অত্যাচার সহ্য করতে হত। অথচ সময়ের দিক থেকে ১৮৮১ সাল খুব পুরনো নয়। এর আগে জ্ঞানদানন্দিনী দুটি অবোধ শিশু নিয়ে বিলেত ঘুরে এসেছেন। চন্দ্রমুখী পাশ করে গেছেন এনট্রান্স। কাদম্বিনীর সঙ্গে গ্র্যাজুয়েট হবার তোড়জোড় করছেন। প্রসন্নময়ীর পিসীরাও অক্ষর পরিচয়হীনা নন। প্রতিভা নেমেছেন অভিনয় করতে।
রবীন্দ্রনাথের সেবার বিলেত যাওয়া হল না। কিন্তু আশুতোষের সঙ্গে বন্ধুত্ব ক্ষুন্ন হয়নি। পরে বিলেত থেকে ফিরে আশুতোষ ঠাকুরবাড়ির অন্যান্যদের সান্নিধ্যে আসেন। তাঁর সরল স্বভাব ও সাহিত্যানুরাগ ঠাকুরবাড়ির সকলেরই খুব ভাল লাগল। আলাপ হল প্রতিভার সঙ্গে! রূপে লক্ষ্মী গুণে সরস্বতী প্রতিভার সঙ্গে এমন সোনার টুকরো ছেলেকে সুন্দর মানাবে, সুতরাং বিয়ের সানাই বাজতেও দেরি হল না। এই বিয়েতে অত্যন্ত সুখী হয়েছিলেন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ। বলেছিলেন, আশু আমার একটা অর্জন। অনেক সাধনায় প্রতিভা এমন পাত্রে পরিণীতা হয়েছে। এ সময় একটা ঘটনা ঘটেছিল। আমরা জেনেছি ইন্দিরার লেখা শ্রুতি ও স্মৃতির পাণ্ডুলিপি পড়ে। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে কোন সভায় বুঝি যাচ্ছিলেন ইন্দিরা, একই গাড়িতে উঠেছিলেন আশুতোষ। এ ঘটনায় কারুর কোন হাত ছিল না। কিন্তু ভয়ে কাঠ হয়ে নীপময়ী ভাবলেন, জ্ঞানদানন্দিনী বুঝি তার মেয়ের সঙ্গেই আশুতোষের বিয়ে দিতে চান। প্রগতিসম্পন্ন জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে মনের মিল অনেকেরই হয়নি। তাই সন্দেহ। জ্ঞানদানন্দিনী তো হেসে আকুল। তার মেয়ের বয়স কম, এর মধ্যে বিয়ে দেবেন কি? তবু সন্দেহ ঘোচে না। এরই মধ্যে মৃত্যু হয় হেমেন্দ্রনাথের। কিছুদিন পরে প্রতিভার সঙ্গে আশুতোষের বিয়ে হয়ে গেল। অনেকের মনেই প্রশ্ন। জেগেছিল আশুতোষের বাকি ছয় ভাইয়ের সঙ্গে প্রতিভার ছয় বোনের বিয়ে। হবে কিনা? এঁদের মধ্যে তিন ভাইয়ের সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির আরো তিনজন মেয়ের বিয়ে হয়েছিল কিন্তু তারা কেউই প্রতিভার নিজের বোন ছিলেন না। এই বিয়ে উপলক্ষে দুটি পরিবারের যুবক-যুবতীদের অনেকেই গভীর মেলামেশা করেছিলেন। অনেকে মনে করেন এর কারণ ঠাকুরবাড়ির শিল্প-সংস্কৃতির আহ্বান, আবার কেউ কেউ বলেন এর পেছনে ছিল ঠাকুরবাড়ির রূপবতী-গুণবতী শিক্ষিতা মেয়েদের সঙ্গে পরিচিত হবার বাসনা। কারণ যাই হোক না কেন, বাংলা দেশের সমস্ত শিক্ষিত সমাজই ঠাকুরবাড়ি সম্বন্ধে, বিশেষত এ বাড়ির বিদুষী সঙ্গীতজ্ঞ মেয়েদের সম্বন্ধে, সচেতন হয়ে উঠছিলেন তাতে সন্দেহ নেই। ইন্দিরা জানিয়েছেন, ঠাকুর এবং চৌধুরী-পরিবারে ঘনিষ্ঠ মেলামেশা সব সময়েই যে সুখ পরিণতি লাভ করেছিল তা নয়। এই সব ছোটখাট ঘটনার ফাঁক দিয়ে আমরা মাঝে মাঝে সমাজেরও ছবিটা যেন দেখতে পাই।
সঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রতিভার সত্যিকারের অবান হল স্বরলিপি রচনার সহজতম পন্থাবিষ্কার। তিনি দ্বিজেন্দ্রনাথ এবং জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্বরলিপি পদ্ধতি এবং স্বরসন্ধি প্রয়োগ পদ্ধতিতে যেমন নতুনত্ব এনেছিলেন তেমনি তাকে করে তুলেছিলেন সকলের ব্যবহারের উপযোগী। প্রতিভার আগে কোন মহিলা স্বরলিপি নির্মাণের ব্যাপারে এগিয়ে আসেননি।
জ্ঞানদানন্দিনীর বালক পত্রিকায় প্রতিভার স্বরলিপি পদ্ধতি প্রকাশ হতে থাকে। বাল্মীকি প্রতিভা ও কালমৃগয়ার গানগুলিরও প্রথম স্বরলিপিকার হচ্ছেন প্রতি। শোনা যায়, এ সময় হেমেন্দ্রনাথের নির্দেশে তিনি বহু ব্ৰহ্মসঙ্গীত ও হিন্দুস্থানী সঙ্গীতের স্বরলিপি তৈরি করেন। সংখ্যা আমরা গুণে দেখিনি তবে প্রতিভার এক ভাই হিতেন্দ্রনাথ ১৩১১-র আষাঢ় সংখ্যা পুণ্যে জানাচ্ছেন যে এই সংখ্যা প্রায় তিনশ-চারশ। কিন্তু শুধু স্বরলিপি নির্মাণ করলেই তো হবে না, গাইবে কে?
