বাল্মীকি প্রতিভায় কিন্তু আরও একটি নারীচরিত্র ছিল—লক্ষ্মী। এই প্রথমবারে অভিনয়ে লক্ষ্মী হয়েছিলেন শরৎকুমারীর বড় মেয়ে সুশীলা। ইন্দিরা সেরকম ইঙ্গিতই করেছেন। অথচ আদর্শনের সমালোচক লক্ষ্মীর কথা উল্লেখ করেননি দেখে অবাক হতে হয়। তখনকার দিনের পক্ষে লক্ষ্মীর ভূমিকা দেখেও তো মুগ্ধ হবার কথা। বাইরের রঙ্গমঞ্চে অবশ্য তখন বড় বড় অভিনেত্রীর আবির্ভাব হয়েছে, নটী বিনোদিনীর অভিনয়ে কলকাতা সরগরম। তবু কোন সম্রান্ত পরিবারের মেয়ে তখনও অভিনয়ের কথা ভাবতেই পারতেন না। মনে হয়, সুশীলার অভিনয় খুব ভাল হয়নি। তবু তাঁর প্রথম প্রয়াস অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। সুশীলার কথা এর পরেও আর শোনা যায়নি। তারা ছিলেন চার বোন। অপর তিনজন সুপ্রভা, স্বয়ংপ্রভা ও চির প্রভা। শেষোক্ত দুজনের কথা বিশেষ কিছু জানা যায়নি তবে সুপ্রভা সম্বন্ধে একথা চলে না। ঠাকুরবাড়িতে বাস করেও এঁরা কেউ চারুপাঠের বেশি লেখাপড়া যেমন শেখেননি, তেমনি শিল্পকলার চর্চা করেছেন বলেও শোনা যায়নি, প্রত্যেকেই ছিলেন গৃহকর্মনিপুণ এবং সাংসারিক কাজ নিয়েই থাকতে ভালবাসতেন। সুপ্রভা তারই মধ্যে অসাধারণ প্রাণপ্রাচুর্যে পূর্ণা এবং সুরসিক ছিলেন। বিখ্যাত শিল্পী অসিত হালদার তাঁর সন্তান।
ঠাকুরবাড়িতে সুশীলার মতো সুপ্রভাও দু-একবার অভিনয় করেছিলেন। বোধহয় হিরন্ময়ীর বিয়ের সময়। স্বর্ণকুমারীর লেখা বিবাহ-উৎসবের অভিনয়ে সুপ্রভা সাজলেন নায়কের বন্ধু। ঠাকুরবাড়িতে প্রত্যেক বিয়েতে একটা করে থিয়েটার হত। অন্যান্য বড় লোকের বাড়িতে হত বাঈ-নাচ বা পেশাদার যাত্রা ও থিয়েটার। মহর্ষিভবনে বাঈ-নাচ কোনদিনই হত না। তার বদলে ছেলেরা ও মেয়েরা একটা করে নাটক অভিনয় করতেন। এই অভিনয়ের প্রয়োজন হয়েছিল আরেকটা কারণে। সে সময় ঠাকুরবাড়িতে সব অত্মীয়স্বজন অবাধে আসতে পারতেন না। এমনকি পাঁচ বা ছয় নম্বরের অধিবাসীরাও নয়। ইচ্ছে থাকলেও সামাজিক বাধা ছিল; মহর্ষিপরিবার ব্রাহ্ম, তারা হিন্দু বিয়েতে যেখানে শালগ্রাম শিলা আছে সেখানে যাবেন না। অপরদিকে গুণেন্দ্ৰপরিবারও ওবাড়ির কাউকে নিমন্ত্রণ করতেন না পাছে অন্য আত্মীয়ের ব্রাহ্মদের সঙ্গে পংক্তিভোজনে না বসেন। অথচ কে না চায় আনন্দ অনুষ্ঠানে সবাই আসুক। তাই বিয়ের পরদিন কিংবা আট দিনের দিন একটা নাটক অভিনয় হত এবং তাতে সবাই নিমন্ত্রিত হতেন। এ সময় মিষ্টান্ন বিতরণ হত হাতে-হাতে, পংক্তিভোজন না হওয়ায় জাত-পাতের বালাই নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতেন না। এই রকমই একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সুপ্রভা সাজলেন নায়কের সখ। বিবাহ-উৎসব আরো একবার অভিনীত হয় সুপ্রভার বিয়ের সময়। বিয়ের কনে হয়ে যাওয়ায় সুপ্রভার ভূমিকাটি পান স্বর্ণকুমারীর ছোট মেয়ে সরলা।
বিবাহ-উৎসবের কথায় আরো কয়েকজনের কথা মনে পড়ে। একজন এ। নাটকের নায়ক, তাঁর নামও সুশীলা তবে তিনি ঠাকুরবাড়ির মেয়ে নন, বৌ। দ্বিজেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিপেন্দ্রের প্রথম স্ত্রী। অপরজন এ নাটকের নায়িকা সোজাসুন্দরী। সরোজাসুন্দরী এবং উষাবতী দ্বিজেন্দ্রনাথের দুই মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল রাজা রামমোহন রায়ের পুত্রের দৌহিত্র বংশে—মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায় এবং রমণীমোহন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। মোহিনীমোহন ভারতীয় থিয়সফিস্ট আন্দোলনের উদ্যোক্তা, পরে তিনি দীর্ঘ সাত বছর আমেরিকায় বাস করেন। তাঁর দার্শনিক চিন্তা, কবিত্ব শক্তি আর ইংরেজী ভাষার ওপর চমৎকার দখল সেকালে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। অন্যান্য গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন শ্ৰীমদ্ভগবদ্গীতা। এঁর আরেক ভাই রজনীমোহনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল অবন-গগনের ছোট বোন সুনয়নীর এবং বোন হেমলতার সঙ্গে দ্বিপেন্দ্রনাথের বিয়ে হয় তার প্রথম স্ত্রী সুশীলার মৃত্যুর পরে।
সরোজা ছিলেন অসামান্যা রূপসী এবং সুগায়িকা। তাই বিবাহ-উৎসবে তিনি নিয়েছিলেন নায়িকার ভূমিকা। পরে অবশ্য সুগৃহিণী হিসাবে তিনি যতটা কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন বহির্জগতে ততটা ছড়িয়ে পড়তে পারেননি। দ্বিজেন্দ্রপরিবারের মেয়েদের ক্ষমতা ছিল ঠিকই কিন্তু সেভাবে স্ফুরণ হয়নি। উদাসীন দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথও এ সব বিষয়ে মনোযোগী ছিলেন না। তবে সমাজসেবিকারূপে সরোজার দুই মেয়ে গীতা চট্টোপাধ্যায় ও দীপ্তি চট্টোপাধ্যায় সারাজীবন নিরলসভাবে বহু কাজ করে গিয়েছেন। উদাবতী গান গাইতেন কোরাসে। একবার কালমৃগয়ায় তিনি ও ইন্দিরা সেজেছিলেন বনদেবী। ঠাকুরবাড়িতে এদের অভিনয় বা অন্যান্য ভূমিকা হয়ত খুব স্মরণীয় নয়। কিন্তু সম্মিলিতভাবে এঁরা ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলকে যেভাবে আলোকিত করে তুলে। ছিলেন সে কথা ভোলা যায় না। তাছাড়া কোনদিন যদি রবীন্দ্র-নাটকের প্রতিটি অভিনয়ের পাত্র-পাত্রীদের খোঁজ করা হয় তাহলেও দেখা যাবে তার প্রথম দিকের নাটক এবং গানকে বাড়ির ছেলেমেয়েরাই সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন।
০৬. আবার বাল্মীকি প্রতিভার কথা
আবার বাল্মীকি প্রতিভার কথাতেই ফিরে আসা যাক। একবার বেশ বড় মাপের বাল্মীকি প্রতিভা অভিনয়ের আয়োজন করা হল। ১৮৯৩ সালে লেডি ল্যান্সডাউনের সম্বধনা উপলক্ষে। এর আগে এক যুগ ধরে (১৮৮১-১৮৯২) বাল্মীকি প্রতিভার বহু মঞ্চাভিনয় হয়ে গেছে। প্রতিবারই সরস্বতী সেজেছেন প্রতিভা এবং বাল্মীকি রবীন্দ্রনাথ। এবার আমন্ত্রণ জানানো হল বহু গণ্যমান্য ইংরেজ দর্শকদের। স্টেজ সাজাবার ভার দেওয়া হল দ্বিজেন্দ্রনাথের অন্যতম পুত্র নীতীন্দ্রনাথকে। তিনি প্রাণপণে স্টেজে ন্যাচারাল এফেক্ট আনবার চেষ্টা করলেন। বারান্দা থেকে টিনের নল লাগিয়ে বৃষ্টির জল পড়ার ব্যবস্থাও হল। সাহেবরা খুব খুশি। এবার হাত-বাঁধা বালিকা সাজলেন প্রতিভার সেজ বোন অভিজ্ঞা আর লক্ষ্মী সাজলেন সত্যেন্দ্র-দুহিতা ইন্দিরা। সরস্বতীর ভূমিকা তো প্রতিভার বাঁধা। সাদা সোলার পদ্ম ফুলে শুভ্র সাজে প্রতিভা যখন অস্টিচ পাখির ডিমের খোলা দিয়ে তৈরি বীণাটি হাতে নিয়ে বসেছিলেন তখন প্রথমে সবাই ভাবলে বুঝি মাটির প্রতিমা। তাই শেষে প্রতিভা যখন উঠে এসে বীণাটি কবির হাতে তুলে দিলেন তখন অডিয়েন্স মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গেল। এই অভিনয়টির সাফল্য প্রমাণ করল ঠাকুরবাড়ির শিল্পরুচির শুচিতা এবং মাধুর্য। নাটক এবং অভিনয় বললেই যে আদিরসাত্মক একটি প্রণয় কাহিনী বা ভক্তিরসাশ্রিত পৌরাণিক কাহিনী বেছে নেবার দরকার নেই সেকথাও সকলেই বুঝল।
