সঙ্গীতের জগতে বাঙালী মেয়েদের জন্যে আরেকটি মুক্তির পথ খুলে দিয়েছিলেন প্রতিভা। প্রাচীন প্রথা না মেনে হেমেন্দ্র তার স্ত্রীকে গান শিখিয়েছিলেন। প্রতিভা চর্চা করেছিলেন দেশি-বিলিতি উভয় সঙ্গীতেরই। শুধু তাই নয়, চিরকালের ট্র্যাডিশন ভেঙ্গে প্রতিভা তার ভাইয়েদের সঙ্গে ব্রহ্মসঙ্গীত গাইলেন মাঘোৎসবের প্রকাশ্য জনসভায়। আর একটি নতুন নক্ষত্রের আত্মপ্রকাশে খুশি হলেন সুধীসমাজ। মেয়েকে গান শেখানোর ব্যাপারে কার্পণ্য করেননি হেমেন্দ্র। বাড়ির ওস্তাদ বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে তালিম নেওয়া ছাড়াও বিদেশী গান ও পিয়ানো শিখতেন প্রতিভা। আরো নানারকম বাদ্যযন্ত্র ও শিখেছিলেন। ১৮৮২ সালে লেখা হেমেন্দ্রর একটি চিঠিতে দেখা যাচ্ছে তিনি প্রতিভাকে বিলিতি গান সম্বন্ধে উপদেশ দিচ্ছেন :
…কেবল নাচের বাজনা ও সামান্য গান না শিখিয়া যদি Beethoven প্রভৃতি বড় বড় German পণ্ডিতদের রচিত গান বাজনা শিক্ষা করিতে পার, এবং সেই সঙ্গে music theory শেখ তবেই আসল কম হয়।
প্রত্বিভা তাঁর বাবার ইচ্ছা সর্বাংশে পূরণ করে মেয়েদের মধ্যে গানের ব্যাপারে অভিজ্ঞ হয়ে উঠলেন। বিদ্যোৎসাহিনী সভায় তার গান আর সেতার শুনে খুশি হয়ে রাজা শৌরীন্দ্রমোহন তাঁকে দিলেন স্বরলিপির বই, রঘুনন্দন ঠাকুর দিলেন বিশাল তানপুরা। গান ছাড়াও আর একটা ব্যাপারে ট্র্যাডিশন ভাঙলেন প্রতিভা। চন্দ্রমুখী-কাদম্বিনী যেমন বাঙালী মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, প্রতিভা তেমনি সুযোগ করে দিলেন গান করার ও অভিনয় করার। এই দুঃসাহসিক নজির তার কাকীমাদের ঘোড়ায় চড়া বা বিলেত যাওয়ার চেয়ে খুব কম সাহসের কথা নয়। তার কাকীমা, পিসীমার অভিনয় করেছিল ঘরোয়া আসরে। দর্শক হিসেবে যারা ছিলেন তারা সবাই আপনজন, চেনাশোেনা মানুষ সুতরাং লজ্জা ছিল না, সমালোচনার আশংকাও না। সাধারণ মানুষ, যাদের আমরা বলি পাবলিক, সর্বপ্রথম তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রতিভা। ঠাকুরবাড়ির যে কোন উৎসবে তাই মানুষ ভেঙে পড়ত। তারা শুনত বাঙালী মেয়েদের গান, অবাক হয়ে দেখত ভদ্রঘরের মেয়েরা আসরে বসে গান গাইছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত। তারপর বিদ্বজ্জন-সমাগমের সভায় মেয়েরা অভিনয় করতেও এগিয়ে এলেন। সবার আগে প্রতিভা, বাল্মীকিপ্রতিভার সরস্বতী হয়ে।
রবীন্দ্রনাথ যখন বিলেত থেকে ফিরে এলেন তখন ঠাকুরবাড়িতে শুরু হয়েছে। গীতিনাট্যের যুগ। স্বর্ণকুমারী ও জ্যোতিরিন্দ্রর লেখা বসন্ত-উৎসব, মানময়ীর ঘরোয়া অভিনয় হয়ে গেছে কয়েকবার। এমন সময় রবীন্দ্রনাথ দেশী বিলিতি সুর ভেঙে লিখলেন একটি নতুন অপেরাধর্মী গীতিনাট্য। রামায়ণের সুপরিচিত রত্নাকর দস্তুর বাল্মীকিতে রূপান্তরের কাহিনীটিকে তিনি বেছে নিলেন। এই নাটকে তিনটি নারী চরিত্র রয়েছে। বালিকা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। নাটক লেখার পরেই যখন রিহার্সাল শুরু হল তখন রবীন্দ্রনাথ সরস্বতীর ভূমিকায় প্রতিভার অপূর্ব অভিনয় দেখে নাটকের সঙ্গে প্রতিভার নামটি জুড়ে নতুন নাম দিলেন বাল্মীকিপ্রতিভা।
এরপর স্থির হল, বিদ্বজ্জন-সমাগম সভায় বাল্মীকি প্রতিভার অভিনয় হবে। সেদিনটা ছিল শনিবার। ১৬ই ফান্তুন বাংলা ১২৮৭ সাল। সন্ধ্যেবেলা। বসন্তের মৃদুমন্দ দখিনা বাতাস বইছে। দর্শকরা উপস্থিত। এমন সময়ে শুরু হল বাল্মীকিপ্রতিভা। ডাকাতের আনাগোনা। গুরুগম্ভীর পরিবেশ। দর্শকেরা মুগ্ধ! স্তব্ধ। বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়। ক্রৌঞ্চমিথুনের জায়গায় সত্যিকারের দুটো মরা বক। বুক দুটো অবশ্য জোগাড় করে এনেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। ছোট ভাইয়ের নাটক মঞ্চস্থ হবে, জ্যোতিরিন্দ্র মহা উৎসাহে পাখি শিকারে বেরোলেন। কিন্তু কোথায় পাখি? সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে খালি হাতে ফিরে আসছেন, তখন দেখলেন, একজন অনেকগুলো বক বিক্রী করতে যাচ্ছে। তার কাছ থেকে দুটো বক কিনে, মেরে বাড়ি নিয়ে আসেন। সেকালে অনেকেই স্টেজের মধ্যে বাস্তব জগৎকে টেনে আনতে চেষ্টা করতেন। শুধু সেকালে কেন? একালেও রিয়্যালিস্টিক স্টেজ করার চেষ্টা কম হয় না। স্টেজের মধ্যে ট্রেন-সেতু। বন্যা-গাড়ি এসব আনার মধ্যেও সেই একই মানসিকতা কাজ করছে। কালমৃগয়ার অভিনয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের একটা পোষা হরিণকে স্টেজে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এই জাতীয় জিনিষের সূচনা হয় বেঙ্গল থিয়েটারের পুরুবিক্রম নাটকে। ছাতুবাবুদের বাড়ির শরচ্চন্দ্র ঘোষাল পুরু সেজেছিলেন। তিনি একটা সত্যিকারের সাদা তেজিয়ান ঘোড়ার পিঠে চেপে স্টেজে আসতেন।
বাল্মীকিপ্রতিভার অভিনবত্ব ছিল অভিনেত্রীর আবির্ভাবে। হাত বাঁধা বালিকার ভূমিকায় সত্যিই একটি অনিন্দ্যসুন্দরী বালিকা এসে বসল। প্রতিভাকে চিনতে পারলেন অনেকে। এই মেয়েটিই তো সেবার মুগ্ধ করেছিল গান শুনিয়ে, এবারও মুগ্ধ করল সরস্বতী রূপে। নাটকের শেষে এক অনির্বচনীয় তৃপ্তির রেশ নিয়ে ফিরে গেল সবাই। আর্যদর্শন কাগজে যখন এই অভিনয়র সংবাদ ছাপা হল, তখন দেখা গেল সমালোচক প্রতিভার অভিনয়ের প্রশংসা করে লিখেছেন, শ্ৰীযুক্ত বাবু হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভা নাম্নী কন্যা প্রথমে বালিকা পরে সরস্বতীমূর্তিতে অপূর্ব অভিনয় করিয়াছিলেন। প্রতিভা সৌভাগ্যবতী, তাই প্রথম মঞ্চাবতরণের পর তাকে সহ্য করতে হয়নি অপমানের গ্লানি। বরং কলারসিকেরা তাকে সশ্রদ্ধ স্বীকৃতিই জানিয়েছেন।
