মহর্ষির নাতনীদের মধ্যে সবার চেয়ে বয়সে বড় সৌদামিনীর মেয়ে ইরাবতী আর হেমেন্দ্রনাথের মেয়ে প্রতিভা। দৌহিত্রীদের সবাই না হলেও ঠাকুরবাড়িতে যারা মানুষ হয়েছেন। তাঁদের আমরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েই মনে করব। যদিও ইরাবতীর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগ খুব বেশিদিনের নয়। তিনি রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী ছিলেন। বিয়ে হয়েছিল পাথুরেঘাটার সূর্যকুমারের দৌহিত্রের পুত্র নিত্যঞ্জনের সঙ্গে। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ভাইপো নিত্যরঞ্জন থাকতেন কাশতে। গোঁড়া হিন্দু-পরিবার হওয়ায় তাঁর। অনেকদিন ঠাকুকবাড়ির সঙ্গে যোগ রাখেননি। ইরাবতী বাপের বাড়ি এসেছিলেন বিয়ের দীর্ঘ আঠারো বছর পরে। তবে তার যে একটি কল্পনাপ্রবণ মন ছিল সেটি ধরা পড়ে সেই ছোটবেলাতেই, যখন তিনি রাজার বাড়ির কথা বলে, সমবয়সী মামাটিকে বোকা বানিয়ে দিতেন। তিনি হঠাৎ এসে তাকে বলতেন, আজ রাজার বাড়ি গিয়েছিলাম। বালকের কল্পনা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফুলে ফেঁপে উঠত। তাঁর মনে হত, রাজার বাড়ি খুব কাছে, এই বড় বাড়িটারই কোন একটা জায়গায়, কিন্তু কোথায় সেটা। বালকের ব্যাকুল প্রশ্ন বুক চিরে উঠে আসত, রাজার বাড়ি কি আমাদের বাড়ির বাহিরে?
ইরাবতী মজা পেয়ে বলতেন, না, এই বাড়ির মধ্যেই। তিনি জানতেও পারেননি এই ছোট্ট কথাটি তার মামার মনে কী আলোড়ন জাগায়। কল্পনার সোপানে সেই প্রথম পদার্পণ! বালক শুধু ভাবতেন, বাড়ির সকল ঘরই তো আমি দেখিয়াছি কিন্তু সে ঘর তবে কোথায়? রাজা কে কিংবা রাজত্ব কোথায় সে কথা তিনি জানতে পারেননি; শুধু মনে হয়েছে, তাঁদের বাড়িটাই রাজার বাড়ি। রবীন্দ্রনাথের শৈশব-কল্পনা উজ্জীবনে ইরাবতীর ভূমিকাটিকে তাই আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।
ইরাবতীর ছোট বোন ইন্দুমতীর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগ আরও কম। তার স্বামীর নাম নিত্যানন্দ (নিত্যরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। ঠাকুরবাড়িতে দুই জামাই বড় নিত্য ও ছোট নিত্য নামেই পরিচিত ছিলেন। ইন্দুমতী থাকতেন সুদূর মাদ্রাজে। নিত্যানন্দ সেখানকার ডাক্তার ছিলেন। খুব স্বাভাবিক কারণেই সেখানে তাঁরা এ্যাঙ্গলো ইণ্ডিয়ান সমাজের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করতেন বলে ইন্দুমতী বিদেশী চালচলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। তার যতগুলি ফটো আমরা দেখেছি সেগুলো সবই গাউন পরা, বিদেশিনীর সাজে। ইন্দুমতীর এক মেয়ে লীলার বিয়ে হয়েছিল প্রমথ চৌধুরীর ভাই মন্মথর সঙ্গে। চিত্রাভিনেত্রী দেবিকারাণী এই লীলারই মেয়ে।
প্রতিভা বা প্রতিভাসুন্দরী রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মাত্র পাঁচ বছরের ছোট। মহর্ষির তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথের প্রথম সন্তান প্রতিভা। সত্যিই প্রতিভাময়ী তিনি। হেমেন্দ্র তাঁকে সর্বগুণে গুণান্বিত করে তোলার জন্যে একেবারে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তাই প্রতিভা প্রথম জীবনে অবকাশ পেয়েছেন খুব কম। সাদাসিধে বেথুন স্কুলের বদলে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন লরেটো হাউসে। লরেটোতে প্রতিভাই প্রথম হিন্দু (ব্রাহ্ম) ছাত্রী। তখনও মেয়েদের পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় প্রতিভা কোন পরীক্ষা দিতে পারেননি তবে ওপরের ক্লাস পর্যন্ত উঠেছিলেন।
আশ্চর্যের বিষয় এই যে, প্রতিভা বা তার বাবা হেমেন্দ্রনাথ কেউই এ সময় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার কথা ভাবেননি অথচ তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ দরজা খোলার চেষ্টা করছিলেন চন্দ্রমুখী বসু। তিনি সময়ের দিক থেকে প্রতিভার সমসাময়িক। মেয়েদের শিক্ষা প্রসারে চন্দ্রমুখীর দান অসামান্য। তিনি এনট্রান্স পরীক্ষা দেবার জন্যে প্রথমে দেরাদুনের নেটিভ ক্রিশ্চান গার্লস মিশনারী স্কুলের অধ্যক্ষ রেভারেণ্ড হেরনের কাছে প্রার্থনা জানালেন। হেরন প্রথমে তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পরীক্ষা দেবার সংকল্প ত্যাগ করতে বলেন। কিন্তু চন্দ্রমুখীর কাতর অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতিও প্রার্থনা করলেন। সত্যিই তো, ছেলেরা যদি পরীক্ষা দিতে পারে তবে এই মেয়েটি পারবে না কেন? কি তার অপরাধ?
অপরাধ না থাকুক, সহজে চন্দ্রমুখীকে অনুমতি দেয়নি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক তর্কাতর্কির পর ১৮৭৬ সালের ২৬শে নভেম্বরের সিণ্ডিকেট সভা চন্দ্রমুখীকে এই শর্তে পরীক্ষায় বসতে দিতে রাজী হলেন যে তাকে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে গণ্য করা হবে না এবং পরীক্ষকরা তার খাতা দেখে যদি বা পাশের নম্বর দেন, তবু পাশকরা ছাত্রদের তালিকায় তার নাম থাকবে না। চমৎকার সিদ্ধান্ত। ধন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়! চন্দ্রমুখী তাতেই রাজী হলেন এবং পাশও করলেন। এ সময়ও ঠাকুরবাড়ির কোন মেয়ে এগিয়ে এলেন না পরীক্ষা দিতে, অথচ ঘরে বসে তখন প্রতিভা চন্দ্রমুখীর মতোই শিক্ষিত হয়ে উঠেছেন। তাই ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা প্রথম স্কুলযাত্ৰিনীদের একজন হয়েও, প্রথম কলেজে পড়া ছাত্রীর গৌরব থেকে বঞ্চিত হলেন।
প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট হিসেবেও চন্দ্রমুখীর নাম করা যায়। সে সময় তার সঙ্গিনী ছিলেন মাত্র আর একজন, কাদম্বিনী বসু। পরে যিনি প্রথম মহিলা চিকিৎসক হয়েছিলেন। আর সবটাই যে শুধু এই দুটি মেয়ের চেষ্টায় সম্ভব হয়েছিল তা নয়। এদিকে অনেকেরই দৃষ্টি পড়েছিল। ঢাকার অবলাবান্ধব দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের আপ্রাণ চেষ্টায় মেয়েরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অতিরিক্ত টেস্ট পরীক্ষায় বসার অনুমতি পেলেন। সাহায্য করলেন নারী হিতৈষী ভাইস চ্যান্সেলার স্যার আর্থার হবহাউস। এবারে পাশ করলেন কাদম্বিনী। তিনি কলেজে পড়ার জন্য অনুমতি চাইলে শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মতি পাওয়া গেল। ১৮৮০ সালে এনট্রান্স পাশ করলেন চণ্ডীচরণ সেনের মেয়ে কামিনী সেন (রায়) ও সুবর্ণপ্রভা বসু। ১৮৮১-তে পাশ করলেন আরো ছজন মেয়ে। অবলা দাস (বসু), কুমুদিনী খাস্তগির (দাস), ভার্জিনিয়া মিত্র (নন্দী), নির্মল মুখোপাধ্যায় (সোম), প্রিয়তমা দত্ত (চট্টোপাধ্যায়) ও বিধুমুখী বসু। বাংলার নারী প্রগতি আন্দোলনে পরে এরা প্রত্যেকেই উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এবং অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। পরের ইতিহাস তো সংক্ষিপ্ত। বেথুন কলেজের একমাত্র ছাত্রী হিসেবে কাদম্বিনী এবং ফিচার্চ অব স্কটল্যাণ্ড থেকে বি. এ. পড়লেন চন্দ্রমুখী। ১৮৮২ সালের ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে দেখা গেল, সমস্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে প্রথম দুটি মহিলা গ্র্যাজুয়েটের নাম চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী। চন্দ্রমুখী পরে এম. এ. পাশ করেন আর কাদম্বিনী হন চিকিৎসক। কাদম্বিনীকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েই। ডাক্তার হতে হয়েছিল, সহজে হয়নি। ভারতে তিনি পরীক্ষকদের বিচারে ফেল করেছিলেন তবে তাকে চিকিৎসা করবার অনুমতি দেওয়া হয়। তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি গ্লাসগো ও এডিনবরা থেকে চিকিৎসকের ডিগ্রী নিয়ে আসেন। মাদ্রাজে ডাক্তারী পড়েছিলেন অবল দাস। কলকাতায় ভার্জিনিয়া মিত্র ও বিধুমুখী বসু। এভাবেই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের দরজা খুলে দিলেন চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী। সে যুগে এই দুজনকে দেখবার জন্য রাস্তায় লোকের ভিড় জমে যেত। বিশেষ করে মেয়েরা তাদের দেখত শ্রদ্ধা মেশানো বিস্ময় নিয়ে। এদের সঙ্গে প্রতিভার নামটি যুক্ত হলেই হয়ত সব দিক দিয়ে সুন্দর দেখাত কিন্তু পরীক্ষার ব্যাপারে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বেশ খানিকটা পিছিয়েই রইলেন। এগিয়ে গেলেন শিল্প-সংস্কৃতির জগতে।
