বৃহৎ পরিবারে পাঁচটি সন্তানের জননী সৌদামিনীর কর্তৃত্বশক্তির পরিচয় প্রথমটায় পাওয়া যায়নি। বোঝা গেল, যেদিন তিনি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হলেন।
যে বিচক্ষণতার সঙ্গে সৌদামিনী ভাঙা সংসারের হাল ধরেছিলেন, তার তুলনা হয় না। গুণেন্দ্রনাথের উদ্দাম-জীবন উৎসবের উন্মত্ততায় এমন আকস্মিকভাবে নিঃশেষ হয়ে গেল দেখে তিনি মনঃস্থির করেছিলেন, তার ছেলেদের তিনি বিলাসের ফাঁস থেকে, যেমন করে তোক রক্ষা করবেন। বঙ্গহীন প্রমোদের স্রোতে ভেসে যেতে দেবেন না। এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা যে কত কঠিন, সেকথা আজ আমরা বুঝতে পারব না। উনিশ শতকের শিক্ষা-সংস্কৃতি-নবজাগরণের ফাঁক দিয়ে তখন বয়ে চলেছে বাবুয়ানির তীব্র পঙ্কিল স্রোত। একদিকে যেমন স্কুল খোলা, পত্রিকা প্রকাশ, সমাজসেবার ধূম অপরদিকে তেমনি নগরনটীদের নৃপুর নিক্কণ আর পেয়ালাভরা সুরার রক্তিম আহ্বান। ধনী সন্তানের দেশী বিলিতি উভয় ধরনের বিলাসিতাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন।
বড়লোকের ছেলে বিলাসী হবে না? সে কি কথা? গোঁফ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তো তাদের তালিম দিয়ে আলালের ঘরের দুলালে পরিণত করা হত। যখনকার যা দস্তুর! ঠাকুরবাড়িতে ধনের অভাব ছিল না, অভাব ছিল না বনেদিয়ানার। তবে? বাবুয়ানি না দেখালে আভিজাত্য থাকবে কি করে? কলকাতার আর পাঁচটা ধনী পরিবার কি করছে? সৌদামিনী শক্ত হলেন। যেখানে যা হয় হোক। পাশেই তো রয়েছে মহর্ষিভবন। সেখানে তে আনন্দের উপাদানের নীচে বয়ে যাচ্ছে না পঙ্কিল বিলাসের স্রোত। তাই হল শেষ পর্যন্ত। সেকেলে বাবুয়ানির ক্রমাগত হাতছানি অনায়াসে উপেক্ষা করে গগনেন্দ্র-সমরেন্দ্র-অবনীন্দ্র মহর্ষিপুত্রদের মতোই নানা গুণের অধিকারী হয়ে উঠলেন। সব দিকে থাকত সৌদামিনীর প্রখর দৃষ্টি। তিনি কখনো নিজের ইচ্ছের কথা জোর করে জানাতেন না, কোথাও ছিল না জেদ বা জবরদস্তির কোন চিহ্ন। তবু তাঁরই ইচ্ছায়, তারই প্রাণের প্রভাবে ছেলেরা চলেছে। কেউ এতটুকু প্রতিবাদ করতে পারেনি। বাইরে কঠিন ভেতরে কোমল এই অসামান্য নারী রবীন্দ্রনাথেরও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন। বহুদিন পরে কথা প্রসঙ্গে কবি রাণী চন্দকে বলেন, আমাদের গগনদের মা ছিলেন, যাকে ভুলেও শিক্ষিত বলা যায় না কিন্তু, কী সাহস আর কী বুদ্ধিতে তিনি চালিয়েছিলেন সবাইকে। তিন তিনটি ছেলেকে কী ভাবে মানুষ করে তুললেন। ছেলেরা তাদের মাকে যা ভক্তি করে অমন সচরাচর দেখা যায় না।
সৌদামিনী শুধু ছেলেদের মানুষ করেছিলেন তা নয়, ঋণের বোঝায় সংকটাপন্ন জমিদারীকেও একেবারে নতুন করে দিয়েছিলেন। তার কথা মনে হলেই যেন যোগাযোগ উপন্যাসের বড়বৌ অর্থাৎ কুমুর মাকে মনে পড়ে যায়।
সবদিকে নজর রাখতে গিয়ে সৌদামিনী অবশ্য নিজের দিকে একেবারেই তাকাতে পারেননি। সাহিত্য বা শিল্পচর্চার নজির না থাকলেও নানারকম মেয়েলি গুণের অধিকারী ছিলেন সৌদামিনী। মনে হয় তার নাতনীদের মধ্যে পরে যেসব গুণের প্রকাশ হয়েছিল সবই তার মধ্যে অল্পবিস্তর ছিল, নাহলে কারুর মধ্যে কোন গুণের সামান্য স্ফুলিঙ্গ দেখলেই তিনি তাকে চিনতেন কি করে। তাছাড়া তিনি বেশ ভাল চরকা কাটতে পারতেন। তার নিজের হাতে কাঁটা-সুতোয় বোনা কাপড় শান্তিপুরী কাপড়ের মতো মিহি দেখাত। নাতনীদেরও সবাইকে তিনি একটা করে চরকা কিনে দিয়েছিলেন। রোজ সুতো কেটে তাদের দেখাতে হত। হাতে তৈরি জিনিষ বা স্বদেশী কুটির শিল্পের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। গ্রামাঞ্চল থেকে মেয়েরা তাদের হাতের তৈরি খেলনা বা পুতুল বিক্রী করতে এলে তিনি তাদের উৎসাহ দেবার জন্যে সব কিনে নিতেন। এমনকি স্বদেশী আন্দোলনের প্রতিও তার সহানুভূতি ছিল। অর্থ-সাহায্য ছাড়াও তার বাড়িতে গোপনে অনুশীলন সমিতির কাজ হত! এরকম ছোটখাট অনেক ঘটনা দেখে বোঝা যায়, সৌদামিনী প্রগতিশীল ছিলেন না ঠিকই কিন্তু অসাধারণ এবং দুর্লভ গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁকে এবং তাঁর মতে আরো কয়েকজন বন্ধুকে দেখে জানা যায়, ব্রাহ্ম সমাজ বা নারী প্রগতি-স্ত্রীশিক্ষা প্রভৃতি নবজাগ্রত-ধ্যান-ধারণার সঙ্গে যেসব মেয়ের যোগ ছিল না তারাও কম কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে যাননি। এঁদের কথা আলোচনা না করে শুধু প্রগতিশীল জ্ঞানদানন্দিনী-কাদম্বরী-স্বর্ণকুমারীর কথা মনে রাখলে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের পরিচয় যেমন সম্পূর্ণ পাওয়া যাবে না, তেমনি জানা যাবে না এই মহীয়সীদের প্রভাবে এ পরিবারের পুরুষদের শিল্পীস্বভাব কি করে গড়ে উঠেছিল। যাক সে কথা।
মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রতিভাময়ী নাতনীদের সংখ্যাও কম নয়। উপযুক্ত পরিবেশে, প্রতিভাবান পিতামাতার প্রভাবে, তারাও অনেকেই নানান গুণের অধিকারিণী হয়ে উঠেছিলেন। ভিন্ন পরিবার থেকে আসা কয়েকজন নাতবৌও যে কৃতিত্বের পরিচয় দেননি, তা নয়। আসলে এ সময় বাংলাদেশে অভাবনীয় নারী জাগরণের উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। মেয়েরা নিজেরাই ঠেলেঠুলে বেরিয়ে এসেছিলেন বাইরে। প্রথম পর্যায়ে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের কাজকর্ম দেখে যেমন মেয়েরা সবাই হতবা হয়ে গিয়েছিলেন এন ঠিক সে অবস্থা রইল না। মহর্ষির নাতনীদের সমবয়সী অনেকগুলি গুণবতী মেয়ের সন্ধান পাওয়া গেল। অবশ্য ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাও যে দূরে সরে গেলেন, তা নয়। তারা এখন অস্পৃশ্য। মানবী নন বরং উঁচু মহলের আভিজাত্যের প্রতীক এবং অনুকরণযোগ্য। সমাজ ধিক্কারের বদলে তাদের রুচিবোধের প্রশংসা করল। শিল্পে-সাহিত্যে ঠাকুরবাড়ির সংস্কৃতির একটা নিজস্ব ছাপ পড়তেও শুরু হল। বস্তুতঃ ১৮৭৫ থেকে ১৯২৫ এই পঞ্চাশ বছরটাকে যদি এক ঝলকে, এক পলকে দেখে নেওয়া যেত তাহলে ঠাকুরবাড়ির সোনালি-সফল দিনগুলোকেও একসঙ্গে দেখা যেত। বাংলার নারী সমাজেও এই সময় এসেছে যুগান্তর। ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরেও জ্ঞানদানন্দিনীস্বর্ণকুমারী-মৃণালিনী-সৌদামিনীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রতিভা-ইন্দিরা-সরলাশোভনারা। সবাইকে আমরা পেয়ে যাচ্ছি একসঙ্গে। কিন্তু আলোচনার সুবিধের জন্যে একের পর এক নীতি মেনে নিতে হল ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে এবার পাল্লা দিলেন অন্যান্য মেয়েরাও। সবার দানেই নারীপ্রগতি আজকের দিনে এত বেশি সার্থক হয়ে উঠেছে।
