সহধর্মিণীর কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা কি ছিল জানতে ইচ্ছে করে। নিশ্চয়ই। কি ভাবে তিনি তাদের যৌথ জীবন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেকথা জানা যায় মৃণালিনীকে লেখা কবির পত্র পড়ে। একটি পত্রে তিনি লিখেছেন, আমাকে সুখী করবার জন্যে তুমি বেশি কোন চেষ্টা কোরো না—আন্তরিক ভালোবাসাই যথেষ্ট। অবশ্য তোমাতে আমাতে সকল কাজ ও সকল ভাবেই যদি যোগ থাকত খুব ভাল হত-কিন্তু সে কারো ইচ্ছায়ও নয়। যদি তুমি আমার সঙ্গে সকল রকম বিষয়ে সকল রকম শিক্ষায় যোগ দিতে পার ত খুসি হই—আমি যা কিছু জানতে চাই তোমাকেও তা জানাতে পারি—আমি যা শিখতে চাই তুমিও আমার সঙ্গে শিক্ষা কর তাহলে খুব সুখের হয়। জীবনে দুজনে মিলে সকল বিষয়ে অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে অগ্রসর হওয়া সহজ হয়—তোমাকে কোন বিষয়ে আমি ছাড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করিনে—কিন্তু জোর করে তোমাকে পীড়ন করতে আমার শঙ্কা হয়। সকলেরই স্বতন্ত্র রুচি অনুরাগ এবং অধিকারের বিষয় আছে—আমার ইচ্ছা ও অনুরাগের সঙ্গে তোমার সমস্ত প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ মেলাবার ক্ষমতা তোমার নিজের হাতে নেই-সুতরাং সে সম্বন্ধে কিছুমাত্র খুংথুং না করে ভালোবাসার দ্বারা যত্নের দ্বারা আমার জীবনকে মধুর–আমাকে অনাবশ্যক দুঃখকষ্ট থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করলে সে চেষ্টা আমার পক্ষে বহুমূল্য হবে।
কবির প্রত্যাশা পূর্ণ করেছিলেন মৃণালিনী। জীবনের সবক্ষেত্রে এমনকি শান্তিনিকেতনে অদিশ-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বাসনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেখানে গেলে মৃণালিনী ও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় আত্মীয় স্বজনের উপদেশ, উপহাস, বিরুদ্ধতা, বিদ্রুপ সবই সহ্য করতে হয়েছিল। আত্মীয়দের খুব দোষ নেই, সর্বনাশের মুখোমুখি গিয়ে কেউ দাঁড়াতে চাইলে। তাকে তে সাবধান করবেনই। নাবালক পঁাচটি সন্তান, তার মধ্যে তিনটি মেয়ে অথচ কবি অঁরি যথাসর্বস্ব ঢেলে দিচ্ছেন আশ্রম বিদ্যালয়ে। লোকে বলবে না। কেন? মৃণালিনীর মনেও এ নিয়ে ভাবনা ছিল, তবু তিনি স্বামীকে সব কাজে হাসিমুখে সাহায্য করেছেন। যখনি কোন প্রয়োজন হয়েছে, তখনই খুলে দিয়েছেন গায়ের এক একটি গয়না। মৃণালিনী পেয়েছিলেন প্রচুর। বিয়ের যৌতুকের গয়না ছাড়াও শাশুড়ীর আমলের ভারী গয়না ছিল অনেক। সবই তিনি কবির কাজে গা থেকে খুলে দিয়েছিলেন। রথীন্দ্র লিখেছেন, শেষ পর্যন্ত হাতে কয়েক গাছ চুড়ি ও গলায় একটি চেন হার ছাড়া তার কোন গয়না অবশিষ্ট ছিল না।
শুধু গয়না দিয়ে নয়, আশ্রমের কাজেও মৃণালিনী স্বামীকে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন! আধুনিক অর্থে তাকে হয়ত প্রগতিশীল বলা যাবে না কারণ শিক্ষাদীক্ষায় ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ছাড়িয়ে অন্যান্য মেয়েরাও ক্রমশঃ এগিয়ে যাচ্ছিলেন। উগ্র আধুনিকতা এ বাড়ির মেয়েদের রক্তমজ্জায় প্রবেশ করেনি। দীর্ঘকাল ধরে জ্ঞানদানন্দিনীই সেখানে উগ্র আধুনিকতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। কিন্তু মহৎ নারীর পরিচয় মৃণালিনীর মধ্যে আছে। চারিত্রপূজা গ্রন্থ লেখবার সময় রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছেন, মহাপুরুষের ইতিহাস বাহিরে নানা কার্যে এবং জীবন বৃত্তান্তে স্থায়ী হয়, আর মহৎ নারীর ইতিহাস তাহার স্বামীর কার্যে রচিত হইয়া থাকে। এবং সে লেখায় তাহার নামোল্লেখ থাকে না। এরই মধ্যে মামরা মৃণালিনীর আসল পরিচয় খুঁজে পাব। আজ আমরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের কথা খুঁটিয়ে বলতে বসেছি তাই, নয়ত মৃণালিনীকে নিয়ে স্বতন্ত্র প্রসঙ্গের শবতারণা করার সুযোগ বড় কম। তিনি রবীন্দ্রজীবনে, ঠাকুরবাড়িতে, শান্তিনিকেতনের আশ্রম-বিদ্যালয়ে মিশে আছেন ফুলের সুরভির মতো। দেখা যায় না, অনুভবে মন ভরে যায়।
মৃণালিনী আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথের আশ্রম-বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা অরো সার্থক হতে পারত। তিনি ব্রহ্মচর্য আশ্রমের দেখাশোনা করতেন এবং অপরের কচিকচি শিশুদের অপরিসীম মাতৃস্নেহে নিজের কাছে টেনে নিয়ে, তাদের হোস্টেলে আসার দুঃখ ভুলিয়ে দিতেন। বাড়ির থেকে দূরে এসেও ছেলেরা, মাতৃস্নেহের আশ্রয় পেত। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের তীব্র অঘািত সহ্য করতে না পেরে, আশ্রম-বিদ্যালয় স্থাপনের মাত্র এগারো মাস পরেই বিদায় নিলেন মৃণালিনী। কবির সমস্ত সেবা যত্ন ব্যর্থ করে দিয়ে শীতের পদ্মটি ম্লান হয়ে এল, হারিয়ে গেল কবির প্রিয় পত্র-সম্বোধনটি ভাই ছুটি। কে জানত এত শীঘ্র জীবন থেকে, সংসার থেকে ছুটি নিয়ে তিনি চলে যাবেন! জীবনের প্রতি পদে লোকান্তরিত মৃণালিনীর অভাব অনুভব করেছেন রবীন্দ্রনাথ এমন কেউ নেই যাকে সব বলা যায়—। স্মরণের কবিতায় ঝরে পড়েছে লোকান্তরিত পত্নীর জন্য বেদনা। সংসারে যখন শুধুই কথার পুঞ্জ জমে উঠছে তখন তিনি বারবার স্মরণ করছেন লোকান্তরিতা স্ত্রীকে। অনুভব করছেন তাঁর আশ্রমবিদ্যালয় অসম্পূর্ণ থেকে গেছে কারণ আমি তাদের সব দিতে পারি, মাতৃস্নেহ তো দিতে পারি না। বাংলাদেশে আরো কয়েকজন আদর্শ জননীর পাশে মৃণালিনীর মাতৃমূর্তিটিও চিরস্থায়ী আসন লাভ করতে পারে।
ঠাকুরবাড়ির বৌয়েদের সঙ্গে আরো একজনের কথা এ প্রসঙ্গে সেরে নেওয়া যাক। যোগমায়াকে নিশ্চয় মনে আছে, গিরীন্দ্রনাথের সাহিত্যপ্রেমিকা ধর্মশীল স্ত্রী, যিনি সাবেকী লক্ষ্মীজনার্দন ঠাকুরকে নিয়ে উঠে এসেছিলেন বৈঠকখানা বাড়িতে। সেদিন থেকে জোড়াসাঁকোর বাড়ি দু ভাগ হয়ে গেল কিন্তু মনের মধ্যে দেয়াল ওঠেনি। বরং ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যোগ ছিল না নগেন্দ্রনাথের সন্দেহপরায়ণা স্ত্রী ত্রিপুরাসুন্দরীর। সম্পত্তি সংক্রান্ত নানারকম সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তার ধারণা হয়েছিল, মহর্ষিপরিবার তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে চান। তাই তিনি সদর টীটের বাড়ি থেকে এ বাড়িতে কদাচিৎ এলেও কিছু খেতেন না। সব সময় তার খাবার অন্য বৌদের চেখে দিতে হত। যাক সে কথা। যোগমায়ার পুত্রদের সঙ্গে মহর্ষির পুত্রদের সৌহার্দ্য ঘোচেনি। মানসিকতার দিক থেকেও গুণেন্দ্ৰপরিবার এঁদের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। তাই এ দুটি বাড়ি প্রকৃতপক্ষে এক বাড়িই রয়ে গেছে। আবার গুণেন্দ্ৰপরিবার ব্রাহ্ম না হওয়ায় পাথুরেঘাটা বা কয়লাহাটা ঠাকুরবাড়ির সঙ্গেও তাদের যোগ ছিন্ন হল না। এক কথায় এঁরা রইলেন দুই ঠাকুর পরিবারের ঠিক মাঝখানে। অন্যান্য ঠাকুরদের সঙ্গে রইল সামাজিক যোগ, মহর্ষিভবনের সঙ্গে হল মানসিক যোগ। তাই দ্বারকানাথ লেনের পাঁচ নম্বর আর ছ নম্বরকে এক বাড়ি বলাই ভাল। আর সত্যিই তো এক সীমানার মধ্যে ছিল দুটি বাড়ি, এখন অবশ্য নেই। পাঁচ নম্বর বা দ্বারকানাথের সাজানো গোছানো অমন সুন্দর বৈঠকখানা বাড়িটিকে ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে, রক্ষা পেয়েছে শুধু অন্দরমহল সংলগ্ন বেনেবাড়িটি। এই বৈঠকখানা বাড়ির প্রকৃত গৃহিণী ছিলেন গুণেন্দ্রনাথের স্ত্রী সৌদামিনী।
