ঠিক সুগৃহিণী বলতে যা বোঝায় ঠাকুরবাড়িতে মৃণালিনী ছিলেন তাই। জোড়াসাঁকোতে সবার ছোট তবু সবাই তার কথা শুনতেন। সবাইকে নিয়ে তিনি আমোদ-আহ্লাদ করতেন, বৌয়েদের সাজাতেন কিন্তু নিজে সাজতেন না। সমবয়সীরা অনুযোগ করলে বলতেন, বড় বড় ভাশুর-পো ভাগ্নেরা চারদিকে ঘুরছে—আমি আবার সাজব কি? একদিন কানে দুটি ফুল ঝোলানো বীরবৌলি পরেছিলেন সবার উপরোধে। সেইসময়ে হঠাৎ কবি উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি দু হাত চাপা দিয়ে বীরবেইলি লুকিয়ে ফেলেছিলেন। গয়না পরায় এতই ছিল তাঁর লজ্জা। তিনি আরো ভালবাসতেন রান্না করতে, আর পাঁচ জনকে ভালমন্দ বেঁধে খাওয়াতে। ঠাকুরবাড়িতে মেয়েদের গৃহকর্মে নানারকম তালিম দেওয়া হত। মহর্ষিকন্যা সৌদামিনী তার পিতৃস্মৃতিতে লিখেছিলেন যে তাদের প্রতিদিন নিয়ম করে একটা তরকারি রাধতে হত। রোজ একটা করিয়া টাকা পাইতাম, সেই টাকায় মাছ তরকারি কিনিয়া আমাদিগকে রাধিতে হইত।
নতুন বৌয়েদের শিক্ষা শুরু হত পান সাজা দিয়ে। তারপর তারা শিখতেন বড়ি দিতে, কাসুন্দি-আচার প্রভৃতি তৈরি করতে। ধনী পরিবারের বৌ হলেও এসব শিক্ষায় ত্রুটি ছিল না। বলাবাহুল্য মৃণালিনী এসব কাজে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে একটা কথা মনে রাখতেই হবে, এ সময় দিন বদলাচ্ছে। পালাবদল চলছে বাড়ির বাইরে, বাড়ির ভেতরেও। না বদলালে কি জ্যোতিরিন্দ্র কাদম্বরী তিন তলার ছাদে নন্দন কানন তৈরি করতে পারতেন? সে সভায় অনাত্মীয় পুরুষেরাও অবাধে আসতেন, অথচ সত্যেন্দ্র-বন্ধু মনোমোহনকে অন্তঃপুরে নিয়ে আসতে কম কাঠ খড় পোড়াতে হয়নি। যুগ বদলাচ্ছে। মৃণালিনী যখন লরেটো স্কুলে পড়তে গেলেন তখন আর কেউ ধিক্কার দিতে এল না। কারণ তার আগেই চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী অসাধ্য সাধন করে ফলেছেন। যাক সে কথা পরে হবে। এখন কথা হচ্ছে ঠাকুরবাড়ির সাবেকী {ণ নিয়ে। অন্দরমহলের ব্যবস্থা বদলাতে বড় দেরি হয়। যাই যাই করেও স্মিকালের শেষ-সূর্যের আলোর মতো মেয়েদের চিরকেলে অভ্যেস যেন যেতে চায় না। তাই বাইরের জগতে কয়েকটি মেয়ে বিরাট পরিবর্তন আনলেও। বৌয়েরা তখনও শিখতেন ঝুনি-রাইয়ের ঝাল কাসুন্দি, আমসত্ত্ব, নারকেল চিড়ে তৈরি করতে। মৃণালিনী নানারকম মিষ্টি তৈরি করতে পারতেন। তার মানকচুর জিলপি, দইয়ের মালপো, পাকা আমের মিঠাই, চিড়ের পুলি যারা একবার খেয়েছেন তারা আর ভোলেননি। স্ত্রীর রন্ধন নৈপুণ্যে কবিও উৎসাহী হয়ে মাঝে মাঝে নানারকম উদ্ভট রান্নার এক্সপেরিমেন্ট করতেন। শেষে। হাল ধরে সামাল দিতে হত মৃণালিনীকেই। শেষে তাকে রাগাবার জন্যে কবি বলতেন, দেখলে তোমাদের কাজ তোমাদেরই কেমন একটা শিখিয়ে দিলুম। মৃণালিনী চটে গিয়ে বলতেন, তোমাদের সঙ্গে পারবে কে? জিতেই আছ সকল বিষয়ে।
লেখাপড়া শেখার পর শিলাইদহে বাস করবার সময় মৃণালিনী কবির নির্দেশে রামায়ণের সহজ ও সংক্ষিপ্ত অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছিলেন। শেষ হয়নি। কবি সেই অসমাপ্ত খাতাটি তুলে দিয়েছিলেন মাধুরীলতার হাতে, বাকিটুকু শেষ করার জন্যে। অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার আগেই অকালে মাধুরীর জীবনদীপ নিবে যাবার পর আর খাতাটির খোঁজ মেলেনি। রথীন্দ্রের কাছে আর একটি খাতা ছিল—তাতে মৃণালিনী মহাভারতের কিছু শ্লোক, মনুসংহিতা ও উপনিষদের শ্লোকের অনুবাদ করেন। এছাড়া কবির নির্দেশে তিনি বাংলাদেশের রূপকথা সংগ্রহের কাজেও হাত দিয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ তার সংগ্রহ থেকেই পেয়েছিলেন ক্ষীরের পুতুল গুল্পটি। মৃণালিনী ঠিক যেমন করে গল্পটি বলেছিলেন ঠিক তেমনি করেই লিখেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। রূপকথার যাদুকরের সেদিন হাতেখড়ি হল মৃণালিনীর কাছেই। সকৃতজ্ঞ অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, এই আমার রূপকথার আদিকথা। কিন্তু মৃণালিনীর লেখা আর কিছু কি ছিল? স্বর্ণকুমারীকে এ নিয়ে একবার প্রশ্ন করা হলে তিনি দৃপ্তভঙ্গিতে বলেছিলেন, তাহার স্বামী বাংলার একজন শ্রেষ্ঠ লেখক, সেইজন্য তিনি স্বয়ং কিছু লেখা প্রয়োজন বোধ করেন নাই।
খুবই সত্যি কথা, তবু মনটা খুঁতখুঁত করে বৈকি। ঠাকুরবাড়ির এই আমুদে বৌটি কি তার মনের মধু সবটাই ঢেলে দিয়েছিলেন নীরব সেবায়! কালের সীমা পেরিয়ে কিছুই কি আমাদের কাছে এসে পৌঁছবে না? দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী হেমলতার লেখা থেকেই শুধু পাওয়া যাবে মৃণালিনীকে? সুরসিকা মৃণালিনীর একটা-দুটো চিঠি অবশ্য রক্ষা পেয়েছে। সেই ছোট্ট সাংসারিক চিঠির মধ্যেও তার পরিহাসপ্রিয় সহজ মনটি ধরা পড়েছিল। সুধীন্দ্রনাথের স্ত্রী চারুবালাকে লেখা একটা চিঠিতে দেখা যাবে মৃণালিনী তাকে অনুযোগ করছেন অনেকদিন চিঠি না লেখার জন্যে। তার মধ্যে যে অনাবিল স্বচ্ছতা আছে তার সৌন্দর্য বুঝি কোন সাহিত্যিক চিঠির চেয়ে কম নয় :
…তোমার সুন্দর মেয়ে হয়েছে বলে বুঝি আমাকে ভয়ে খবর দাওনি পাছে আমি হিংসে করি, তার মাথায় খুব চুল হয়েছে শুনে পর্যন্ত কুন্তলীন মাখতে আরম্ভ করেছি, তোমার মেয়ে মাথা ভরা চুল নিয়ে আমার ন্যাড়া মাথা দেখে হাসবে, সে আমার কিছুতেই সহ্য হবে না। সত্যিই বাপু, আমার বড় অভিমান হয়েছে, না হয় আমাদের একটি সুন্দর নাতনী হয়েছে, তাই বলে কি আর আমাদের একেবারে ভুলে যেতে হয়।
শান্তিনিকেতনে চলে গেলেও জোড়াসাঁকোর একান্নবর্তী পরিবারটির জন্যে মৃণালিনীর আন্তরিকতা কখনো হ্রাস পায়নি। শিলাইদহে তার কাছেই ছুটে যেতেন ভাশুরপো ও ভাশুরঝিরা। বলেন্দ্রনাথ সংস্কৃত, ইংরেজী, বাংলা যখন যে বই পড়তেন কাকীমাকে পড়ে শোনাতেন। শুধু কি আত্মীয় স্বজন? মৃণালিনী সবার সুখেই সুখী আবার সবার দুঃখেই সমদুঃখী। শিলাইদহে একদিন মুলা সিং নামে এক পাঞ্জাবী তার কাছে এসে কঁদতে কাঁদতে নিজের দুরবস্থার কথা জানিয়ে বললে, মাইজী, একটি চাকরি দিয়ে আমাকে রক্ষা করুন, নতুবা আমি সপরিবারে মারা পড়িব। রবীন্দ্রনাথ তখন শিলাইদহে ছিলেন না, মৃণালিনী তাকে কুঠিবাড়ির দারোয়ানের কাজে বহাল করলেন। কদিন পরে দেখলেন মুলা সিং তখনও বিষণ্ণ। মৃণালিনী কারণ জানতে চাইলেন। সে জানাল তার মাইনের সবটাই খরচ হয়ে যায় দুবেলা চার সের আটার রুটি খেতে। করুণাময়ী মৃণালিনী সেইদিন থেকে তার সংসার থেকে মুলা সিংয়ের জন্য চার সের আটা বরাদ্দ করলেন। মাইনে বাড়ল তবু আটার ব্যবস্থা আগের মতোই রয়ে গেল। দিনে দিনে তাঁর যে মূর্তিটি বড় হয়ে উঠেছে সে তার জননী মূর্তি। শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় তার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া গেল। সীমার্গের ইন্দ্রাণী সেখানে হয়ে উঠলেন অন্নপূর্ণা। মৃণালিনী রূপসী ছিলেন না, কিন্তু অপরূপ মাতৃত্বের আভা তার মুখে লাবণ্যের মতো ঢলঢল করত, একবার দেখলে আবার দেখতে ইচ্ছে হয়, এই ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর অভিমত। পাঁচটি সন্তানের জননী মৃণালিনীর এই মাতৃমূর্তি আরো সার্থক হয়ে উঠেছিল শান্তিনিকেতনে ঘর থেকে দূরে আসা শিশুগুলিকে আপন করে নেওয়ার মধ্যে।
