অপরদিকে রবীন্দ্রনাথের লেখা চিঠিতেও দেখা যাবে অন্তরঙ্গতার সুর। ভাই জ্যোতিদাদার ছবির এ্যালবাম ছাপার ব্যাপারে তিনিই উদ্যোক্তা এবং আগ্রহী। পরবর্তী জীবনে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি। তার পারিবারিক জীবনেও নেমে এসেছে। নিয়মিত দুর্বার দণ্ড। স্ত্রী ও পুত্রকন্যাদের মৃত্যু, শান্তিনিকেতনের সমস্যা নিয়ে বিব্রত কবি তখন নিজের কোন আত্মীয়স্বজনের সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে পারছেন না, জীবনবিরাগী জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তো সেখানে আরো দূরের মানুষ। সুতরাং কাদম্বরীর মৃত্যু দুই ভাইয়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেনি। এই মৃত্যুর মধ্যেই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ খুজেছেন কাদম্বরীর বিদেহী সত্তাকে আর রবীন্দ্রনাথ নতুন করে চিনেছেন নিজেকে। কাদম্বরীর দেহহীন সভা মিশে রইল তাঁর কবিতায়, গানে, ছবিতে।
০৫. কাদম্বরী যখন চলে গেলেন
জীবন থেমে থাকে না। কাদম্বরী যখন চলে গেলেন ফুলতলির ভবতারিণী তখন নাবালিকা। তাকে স্বর্ণ মৃণালিনী হবার আশীর্বাদ করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। তারপর ভবতারিণী একদিন হারিয়ে গেলেন মৃণালিনীর মধ্যে। যদিও এই পরিবর্তন কোন আলোড়ন আনল না বহির্জগতে। একটুও তরঙ্গ তুলল না প্রগতিশীলদের মনে। তবু মৃণালিনীকে সামান্যা বলতে পারা যায় না। মাত্র দশ বছর বয়সে একহাত ঘোমটা টেনে যে ভবতারিণী ঠাকুরবাড়িতে ঢুকেছিলেন সেদিন তিনি বুঝতেও পারেননি কোন্ বাড়িতে তাঁর বিয়ে হচ্ছে, কাকে পেলেন তিনি।
রবীন্দ্রনাথ বলতেন, আমার বিয়ের কোন গল্প নেই, বলতেন, আমার বিয়ে যা-তা করে হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিকে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বড় মাপে। দাসী, পাঠিয়ে মেয়ে পছন্দ করা পুরনো ব্যাপার তাই এবার একটা কমিটি তৈরি হল—জ্ঞানদানন্দিনী, কাদম্বরী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। তারা সদলবলে মেয়ে খুঁজতে গেলেন যশোরে—সেখান থেকেই ঠাকুরবাড়ির অধিকাংশ বৌ এসেছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনীর বাপের বাড়ি নরেন্দ্রপুরে গিয়ে উঠলেও দক্ষিণডিহি, চেঙ্গুটিয়া প্রভৃতি আশেপাশের সব গ্রামের বিবাহযোগ্যা মেয়েই দেখা হয়ে গেল কিন্তু বৌঠাকুরাণীদের মনের মতো সুন্দরী মেয়ে পাওয়া গেল না। তাই শেষকালে ঠাকুর স্টেটের কর্মচারী বেণীমাধব রায়ের বড় মেয়ে ভবতারিণীর সঙ্গেই বিয়ে ঠিক করা হল। অবশ্য দাদাদের মতো রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে যশোরে যাননি, জোড়াসাঁকোতেই বিয়ে হয়েছিল।
গুরুজনেরা যে সম্বন্ধ স্থির করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বিনা দ্বিধায় তাকেই বরণ করে নিয়েছিলেন। বন্ধুদের নিজের বিয়ের নিমন্ত্রণ লিপি পাঠিয়ে দিলেও এ বিয়েতে ঘটাপটা বিশেষ হয়নি। পারিবারিক বেনারসী দৌড়দার জমকালো শাল গায়ে দিয়ে তিনি বিয়ে করতে গেলেন নিজেদের বাড়ির পশ্চিম বারান্দা ঘুরে। বিয়ে করে আনলেন অজ্ঞ বালিকা ভবতারিণীকে। কবির বাসর ঘরের সুন্দর বিবরণ পাওয়া যাবে প্রত্যক্ষদর্শী হেমলতার লেখায় :
বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টমি আরম্ভ করলেন।…ভড় খেলার বদলে ভাঁড়গুলো উপুড় করে দিতে লাগলেন ধরে ধরে। তার ছোট কাকীমা ত্রিপুরাসুন্দরী বলে উঠলেন,
ও কি করিস রবি? এই বুঝি তোর ভাঁড় খেলা? ভাঁড়গুলো সব উল্টেপাল্টে দিচ্ছিস কেন?…
রবীন্দ্রনাথ বললেন, জানো না কাকীমা—সব যে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমি ভাঁড়গুলো উলটে দিচ্ছি।…
কাকীমা আবার বললেন, তুই একটা গান কর! তোর বাসরে আর কে গাইবে, তুই এমন গাইয়ে থাকতে? এরপর তার বাসর ঘরে একবার উঁকি দিলে দেখা যাবে সেখানে তিনি ওড়নাটক জড়সড় বধূর দিকে চেয়ে কৌতুক ভরে গান ধরেছেন আ মরি লাবণ্যময়ী…।
শোনা গেছে, কথায় প্রচণ্ড যন্তরে টান থাকায় ভবতারিণী প্রথম দিকে বেশ কিছুদিন কথাই বলতেন না। কবি কি এই অসম বিবাহকে খুশি মনে গ্রহণ করেছিলেন? তাই তো মনে হয়। ছোট ছোট ঘটনায় রয়েছে সুখের আমেজ। এরই মধ্যে শুরু হল ভবতারিণীর মৃণালিনী হয়ে ওঠার শিক্ষা। প্রথমে তিনি মহর্ষির নির্দেশে ঠাকুরবাড়ির আদব-কায়দা-বাচনভঙ্গির ঘরোয়া তালিম নিলেন নীপময়ীর কাছে। তারপর নীপময়ীর মেয়েদের সঙ্গে মৃণালিনীও পড়তে গেলেন লরেটো হাউসে। ফুলতলির ভবতারিণী হয়ত হারিয়ে গেলেন কিন্তু মৃণালিনী অতি আধুনিক হয়েও ওঠেননি কিংবা তার লরেটোর ইংরেজী শিক্ষা, পিয়ানো শিক্ষা, বাড়িতে হেমচন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছে সংস্কৃত শিক্ষা কোন সৃষ্টিমূলক কাজেও লাগেনি। কারণ তাঁর জীবন সংসারের সকলের সুখে নিমজ্জিত ছিল। চারপাশে অতি সংব এবং সোচ্চার চরিত্রগুলির পাশে তার নির্বাক ভূমিকাটি আমাদের কাছে তেমন স্পষ্ট নয়। অথচ তিনিও বাড়ির অন্যান্য মেয়ে-বৌয়েদের মতো অভিনয় করেছেন, রামায়ণ অনুবাদ করেছেন, রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে রূপকথা সংগ্রহ করেছেন, আমোদ-প্রমোদে-দুঃখে-শোকে সবার সবচেয়ে বেশি কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন।
রবীন্দ্রনাথের রাজা ও রাণীর প্রথম অভিনয়ে মৃণালিনী সেজেছিলেন নারায়ণী আর দেবদত্তের ভূমিকায় কে অভিনয় করেছিলেন জানেন? তার মেজ ভাশুর সত্যেন্দ্রনাথ। ঘরোয়া অভিনয় নয়, বেশ বড় মাপের আয়োজন হয়েছিল। যদিও প্রথমবার, তবু তার অনাড়ষ্ট সাবলীল অভিনয় ভালভাবেই উৎরেছিল। অথচ নবনাটকে অভিনয় করার জন্যে, একটি স্ত্রীভূমিকা গ্রহণ করে, অয় চৌধুরী আর কিছুতেই স্টেজে এসে দাঁড়াতে পারেননি। মৃণালিনীরও এরকম অবস্থা হতে পারত। বিশেষ করে ভাশুরের সঙ্গে অভিনয়! কিন্তু কোন বিঘ্ন ঘটেনি। তবু রবীন্দ্রনাথের নাটক কিংবা অভিনয়ে যোগ দেবার আগ্রহও মৃণালিনীর ছিল না, একথা স্বীকার করতেই হবে। সখিসমিতির দু-একটা অভিনয়ে কিংবা মায়ার খেলার ছোটখাট চরিত্রাভিনয়ে যোগ দেওয়া ছাড়া আর কিছুতেই তাকে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। আসলে গন-অভিনয়সাহিত্যচর্চার মধ্যে মৃণালিনীর প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্বামীর মহৎ আদর্শকে কাজে পরিণত করবার জন্যে তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের পাশে এসে দাঁড়ালেন, তখন শুধু তখনই তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রথম বার আমরা পেলুম। সামান্যার মধ্যে দেখা দিলেন অসামান্যা দেখা দিল সনাতন ভারতবর্ষের শাশ্বতী নারী। অবশ্য সে অনেক পরের কথা।
