এই ঘটনার কিছু আগে এবং পরে লেখা কয়েকটা কবিতার প্রতি এজন্যেই সমালোচকদের দৃষ্টি পড়েছিল। প্রথম কবিতাটির কবি অক্ষয় চৌধুরী। জগদীশ ভট্টাচার্যের মতে অন্যাসক্ত স্বামীর প্রতি নারীর অভিমানই অভিমানিনী নিঝরিণী এবং এই নিঝরিণী আর কেউ নন, জ্যোতিরিন্দ্র-পত্নী কাদম্বরী।
রাখিতে তাহার মন, প্রতিক্ষণে সযতন
হাসে হাসি কাঁদে কাঁদি—মন রেখে যাই,
মরমে মরমে ঢাকি তাহারি সম্মান রাখি,
নিজের নিজস্ব ভুলে তারেই ধেয়াই,
কিন্তু সে ত আমা পানে ফিরেও না চায়।
প্রভৃতি অংশ পড়ে অবশ্য সেবাপরায়ণ গুণবতী কাদম্বরীর কথাই মনে পড়ে। অপর দিকে রবীন্দ্রজীবনীকার তারকার আত্মহত্যায় দেখেছেন কাদম্বরীর প্রথম আত্মহনন চেষ্টার প্রতিচ্ছবি। কিশোর রবীন্দ্রনাথ জানতেন তার নতুন বৌঠানের মনোবেদনার কথা।
যদি কেহ শুধাইত
আমি জানি কী যে সে কহিত
যতদিন বেঁচে ছিল
আমি জানি কী তারে দহিত।…
তাই জ্যোতির্ময় জগৎ থেকে আঁধার জগতে তারকার স্বেচ্ছা নির্বাসন। কাদম্বরীর মৃত্যুর পরেও পুষ্পাঞ্জলিতে কবি লিখেছেন, যাহারা ভাল, যাহারা ভালবাসিতে পারে, যাহাদের হৃদয় আছে, সংসারে তাহাদের কিসের সুখ! কিছু না। কিছু না। তাহার যন্ত্রের মতো, বীণার মতো—তাহাদের প্রত্যেক শিরা সংসারের প্রতি আঘাতে বাজিয়া উঠিতেছে। সে গান সকলেই শুনে, শুনিয়া সকলেই। মুগ্ধ হয়—তাহাদের বিলাপধ্বনি রাগিনী হইয়া উঠে, শুনিয়া কেহ নিঃশ্বাস ফেলে না। বেশ বোঝা যায় এই বীণাটি আর কেউ নন, কাদম্বরী। কারণ তার পরেই আছে, পাষণ্ড নরাধম পাষাণ হৃদয় যে ইচ্ছা সেই ঝন্ঝন্ করিয়া চলিয়া যায়, আর মনে রাখে না। এ বীণাটিকে তাহারা দেবতার অনুগ্রহ বলিয়া মনে করে না—তাহারা আপনাকেই প্রভু বলিয়া জানে—এই জন্যে কখনো বা উপহাস করিয়া, কখনো বা অনাবশ্যক জ্ঞান করিয়া, এই সুমধুর সুকোমল পবিত্রতার উপরে তাহাদের কঠিন চরণের আঘাত করে।
আরো একজন কবি জ্যোতিরিন্দ্রকে শালীনতার আড়াল না রেখেই তীব্র ভৎসনা করেছিলেন। বিহারীলাল তার সাধের আসনে পতিব্রতা সতীকে বললেন আর এস না ধরায় কারণ :
পুরুষ কিস্তৃতমতি চেনে না তোমায়।
মন প্রাণ যৌবন
কি দিয়া পাইবে মন।
পশুর মতন এর নিতুই নতুন চায়।
সমসাময়িক ব্যক্তিদের সাক্ষ্য এবং কবিদের রচনা থেকে বোঝা যায়, কাদম্বরীর মৃত্যুর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের বিবাছকে জড়িয়ে যে অনুচিত কল্পনা মাঝে মাঝে প্রকাশিত হয় তার কোন ভিত্তি নেই। দেবর রবীন্দ্রনাথের প্রতি যদি কাদম্বরীর অনুচিত আসক্তি সত্যিই প্রকাশ পেত তাহলে তিনি সবার অন্তরে এই শ্রদ্ধার আসন পেতেন কি?
এই মৃত্যুকে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ কি ভাবে গ্রহণ করেছিলেন? এ প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক। কাদম্বরীর মৃত্যুর এক মাস পরেই তিনি জ্ঞানদানন্দিনী, সুরেন্দ্র, ইন্দিরা ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে সরোজিনী জাহাজে চেপে বেড়াতে গিয়েছিলেন। তাই আপাতদৃষ্টিতে মনে হয় তারকার আত্মহত্যার কিশোর কবির অনুমানই বোধহয় ঠিক, যেমন আছিল আগে তেমনি রয়েছে জ্যোতি। কিন্তু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আমরা বোধহয় শুধু একটি কথাই বলতে পারি, কাদম্বরীর জীবনাহুতি জ্যোতিরিন্দ্রকে একেবারে নিঃস্ব করে দিয়েছিল। তাই শুধু বাণিজ্যেই তাকে পর্যুদস্ত হতে হল তা নয়, তাকে পরাস্ত হতে হল জীবনের কাছেও। না হলে তার মতো প্রতিভাবান নাট্যকার কাদম্বরীর মৃত্যুর পর সব ছেড়ে দিয়ে শুধু অনুবাদ নিয়ে পড়ে থাকবেন কেন? জমাটি আর মজলিশ ছেড়ে কেন চলে যাবেন দূরে? এ যে নিজেকেই ভুলে থাকা। কাদম্বরীর মৃত্যুকালে তার বয়স মাত্র পঁয়ত্রিশ বছর কিন্তু তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেননি। কেন করেননি সে প্রশ্ন করা হলে তিনি শুধু বলেছিলেন, তাকে ভালবাসি।
যুক্তিবাদীরা হয়ত বলবেন অনুশোচনা। হয়ত সত্যিই তাই। নিজেকে সমাজ-সংসার থেকে স্বেচ্ছানির্বাসন দিয়ে তিনি তিল তিল করে শাস্তি দিয়েছেন নিজেকেই। শাস্তি দিয়েছেন কাদম্বরীর প্রতি অমনোেযোগী উদাসীন কর্তব্যচ্যুত স্বামীকে। দুঃখের বিষয় আমরা জ্যোতিরিন্দ্রনাথের মনোভাবের কথা একেবারেই জানতে পারি না। শোনা যায় কিছুদিনের জন্য মানসিক ভারসাম্যও হারিয়েছিলেন তিনি। আমার জীবনস্মৃতি কিংবা শেষ বয়সে লেখা:ডায়রি, কোথাও জ্যোতিরিন্দ্রের মনের কথা ধরা নেই। কোথাও নেই কাদম্বরীর কথা। জীবনস্মৃতিতেও দু-একটি সংবাদ ছাড়া কাদম্বরী সর্বত্রই আশ্চর্যভাবে অনুপস্থিত। অথচ ব্রাচিতে তার নিজের বাড়ি শান্তিধামের যে নিরাভরণ ঘরখানিতে তিনি থাকতেন তার দেয়ালে ছিল একটি মাত্র ছবি, তার নিজের হাতে আঁকা কাদম্বরীর পেন্সিল স্কেচ। সুতরাং এই ভুলে থাকা নয় সে তো ভোলা। জ্যোতিরিন্দ্র সেই নির্জন বিষণ্ণ শান্তিধামের নিরালা অবসরে হয়ত বারবার অনুভব করতে চেয়েছেন সেই অসামান্যাকে, যার প্রেরণায় রবীন্দ্রনাথের কবি-মন উজ্জীবিত হয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি যদিও সেটি ঠিক প্রমীলা সংবাদ নয়। সাম্প্রতিক কালের কোন কোন সমালোচক ভাবতে শুরু করেছেন যে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক কোন এক অজ্ঞাত কারণে ছিন্ন হয়ে যায়। এর কারণ হিসেবেও তারা নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের ক্রমবর্ধমান খ্যাতি এবং নতুন বৌঠানের আত্মহত্যা ঘটনাটিকে। কিন্তু দুটি সম্ভাবনাই অসার মনে হয়, কারণ রবীন্দ্রের প্রতি জ্যোতিরিন্দ্র কোনদিন ঈর্ষান্বিত হবেন ভাবা যায় না। বিশেষ করে পরবর্তীকালে যখন তিনি জীবন থেকে সরে গিয়েছেন। তাছাড়া রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তার যোগ স্ত্রীর মৃত্যুর পরে তো ছিলই, অন্য সময়েও বিচ্ছিন্ন হয়নি। সরোজিনী জাহাজে ভ্রমণ করা ছাড়াও তারা দুই ভাই বহুদিন সত্যেন্দ্রনাথের বাড়িতে পাশাপাশি ঘরে বাস করেছেন। তাঁর শেষ বয়সের ডায়রিতেও দেখা যাবে দু-তিনবার রবীন্দ্র প্রসঙ্গ আছে। রবির বক্তৃতা, দাড়ি রাখা, গান কিছুই তার চোখ এড়ায়নি। এমন কি ছবিও এঁকেছেন। তবে এ সময় জ্যোতিরিন্দ্র সব কিছু থেকেই অনেক দূরে সরে যাচ্ছিলেন।
