নিজের হাতে জীবনদীপটি নিবিয়ে দিয়ে অন্তরালে চলে না গেলে তিনি হয়ত ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরের রসের উৎসটিকে আরো কিছুদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারতেন। তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গেই জোড়াসাঁকোর বাড়ি থেকে সোনালি দিনগুলি শীতের পাখির মতো বিদায় নিতে শুরু করল। এরপরে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সম্মিলিত ভূমিকার চেয়ে একক ভূমিকাই বড় হয়ে উঠেছে। কিন্তু কেন চলে গেলেন কাদম্বরী? কেন? কেন? এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর আজও পাওয়া যায়নি।
রবীন্দ্রনাথের বিবাহের মাত্র কয়েক মাস পরেই কাদম্বরীর মৃত্যু হয়। ঘটনাটি আকস্মিক। তবে একেবারে অভাবনীয় নয় হয়ত। পূর্কেও তিনি একবার। আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এই সুরসিকা, রুচিসম্পন্না, প্রতিভাময়ী নারীর জীবনেও শান্তির অভাব ছিল। রবীন্দ্র জীবনীকারের ভাষায় কাদম্বরী ছিলেন যেমন অভিমানিনী, তেমনি সেন্টিমেন্টাল এবং আরো বলিব ইনট্রোভার্ট, স্কিজোফ্রেনিক। তাঁর মতের সঙ্গে সবাই একমত না হলেও কাদম্বরীকে অভিমানিনী আরো অনেকেই বলেছেন। তাঁর নিঃসন্তান-জীবনের বেদনা অভিমানকে আরো তীব্র করে তুলেছিল। তাই প্রাণের গভীরে লুকিয়ে থাকা দুঃখের ফধারা হঠাৎ এক আঘাতে নিজেকে হারিয়ে বাঁধভাঙা বন্যার মতো নেমে এল দুকূল ছাপিয়ে।
পরবর্তীকালে এ নিয়ে জল্পনার শেষ নেই। অনেকেই অনেক রকম গল্প রচনা করে ফেলেছেন। তার মধ্যে সবচেয়ে প্রচলিত কাহিনীটি রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। বিশেষ করে তার বিবাহ এবং কাদম্বরীর মৃত্যুর মধ্যে একটি যোগসূত্র কল্পনা করে নেওয়া যখন সত্যিই খুব কষ্টকর নয়। কারণ রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীকে কাদম্বরী কি ভাবে গ্রহণ করেছিলেন তা কেউ জানে না। কাদম্বরীর সঙ্গে মৃণালিনীর কথাবার্তা বা দেখা-সাক্ষাতের কোন বিবরণ পাওয়া যায়নি। ভবতারিণীকে মৃণালিনী করে তোলার ভার কাদম্বরী না পেয়ে নীপময়ী পেলেন কেন তাও অজানা। রবীন্দ্রনাথের বিবাহের খুঁটিনাটি বিবরণ পাওয়া গেছে। হেমলতার প্রবন্ধে, সেখানেও কাদম্বরী আশ্চর্যভাবে অনুপস্থিত। মেয়ে দেখার সময় যার এত উৎসাহ ছিল, তিনি চুপ করে গেলেন কেন? প্রবীন্দ্রনাথের জন্যে পাত্রী নির্বাচনের সময় কি তার সঙ্গে মতান্তর হয়েছিল অন্য কারুর? প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় এজন্যই বোধহয় একবার মন্তব্য করেন কাদম্বরীর আকস্মিক মৃত্যুর কারণ হচ্ছে, মহিলাদের মধ্যে দ্বন্দ্বের পরিণাম। তবে এই মহিলা কবিপত্নী নন, তিনি তখন বালিকামাত্র। সম্ভবত জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গেই তার মতান্তর হয়। মনের গভীরে এর হয়ত অন্য কারণ ছিল। তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটল একটা সামান্য ঘটনা উপলক্ষ্য করে। তাই সমসাময়িক কালে কেউ কেউ এ ঘটনার জন্য দায়ী করেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথকে।
কাদম্বরীর মৃত্যু সংক্রান্ত যে সব খবর পাওয়া গেছে তাতে নিশ্চিত উত্তর কিছু পাওয়া যায় না। ইন্দিরা আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে লিখেছেন, জ্যোতিকাকামশাই প্রায়ই বাড়ি ফিরতেন না। তার প্রধান আড্ডা ছিল বির্জিতলাওয়ে আমাদের বাড়ি। আমার মা জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে ওঁর খুব ভাব ছিল। এরই মধ্যে একদিন অভিমানিনী কাদম্বরী স্বামীকে বলেছিলেন তাড়াতাড়ি ফিরতে। গানে গানে আডডায় আড়ায় সেদিন এত দেরি হয়ে গেল যে জ্যোতিরিন্দ্রের বাড়ি ফেরাই হল না। প্রচণ্ড অভিমানে কাদম্বরী ধ্বংসের পথই বেছে নিলেন। বাড়িতে কাপড় নিয়ে আসত বিশু বা বিশ্বেশ্বরী তাতিনী। সেই বিশুকে দিয়ে লুকিয়ে আফিম আনিয়ে, সেই আফিম খেয়েই কাদম্বরী মর্ত জীবনের মায়া কাঁটালেন।
আবার বর্ণকুমারীকে প্রশ্ন করে অমল হোম শুনেছিলেন, জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জোব্বার পকেট থেকে কাদম্বরী পেয়েছিলেন তখনকার দিনের একজন বিখ্যাত অভিনেত্রীর মতান্তরে নটী বিনোদিনীর কয়েকখানি চিঠি। চিঠিগুলি উভয়ের অন্তরঙ্গতার পরিচায়ক। এই চিঠিগুলি পেয়ে কাদম্বরী কয়েকদিন বিমনা হয়ে কাঁটান তারপর আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর আগে তিনি লিখে গিয়েছিলেন যে ঐ চিঠিগুলিই তাঁর আত্মহত্যার কারণ। মহর্ষির আদেশে সেসব চিঠি ও তাঁর স্বীকারোক্তি নষ্ট করে ফেলা হয়। কাজী আবদুল ওদুদ লিখেছেন যে, তিনি ঠাকুরবাড়ির একজন খ্যাতনামা ব্যক্তির মুখে শুনেছেন, যে মহিলার সঙ্গে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের অন্তরঙ্গত জন্মেছিল তিনি অভিনেত্রী নন তবে সেই অন্তরঙ্গতার জন্য কাদম্বরী নাকি আগেও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।
সমসাময়িক কালের অন্যান্য কবিদের কোন কোন লেখা থেকে মনে হয় তারাও জ্যোতিরিন্দ্রনাথকেই দায়ী করেছেন। নিঃসন্তান স্ত্রীর সঙ্গহীন-শূন্যতা ভরিয়ে তোলার জন্যে স্বামীর যতটা মনোযোগী হওয়া উচিত জ্যোতিরিন্দ্রনাথ তা ছিলেন না। হয়ত এ ব্যাপারে তিনি খানিকটা উদাসীন ছিলেন। নিত্য নতুন সৃষ্টির আনন্দে মেতে ওঠা, হঠাৎ একেকটা খেয়ালের বশবর্তী হয়ে চলা, সত্যেন্দ্র-জ্ঞানদানন্দিনীর সান্নিধ্য, তাদের পুত্র-কন্যার সাহচর্য তাঁকে কাদম্বরীর কাছ থেকে দূরে সরিয়ে এনেছিল। তৎকালীন রুচি ও রীতির পরিপ্রেক্ষিতে জ্যোতিরিন্দ্রর পক্ষে থিয়েটারের অভিনেত্রী বা নটীদের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনাও বিচিত্র নয়। সেকালে একান্নবর্তী সংসারে বন্ধ্যা নারী ছিলেন উপেক্ষার পাত্রী। তাঁর বিশেষ আদর ছিল না। কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির বৃহৎ সংসারেও তার যথার্থ স্থানটি কোনদিন পাননি। যাই হোক, সব মিলে কাদম্বরীর মনে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে। সযত্ন স্বামীসেবা, গৃহ পরিচর্যা, সাহিত্যশিল্প নিয়ে তিনি নিজেকে ভুলিয়ে রাখলেও শেষরক্ষা করতে পারেননি। সত্যেন্দ্রজ্ঞানদানন্দিনীর কলকাতায় প্রত্যাবর্তন ও বির্জিতলাও বাস এবং রবীন্দ্রনাথের বিবাহ দুটি ঘটনায় তার নিঃসঙ্গতা প্রচণ্ড বৃদ্ধি পায়। সেই অবস্থায় স্বামীর অবহেলায় কাদম্বরী মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন ও আত্মহননের পথ বেছে নেন। এর পটভূমিতে ইন্দিরা-কথিত বা বর্ণকুমারী-কথিত যে কোন একটি বা দুটি কাহিনীই থাকতে পারে তবে তৃতীয় কোন অনুমানের অবকাশ বোধহয় নেই।
