প্রথম বা দ্বিতীয় যাই হোক না কেন এমন কর্ম আর করব না মঞ্চসফল নাটক। এই নাটকে বাড়ির অনেকেই সানন্দে যোগ দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ অলীক বাবু, দ্বিজেন্দ্রনাথ সত্যসন্ধ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ চীনেম্যান, অলীকের বন্ধু অরুণেন্দ্রনাথ, গদাধর শরৎকুমারীর স্বামী যদুনাথ মুখোপাধ্যায়। পিসনি বা প্রসন্নাসীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলের মহর্ষির ছোট মেয়ে বর্ণকুমারী।
রবীন্দ্রনাথের ছোট দিদি বর্ণকুমারী সম্বন্ধে আমরা খুব কম জানি। অথচ তিনি রবীন্দ্রনাথের পরেও অনেকদিন জীবিত ছিলেন। শিল্প বা সাহিত্যের দিকে নজর দিতে না পারলেও বর্ণকুমারী ভাল অভিনয়ের নজির সৃষ্ট করে গেছেন প্রসন্ন চরিত্রাভিনয়ে। বালিকা ইন্দিরার মনে সে অভিনয় দাগ কাটে, তিনি প্রসন্ন সেজে দাসীদের অতি স্বাভাবিক আচরণ অভিনয় করে দেখালেন একদিন। অন্যান্য বড় নাটকে তাকে অংশগ্রহণ করতে দেখা না গেলেও অভিনয়ের প্রতি তার আকর্ষণ ছিল। বহু বার নাটকে রিহার্সালে তিনি উপদেষ্টার ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার নিজের অভিনয়ের কথা বড় একটা শোনা যায়নি। বর্ণকুমারীর বিয়ে হয়েছিল কবি-সাহিত্যিক রাজকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের ছোটভাই সতীশচন্দ্রের সঙ্গে। চিকিৎসক হিসেবে তিনি দেশ-বিদেশে খ্যাতি লাভ করেন। কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজের (আর. জি. কর) অন্যতম প্রতিষ্ঠাতারূপে তিনি সর্বজন-পরিচিত। জার্মান ভাষাতেও তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল কিন্তু দুরারোগ্য ক্যানসারে তার অকাল মৃত্যু হয়।
বর্ণকুমারী শরৎকুমারীর মতোই অতিমাত্রায় সাংসারিক ছিলেন। খুব ভাল রাখতে পারতেন, সেলাই করতেন, আবার গানও জানতেন। ভালবাসতেন উপাসনা সেরে দেবেন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীত গাইতে। কিছু কিছু লিখেছেনও কিন্তু লজ্জায় সংকোচে নিজের নামে প্রকাশ করতে পারেননি। তাই আজ পুরনো ভারতীর পাতা থেকে তার বেনামী লেখাগুলো খুঁজে বার করা খুবই কঠিন। খুব বৃদ্ধ বয়সেও ভাইফোঁটার দিন জোড়াসাঁকোয় এসে কবিকে ফোঁটা দিয়ে যেতেন বর্ণকুমারী। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের যোগাযোগ অটুট ছিল।
আবার ফিরে আসি নাটকের কথায়। এই নাটকের সবচেয়ে দুরূহ ভূমিকাটিই হচ্ছে হেমাঙ্গিনীর। বঙ্কিম-উপন্যাস পড়া উনিশ শতকের রোম্যান্টিক নায়িকা এমন কর্ম আর করব না-র হেমাঙ্গিনী। আবেগগর্ভ আদিরসকে পরিহাসতরল হাস্যরসে পরিণত করে আজও সে অমর হয়ে আছে। অনেকেই মনে করেন এই ভূমিকাভিনেত্রী ছিলেন কাদম্বরী। অথচ ইন্দিরার স্মৃতিতে অলীকবাবুর যে অভিনয়টি স্মরণীয় হয়ে আছে সেটিতে হেমাঙ্গিনী সেজেছিলেন অক্ষয় চৌধুরীর স্ত্রী শরৎকুমারী। রবীন্দ্রজীবনীকার প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ও ইন্দিরাকে অনুসরণ করে শরৎকুমারীকেই হেমাঙ্গিনীর ভূমিকাভিনেত্রী বলেছেন। অপরদিকে সজনীকান্ত দাস সরাসরি কবিকে প্রশ্ন করেছিলেন, হে কে? প্রশ্ন করার কারণ, কবি ভগ্নহৃদয় গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হবার সময় সেটি উৎসর্গ করেন শ্ৰীমতী হে—কে। কবি সজনীকান্তকে পাল্টা প্রশ্ন করেন, তোমার কি মনে হয়? সজনীকান্ত বলেছিলেন, হেমাঙ্গিনী। অলীকবাবুতে আপনি অলীক ও কাদম্বরীদেবী হেমাঙ্গিনী সাজিয়াছিলেন। সেই নামের আড়ালের সুযোগ। আপনি গ্রহণ করিয়াছিলেন।
কবি স্বীকার করেন, ইহাই সত্য অন্য সব অনুমান মিথ্যা।
এই শ্ৰীমতী হে নিয়েও কম সংশয় নেই। ইন্দিরা মনে করেন হের পুরো নাম হেকে টি, গ্রীক পুরাণের ত্রিমুণ্ড দেবী, সংক্ষেপে কাদম্বরীর ডাকনাম। তবে ইন্দিরা দেখেননি বলেই যে কাদম্বরী হেমাঙ্গিনীর ভূমিকায় কখনো অভিনয় করেননি তা মনে হয় না। ১৮৭৭ সালে যদি প্রথম অভিনয় হয়ে থাকে তখন ইন্দিরা এদেশে ছিলেন না, পরেও তিনি যে সব সময় ঠাকুরবাড়িতে থাকতেন তা নয়। এসব অভিনয়ে আমরা জ্ঞানদানন্দিনীকেও অভিনয় করতে দেখিনি। অলীকবাবুর অভিনয় পরেও অনেকবার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের প্রযোজনায় পরবর্তীকালের অভিনয়ে কবি গল্পটিকে ঈষৎ বদলে হেমাঙ্গিনীকে সারাক্ষণ নেপথ্যে রেখেছিলেন! অবন ঠাকুর কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন, তখন মেয়েই বা কই এ্যাকটিং করবার। অসম্ভব নয়। তবু এক একবার মনে হয় সত্যিই কি শুধু অভিনেত্রীর অভাব? সে অভাব কখনও পূরণ হয়নি? না, কাদম্বরীর সমকক্ষ মনে হয়নি কাউকে? যাক, অলীক কষ্টকল্পনা করে তো লাভ নেই।
হেমাঙ্গিনীর ভূমিকা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও বসন্ত-উৎসব ও মানময়ীতে কাদম্বরীর ভূমিকা স্পষ্ট। এ দুটি অভিনয়ে কাদম্বরী শুধু ভাল অভিনয়ই করেননি, ভাল গানও গেয়েছিলেন। অবশ্য সঙ্গীতে কাদম্বরীর অধিকার ছিল। বিখ্যাত সঙ্গীত জগন্মোহন গঙ্গোপাধ্যায়ের পৌত্রী তিনি, গান তার রক্তে। তিনি আসার সঙ্গে সঙ্গে তিন তলার ঘরে শুধু পিয়ানো আসেনি, জ্যোতিরিন্দ্র ও রবীন্দ্রের অনুশীলনও শুরু হয়ে গেছে। তাঁর নন্দনকাননের সান্ধ্য-সভাতেও বসত গানের আসর। এসব দেখে মনে হয় অভিনয়, গান, সাহিত্য নিয়ে কাদম্বরী সবাইকে একেবারে মাতিয়ে রেখেছিলেন। ভারতী পত্রিকার কথাই ধরা যাক না। দ্বিজেন্দ্রনাথ সম্পাদক, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দেখাশোনা করতেন, রবীন্দ্রনাথ লিখতেন। কাদম্বরীর কাজ কি ছিল? শরৎকুমারীর ভাষায়, তিনি ছিলেন ফুলের তোড়ার বাঁধন। সবাইকে একসঙ্গে তিনিই বেঁধে রেখেছিলেন, সবার অলক্ষ্যে। বাঁধন যেদিন ছিড়ল সেদিন শুধু সেদিনই বোঝা গেল কাদম্বরী কি ছিলেন।
