কাদম্বরী শুধু ঘোড়ায় চড়ে বেড়াতেই বেরিয়েছিলেন তা নয়, সাধারণী নারীদের চোখে এঁকে দিয়েছিলেন এক দুঃসহ স্পধার মায়াঞ্জন, অনেকের বুকে তিনি জাগিয়েছিলেন দুঃসাহস। মেয়েরা দেখল হালকা-হাওয়ায় উড়ে আসা। বুদ্বুদের ফেনার মতো পশ্চিমীধারায় মানুষ হওয়া মেয়ে নয়, পথে ঘোড়ায় চড়ে চলেছেন তাদেরই মতো এক গৃহবধূ। বাস্তবিকই মেয়েলি কাজে কাদম্বরীর সুতীব্র আগ্রহ ছিল। সুপুরি কাটতেন নিয়মিত। প্রতিদিনের তরকারি কাঁটার আসরে তিনি যেমন উপস্থিত থাকতেন তেমনি দেখাশোনা করতেন বাড়ির ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের। কারুর জ্বর হলে আর রক্ষে নেই, কাদম্বরী গিয়ে বসতেন তার শিয়রে। সদ্য মাতৃহারা বালক দেবরটিকেও তিনি পরম স্নেহে কাছে টেনে নিয়েছিলেন অথচ কতই বা বয়স তার? রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মাত্র এক বছরের বড়।
কাদম্বরীর প্রধান পরিচয় তিনি অসাধারণ সাহিত্যপ্রেমিকা ছিলেন। বাংলা বই তিনি পড়তেন শুধু সময় কাঁটাবার জন্য নয়, সত্যিই উপভোগ করতেন। পড়তেন দ্বিজেন্দ্রনাথের স্বপ্নপ্রয়াণ, বঙ্কিমচন্দ্রের বিষবৃক্ষ। দুপুর বেলায় রবীন্দ্রনাথও পড়ে শোনাতেন তাকে। হাতপাখা নিয়ে হাওয়া করতেন কাদম্বরী, কারণ আপন মনে পড়ার চেয়ে শুনতেই বেশি ভাল লাগত তার। ভারতী পত্রিকা নিয়েও তার ভাবনা ছিল। ভারতীর ছাপার হরফে তাঁর নাম নেই সত্যি কিন্তু তিনিই ছিলেন ঐ পত্রিকার প্রাণ। সে কথা বোঝা গিয়েছিল তার মৃত্যুর পরে। পূর্বোক্ত নন্দন কাননে সন্ধ্যেবেলা বসত গান ও সাহিত-পাঠের আসর। আসরে যোগ দিতেন বাড়ির অনেকে, বাইরে থেকে আসতেন অক্ষয়। চৌধুরী ও তার স্ত্রী শরৎকুমারী লাহোরিণী, জানকীনাথও থাকতেন সেখানে, আর মাঝে মাঝে আসতেন কবি বিহারীলাল! জ্যোতিরিন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ ও স্বর্ণকুমারী ছিলেন এ সভার স্থায়ী সভ্য। কাদম্বরী বিহারীলালের কবিতা পড়তে খুব ভালবাসতেন ও মাঝে মাঝে তাকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়াতেন। শুধু তাই নধু, নিজের হাতে একটা আসন বুনে উপহার দিয়েছিলেন। আসনের ওপর, প্রশ্নচ্ছলে কার্পেটের অক্ষরে লেখা ছিল সারদামঙ্গল কাব্যেরই কয়েকটা লাইন। কবি সে উত্তর দেবার জন্যে আর একটা কাব্য যখন রচনা করেন,
তখন কাদম্বরী ইহলোকে নেই। বিহারীলাল তাঁর উপহারকে স্মরণ করে। কাব্যের নাম দিয়েছিলেন সাধের আসন। আসনদাত্রী দেবীর উদ্দেশে লিখেছিলেন?
তোমার সে আসনখানি
আদরে আদরে আনি,
রেখেছি যতন করে চিরদিন রাখিব;
এ জীবনে আমি আর
তোমার সে সদাচার,
সেই স্নেহমাখা মুখ পাশরিতে নারিব।
ছাদের বাগানে সন্ধ্যেবেলা বসত পরিপাটি গানের আসর। মাদুরের ওপর তাকিয়া, রূপোর রেকাবে ভিজে রুমালের ওপর বেলফুলের গোড়ের মালা, এক গ্লাস বরফজল, বাটা ভরতি হুঁচি পান সাজানো থাকত। কাদম্বরী গা ধুয়ে চুল বেঁধে তৈরি হয়ে বসতেন সেখানে, জ্যোতিরিন্দ্র বাজাতেন বেহালা, রবীন্দ্র ধরতেন চড়া সুরের গান, সে গান সূর্য ডোবা আকাশে ছাদে ছাদে ছড়িয়ে যেত। হু হু করে দক্ষিণে বাতাস উঠত দূর সমুদ্র থেকে, তারায় তারায় যেত আকাশ ভরে। কিশোর রবীন্দ্রনাথের রোম্যান্টিক সৌন্দর্যচেতনাকে জাগাবার জন্য এই পরিবেশ এই সৌন্দর্যদৃষ্টি ও কল্পনার একান্ত প্রয়োজন ছিল।
পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর নতুন বৌঠান কাদম্বরীকে নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। মাঝে মাঝে অনুচিত সন্দেহ এসে যে কাঁটা বেঁধায়নি তাও নয়। বিশেষতঃ রবীন্দ্রনাথের বিবাহের কয়েকমাসের মধ্যে কাদম্বরীর মৃত্যু সংশয় সৃষ্টি করেছিল। রবীন্দ্রমানস গঠনে এই অসামান্যা নারীর দান চিরস্মরণীয়। তার কবি হয়ে ওঠার কথা পড়ে মনে হয় তাঁর আন্তরিক চেষ্টার মূলে ছিলেন কাদম্বরী। বৌদিদির চোখে নিজেকে যত দামী করে তোলার চেষ্টা চলছিল, কাদম্বরী মুখ টিপে হেসে ততই অগ্রাহ্য করে গেছেন দেবরটিকে :
রবি সবচেয়ে কালো, দেখতে একেবারেই ভালো নয়, গলা যেন কী রকম। ও কোনোদিন গাইতে পারবে না, ওর চেয়ে সত্য ভালো গায়।
বলতেন :
কোনোকালে বিহারী চক্রবর্তীর মতো লিখতে পারবে না। রবীন্দ্রনাথের তখন শুধুই মনে হত কী করে এমন হব যে আর কোন দোষ তিনি খুঁজে পাবেন না। বুঝতেন না, সেই সাধনাই করছেন কাদম্বরী, যাতে কেউ কোনদিন রবির দোষ খুঁজে না পায়। যখন একথাটা বোঝার মতো করে বুঝলেন তখন কাদম্বরী হারিয়ে গেছেন চির অন্ধকারে, প্রতিভার প্রদীপে তেল-সলতে যোগানো সারা, আলো জ্বালার কাজ শেষ। কবির কথায় বারবার এসেছে কাদম্বরীর কথা, খুব ভালবাসতুম,তাকে। তিনিও আমায় খুব ভালবাসতেন। এই ভালবাসায় নতুন বৌঠান বাঙালী মেয়েদের সঙ্গে আমার প্রাণের তার বেঁধে দিয়ে গেছেন। তাই তো সারাজীবন ধরে চলে তার অনুসন্ধান :
নয়ন সম্মুখে তুমি নাই
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।
আমরা রবীন্দ্রকাব্য আলোচনায় যাব না, তবে তার বহু কবিতায় বহু গানে মিশে রয়েছেন কাদম্বরী, ছবিতে ধরা পড়েছে তার চোখের আভাস। সব মিলে কাদম্বরী আজ আমাদের কাছে বাস্তবে-কল্পনায় মেশা একটা অপরূপ চরিত্র হয়ে আছেন। কবি নারীকে বলেছেন, অর্ধেক মানবী তুমি অর্ধেক কল্পনা— কাদম্বরীও তাই। রোম্যান্টিক স্বপ্ন-সঞ্চারিণী নতুন বৌঠানের মধ্যে হারিয়ে গেছেন মানবী কাদম্বরী।
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে কাদম্বরীর আরেকটি ভূমিকাও স্মরণীয়। তিনি ছিলেন সুঅভিনেত্রী এবং সুগায়িকা। নাট্যরসিক জ্যোতিরিন্দ্রর মন আরো উজ্জীবিত হয়ে উঠেছিল গুণবতী স্ত্রীকে পেয়ে। বাইরের জোড়াসাঁকো-থিয়েটার বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি নিজেই লিখতে শুরু করলেন নাটক-প্রহসন-গীতিনাট্য, অভিনয়ের ব্যবস্থাও হল। একেবারে ঘরোয়া পরিবেশে, বাড়ির উঠোনে। বাড়ির মধ্যে অভিনয়ে মেয়েদের যোগ দিতে বাধা কি? কাদম্বরীকে কেউ বাধা দিলেন না। তিনি এসে দাঁড়ালেন পাদপ্রদীপের আলোয়। প্রথম অভিনয় স্বর্ণকুমারীর বসন্ত উৎসব, না কি জ্যোতিরিন্দ্রর অলীকবাবু? প্রথমে যার নাম ছিল এমন কর্ম আর করব না। রচনার সময় হিসেবে এমন কর্ম আর করব না পূর্ববর্তী। সুতরাং বসন্ত-উৎসবের চেয়ে তার দাবি বেশি। যদি ধরে নেওয়া যায় এ প্রহসন লেখার পরই অভিনয়ের ব্যবস্থা হয় এবং রবীন্দ্রনাথ নায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে প্রহসনটি অভিনীত হয়েছে রবীন্দ্রের প্রথম য়ুরোপযাত্রার আগে এবং এটাই ছিল কাদম্ববীর প্রথম অভিনয়।
