মনে হয়, সে আঙিনায় সেই পূর্বের মতো হাসিয়া খেলিয়া বেড়ায়। পূর্বাকাশে ভোরের আলোতে তাহারই মুখখানি জ্বলজ্বল করে। সূর্যাস্তের সঙ্গে সঙ্গে সেও যেন ঘুমের অচেতনে আমার কোলে ঢলিয়া পড়ে। আমার বলুকে আমি হারাইয়াও হারাই নাই বরং তাহাকে আরও নিকটে পাইয়াছি বলিয়া মনে হয়। এক সে আমার বহু হইয়া অহরহ আমার সম্মুখে ঘুরিয়া ঘুরিয়া বেড়াইতেছে, আজ সে অনন্তরূপে অনন্ত বাহু মেলিয়া আমার বুকে ঝাপাইয়া পড়িয়াছে।
ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরকে সার্থক করে তোলার জন্যে প্রফুল্লমঙ্গীর এই ঐশ্বরিক উপলব্ধিরও প্রয়োজন ছিল। নইলে মনে হতে পারত ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরিকারা নানা-কেতায় পোষাক পরে, বেড়াতে বেরিয়ে, ঘোড়ায় চেপে, চুল বেঁধে আর রান্না করে বাঙালী মেয়েদের শুধু বহির্মুখী করেই তুলেছেন। কিন্তু তা তো নয়। এ বাড়িতে প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের মহাসঙ্গম ঘটেছে। বহিমু খী ধারার সঙ্গে মিশেছে অন্তর্মুখী সাধনার ধারা। প্রফুল্লময়ী সর্বপ্রথম শোকসাগর মন্থন করে সেই অমৃতের সন্ধান এনে দিলেন।
কোন কিছুই কারুর জন্যে থেমে থাকে না। বিশাল ঠাকুরবাড়ির এক কোণে যখন প্রফুল্লময়ীর জীবনে দুর্ভাগ্যের কালোছায়া নেমে আসছে ঠিক তখনই বাড়ির আরেক প্রান্তে বেজে উঠছে খুশির সানাই বারোয়া সুরে। চতুর্দোলায় চড়ে আর একটি ছোট্ট মেয়ে গোধূলি লগ্নের সিঁদুরি রঙে-রাঙ্গা চেলি পরে প্রবেশ করলেন ঠাকুরবাড়িতে। তার কঁচা শামলা হাতে সরু সোনার চুড়ি, গলায় মোতির মালা সোনার চরণচক্র পয়ে। বাড়ির ছোট্ট ছেলেটির হঠাৎ মনে হল এতদিন যে রাজার বাড়ি খুঁজে খুঁজে সে হয়রাণ হয়েছে, খুজে পায়নি, সেই বাড়িটিরই বুঝি খবর নিয়ে এল এই রূপকথার রাজকন্যে, তার নতুন বৌঠান। কল্পনার দৌড় গেল বেড়ে।
কাদম্বরী যশোরের সেই পরিচিত রায়বংশের মেয়ে নন, তিনি কলকাতাবাসিনী। তার বাবা শ্যামলাল গাঙ্গুলির সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগাযোগ অনেকদিন ধরেই ছিল। কাদম্বরীর পিতামহ জগন্মোহনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল দ্বারকানাথের মামাতো বোন শিরোমণির। কাজেই এ বিবাহে মহর্ষির আপত্তি ছিল না। বাধা দিয়েছিলেন তার মেজ ছেলে সত্যেন্দ্র। তিনি তখন বিলেত থেকে ফিরে এসেছেন, চোখে কত রঙ্গিন স্বপ্ন! ছোট ভাই জ্যোতিরিন্দ্রর বধূ রূপে তিনি মনে মনে মনোনীত করে রেখেছেন ডাঃ সূর্যকুমার গুডিব চক্রবর্তীর মেয়েকে। শিক্ষিত মেয়ের সঙ্গে ভাইয়ের বিয়ে হবে, তার বদলে কিনা বাল্যবিবাহ! আট বছরের একটি খুকি? এরপরে কি জ্যোতি বিলেত যাবে? যদি যায় তো ফিরে এসে কি এই ছোট্ট মেয়েটিকে জীবনসঙ্গিনীরূপে গ্রহণ করতে পারবে? শেষে নষ্ট হয়ে যাবে না তো দুটি অমূল্য জীবন! কিছুতেই কিছু হল না। একে পিরালী তায় ব্রাহ্ম ঠাকুরবাড়ির অবস্থা তখন একঘরে হওয়ার মতো, তাই জ্যোতিরিন্দ্রের জন্যে যে মেয়ে পাওয়া গেছে তার সঙ্গেই বিয়ে হল। সত্যেন্ত্রের সমস্ত আশংকা মিথ্যে করে দিয়ে কাদম্বরী ঠাকুরবাড়ির যোগ্যতম বধূ হয়ে উঠলেন।
তিনি এ বাড়িতে এসে তিন তলার ছাদের ওপর গড়ে তুললেন নন্দন কানন। বসানো হল পিল্পের ওপর সারি সারি লম্বা পাম গাছ, আশেপাশে চামেলি, গন্ধরাজ, রজনীগন্ধা, করবী, দোলনচাঁপা। এল নানারকম পাখি। দেখতে দেখতে বাড়িটার চেহারা যেন বদলে গেল। গৃহসজ্জার দিকে নববধূর প্রথম থেকেই সতর্ক দৃষ্টি ছিল। কিশোর রবীন্দ্রনাথের সৌন্দর্যবোধকে সবচেয়ে উঁচু তারে বেঁধে দিয়েছিলেন এই কাদম্বরী, সেই বাধন কোনদিন শিথিল হয়নি।
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের যা কিছু দান, তার সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন কাদম্বরী। অথচ, খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, নিজে তিনি কোন কিছুতেই অংশ গ্রহণ করতেন না। শুধু অপরের প্রাণে প্রেরণার প্রদীপটিকে উজ্জীবিত করে ভোলাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। আসলে আমরা যাকে বলি রোম্যান্টিক সৌন্দর্যবোধ, কাদম্বরীর সেটি পুরোমাত্রায় ছিল। ঠাকুরবাড়িতে এসে অনুকূল পরিবেশ হয়ত বৃদ্ধি পেয়েছিল কিন্তু এই চেতনা ছিল তার মানস-গভীরে। তাই বাইরে থেকে এসে এ বাড়ির প্রাণপুরুষকে জাগিয়ে দিতে তিনি যতখানি সফল হয়েছেন আর কেউ তা পারেননি।
কাদম্বরীকে নিয়ে এত বেশি আলোচনা হয়েছে যে তার সম্বন্ধে নতুন করে কিছু বলতে চেষ্টা করা বাহুল্যমাত্র। অবশ্য এই আলোচনা-সমালোচনার কারণ রবীন্দ্রনাথ। কিশোর রবীন্দ্রনাথের মনোগঠনে কাদম্বরীর দান অসামান্য। তার অকালমৃত্যু রবীন্দ্রমানসে গভীর ছাপ রেখে যায়। একথা কবি নিজেই অসংখ্য কবিতা ও গানের মধ্যে প্রকাশ করেছেন। সুতরাং যারা তাদের নিয়ে অনেক কল্পনা এবং কষ্ট-কল্পনা করেন তাদের সুযোগ করে দিয়েছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, একথা বললে খুব ভুল বলা হবে না। কবি নিজেও জানতেন সেকথা। তাই কৌতুক করে শেষ বয়সে বলতেন, ভাগ্যিস নতুন বৌঠান মারা গিয়েছিলেন তাই আজও তাকে নিয়ে কবিতা লিখছি—বেঁচে থাকলে হয়ত বিষয় নিয়ে মামলা হত।
জোতিরিন্দ্রনাথ প্রথম জীবনে কিছুটা গোঁড়ামির পরিচয় দিলেও সত্যেন্দ্রজ্ঞানদানন্দিনীর প্রভাবে নব্যভাবের নেশায় মেতে উঠলেন। সাবেক সংস্কার ত্যাগ করে তিনি কাদম্বরীকেও ঘোড়ায় চড়া শিখিয়েছিলেন এবং গঙ্গার ধারে নির্জনে শিক্ষাপর্ব শেষ হলে কাদম্বরী প্রতিদিন স্বামীর সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে গড়ের মাঠে হাওয়া খেতে যেতেন। তাঁদের দেখে অবাক বিস্ময়ে যারা কানাকানি করত তাদের কথা প্রথমেই বলেছি। কাদম্বরীর অশ্বারোহণ বেশ আলোড়ন জাগিয়েছিল। কাদম্বরী ঠিক কোন সময় ঘোড়ায় চড়তেন সেকথাও জানা যায়নি। কেউই সঠিক সময় নির্দেশ করেননি। তবে এ ব্যাপারে কাদম্বরীকে একমাত্র অশ্বারোহিণী বঙ্গললনা বলা চলে না। কারণ আরো কয়েকজনের কথা আমরা শুনেছি। তারা কাদম্বরীর পূর্ববর্তিনী হয়ত নন কিন্তু সমসাময়িক বা অল্প পরবর্তী যে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। য়ুরোপীয় শিক্ষার অঙ্গ হিসেবে আধুনিকারা ঘোড়ায় চড়া শিখতেন। সাহেবদের অনুকরণ করতেন দেশী সাহেব অর্থাৎ ভারতীয় আই. সি. এস. অফিসারেরা। সত্যেন্দ্রনাথকে অনেকেই জিজ্ঞেস করেছিলেন যে তার স্ত্রী ঘোড়ায় চড়তে পারেন কিনা। সত্যেরে পরেই যে তিনজন বাঙালী সিভিলিয়ান অফিসার হয়েছিলেন তারা—রমেশচন্দ্র দত্ত, বিহারী লাল গুপ্ত ও সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। এঁরা আচার-বিচার চালচলনে পুরো সাহেব হয়ে গিয়েছিলেন। সুরেন্দ্রনাথের স্ত্রী শ্রীহট্টে ঘোড়ায় চড়ে বিকেলে হাওয়া খেতে বেরোতেন। লর্ড সত্যেন্দ্র প্রসন্ন সিংহের মেয়ে রমলা এবং কুচবিহারের মহারাণী সুনীতিদেবীর মেয়েরাও ঘোড়ায় চড়তে জানতেন। হেমেন্দ্রনাথের মেয়েরাও কেউ কেউ এ ব্যাপারে কৃতিত্ব দেখিয়েছেন তবে এর এসেছেন অনেক পরে। সেকালের আধুনিক মেয়েরা অনেক ব্যাপারেই অভিনবত্ব দেখিয়েছেন। এঁদের সবচেয়ে আধুনিকতা ছিল স্বামী বা সঙ্গীনির্বাচনের অভিনবত্বে। ঠাকুরবাড়ির মেয়ে-বৌরা ঠিক এই ধরনের মানসিকতার পরিচয় দিতে পারেননি। তারা সনাতন ধারাটিতেই এনেছেন নতুন কালের ছন্দ। বগহীন উন্মত্ত মুক্তির স্রোতে হয়ত উন্মাদনা আছে কিন্তু সুস্থ মানসিকতা কোথায়? ঠাকুরবাড়ির কোন মেয়েই এমন হালকা হাওয়ার খেয়ালী নেশায় মেতে ওঠেননি। তাই নারী সমাজের ওপর তাদের মোহরের ছাপটাই সবচেয়ে গভীর!
