স্মৃতিচারণের সময় প্রফুল্লময়ী ঠাকুরবাড়ির ছোট ছোট ছবি এঁকেছেন। সে ছবিগুলি আশ্চর্যরকমের ঘবোয়া। বাড়ির মধ্যে যে বিরাট পরিবর্তন হচ্ছিল, নারী পুরুষ সকলেই প্রগতির নেশায় মেতে উঠেছিলেন, প্রফুল্লময়ীর লেখা পড়ে তা বোঝাই যায় না। প্রফুল্লময়ী জানাচ্ছেন সাবেকী সব বাড়িতে যেমন হয়, তাদের বাড়িতেও ননদ-জায়েরা সবাই মিলে একসঙ্গে খেতে বসতেন। গায়ের মেয়ে বলে প্রফুল্লময়ী টানতেন দীর্ঘ ঘোমটা। একহাত ঘোমটার মধ্যে তিনি কি করে খান ভেবে না পেয়ে লুকিয়ে-কিয়ে উঁকি মারতেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ এবং খাওয়ার রকম দেখিয়া থাকিতে না পারিয়া নানারকম ঠাট্টা করিতে ছাড়িতেন না।
এরকম করেই দিন কাটছিল। মিষ্টি গলা। বলে তার গান শেখারও ব্যবস্থা হল। মাঝে মাঝে গলা মিলিয়ে গান করতেন কিশোর দেবর রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। কিন্তু চার বছর পরে সমস্ত সুখস্বপ্ন মিলিয়ে গেল ক্ষণিক বুদ্ধদের মতো। স্নান আহার ত্যাগ করে দিনে দিনে অস্বাভাবিক হয়ে উঠলেন বীরেন্দ্র। ক্রমশই অস্থিরতা বাড়তে বাড়তে রূপ নিল পাগলামির। লোকে বলে অঙ্ক কষতে কষতে বীরেন্দ্র পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। ঘরের চার দেয়ালে বড় বড় অঙ্ক কষে রাখতেন কাঠকয়লা দিয়ে। শোনা যায়, একজন ইংরেজ অঙ্কবিদ সেই অঙ্কগুলি দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যান। কিন্তু অন্য সময়ে বীরেন্দ্রের মধ্যে এই স্থিরতা ছিল না। প্রকাণ্ড সন্দেহের বিষে সবাইকে জর্জরিত করে তুলতেন। জোর করে তাকে এক চামচ ভাত বা একটি পটল পোড় খাওয়াতে হিমসিম খেতে হত সবাইকে। এমনি করে আরো তিন বছর কাটে কিন্তু প্রফুল্লময়ীর ভাঙা কপাল আর জোড়া লাগেনি। ধীরে ধীরে অতি অকালে ম্লান হয়ে আসে সদাহাস্যময়ী মুখখানি।
বাড়িতে যখন বসন্ত-উৎসব আর পুনর্বসন্তের মহড়া চলছে পুরোদমে, প্রফুল্লময়ীর চোখে তখন ঘন বর্ষার শ্রাবণধারা। মাঝে মাঝে বড় বিস্ময় লাগে। কেন এমন হয়? কি করে হয়? কিন্তু ভরা-ভোগের প্রাচুর্যের মধ্যে বদ্ধদুয়ার ঘরে একটি মেয়ের তিল-তিল করে শুকিয়ে যাওয়া চিরদিন কে মনে রাখে? প্রথমে দুঃখ পায়, সান্ত্বনা দেয়। তারপর ভুলে যায়। এ ঘটনা তো যে কোন বাড়িতে ঘটে। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির মতো আলোকপ্রাপ্ত পরিবারেও এর কোন পরিবর্তন হল না? উন্নতমনা মহর্ষিও কি এই বিষাদ প্রতিমাটিকে কোন ভাবে সার্থক হয়ে ওঠার পথ দেখাতে পারতেন না? প্রফুল্লময়ী সমস্ত শোক তাপের উর্ধ্বে উঠতে পেরেছিলেন অধ্যাত্ম চিন্তার মধ্যে দিয়েই। কিন্তু সে তার একান্ত নিজস্ব উপলব্ধি, মহর্ষির উপদেশ বা সান্ত্বনাবাক্য কোনদিন তার পাথেয় বা পথের দিশারী কোনটাই হয়ে উঠেছিল বলে শোনা যায়নি।
এত দুঃখের মধ্যেও প্রফুল্লময়ীর ভাগ্য মাঝে কিছুদিন সুপ্রসন্ন হয়েছিল। না হলে অন্ধের নড়ির মতো রুগ্ন সন্তান বলেন্দ্রনাথের অল্প বয়সেই এত নামডাক হবে কেন? কিছুদিন পরে টুকটুকে বউ হয়ে এলেন সুশী বা সাহানা। এবার বোধহয় দুঃখ ঘুচল। প্রফুল্লময়ী আপনমনে স্বামীর পরিচর্যা করেন। ছেলে ও ছেলের বৌকে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। আবার বাদ সাধলেন বিধাতা। মাত্র কদিনের অরবিকারে শয্যা নিলেন বলে। যমে-মানুষে টানাটানি চলে কদিন। হিতাহিত জ্ঞান হারালেন প্রফুল্লময়ী! তারপর এল সেই দুর্যোগভরা ভয়ানক রাত্রি। ঘরে-বাইরে অশ্রুর তুফান। বলেন্দ্রের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হয়ে আসছে। তার যন্ত্রণা চোখে দেখতে না পেরে বারবার বাইরে গিয়ে বসেছেন হতভাগিনী জননী। এক সময়ে রবীন্দ্রনাথ এসে বললেন, তুমি একবার তার কাছে যাও। প্রফুল্লময়ী জানতেন এ ডাক আসবে। তা বলে এত শীঘ্র! পুত্রের মৃত্যুশয্যার পাশে এসে দাঁড়ালেন প্রফুল্লময়ী।
সব শেষ হইয়া গেল। তখন ভোর হইয়াছে। সূর্যদেব ধীরে ধীরে কিরণচ্ছটায় পৃথিবীকে সজীব করিয়া তুলিতেছিলেন, ঠিক সেই সময় তাহার জীবনদীপ নিভিয়া গেল।
প্রফুল্লময়ী সব আঘাত সহ্য করলেন শান্ত মুখে, ঘোড়শী পুত্রবধুর মুখ চেয়ে। এমনই তার কপাল যে পুত্রবিয়োগ ব্যথায় তিনি শোকে তাপে ভেঙে পড়েননি বলে বাড়ির সবাই আশ্চর্য, বুঝি-বা বিরক্তও হলেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ স্ত্রীকে লিখলেন, নবোঠানের এক ছেলে, সংসারের একমাত্র বন্ধন নষ্ট হয়েছে তবু তিনি টাকাকড়ি কেনাবেচা নিয়ে দিনরাত যে রকম ব্যাপৃত হয়ে আছেন তাই দেখে সকলেই অশ্চর্য এবং বিরক্ত হয়ে গেছে। কবি চিঠিটা লিখেছিলেন বলেন্দ্রের শ্রাদ্ধের আগের দিন। প্রফুল্লময়ীর স্মৃতিকথা পড়ে মনে হয় কেনাবেচা কাজ-কর্ম নিয়ে তিনি দুঃখ ভোলার চেষ্টা করছিলেন। নয়ত তিনি জল-ঝড় উপেক্ষা করে বলেরে ঘরের সামনে দিনরাত পড়ে থাকতেন কেন?
এরপরেও পুত্রবধূর মৃত্যু, স্বামীর মৃত্যু, ভাইয়ের মৃত্যু, বিষয় থেকে বঞ্চিত হওয়ায় অর্থাভাব প্রভৃতি নানা বিপর্যয় প্রফুল্লময়ীর জীবনে আনাগোনা করেছে। তিনি তার হিসেব রাখেননি। বুকজোড়া শূন্যতার হাহাকার প্রশমিত হবার পর তিনি যখন আমাদের কথা বলতে বসেছেন তখন আর কারুর বিরুদ্ধে তাঁর কোন অভিযোগ নেই, নেই কোন বঞ্চনার গ্লানি। নির্বেদ বিষণ্ণতার মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত করে তিনি যে শান্তি পেয়েছেন, দুঃখশোকহীন সুখের তরঙ্গে ভেসে বেড়ালে তা কোনদিনই পেতেন না। যে স্পর্শমণি পাবার জন্য মানুষ আকুল হয়ে ঘুরে বেড়ায়, বেদনার সিন্ধু মন্থন করে সেই অমৃতের সন্ধান প্রফুল্লময়ী যেদিন পেলেন, সেইদিন তিনি বিশ্বচরাচরের সব কিছুর মধ্যে বলেন্দ্রকে আবার ফিরে পেলেন। এই পাওয়াই তাঁর জীবনের চরম প্রাপ্তি। তিনি লিখেছেন,
