নীপময়ীর একটি সংবাদ আমাদের সবচেয়ে বেশি আকৃষ্ট করে সেটি হল তার ছবি আঁকা। সেদিন পুণ্য পত্রিকায় নীপময়ীর একটা ছবি চোখে পড়ল। ১৩০৭ সালের পুণ্যতে প্রকাশিত হরপার্বতী অতি সাধারণ একটি ছবি। চিত্রশিল্পী হিসেবে নীপময়ী হয়ত কিছুই হতে পারেননি তবু জানতে ইচ্ছে করে বৈকি। বাংলাদেশে ছবি আঁকার চর্চা প্রায় ছিলই না। পূর্ব যুগের পটশিল্প অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছিল। ভারতীয় শিল্পের অবস্থাও খুব ভাল নয়। এ সময় নীপময়ী ছবি আঁকা শিখেছিলেন। ডঃ অমৃতময় মুখোপাধ্যায়ের সৌজন্যে তার মাতামহ ক্ষিতীন্দ্রনাথের অপ্রকাশিত একটি খাতা মহর্ষিপরিবার-এর কিছুটা দেখবার সুযোগ হয়েছিল। তাতে ক্ষিতীন্দ্রনাথ তাঁর মায়ের কথা কিছু কিছু লিখেছেন, ছবি আঁকার কথাও আছে :
মায়ের আঁকা ছবি এখনও আমাদের তিন ভাইয়ের ঘরে কয়েকখানা আছে। কালিদাস পালের শিক্ষকতায় মা ইরুদিদির একটা ছবি এঁকেছিলেন। তাছাড়া একটা ক্লিওপেট্রার ছবি এঁকেছিলেন। White সাহেবের শিক্ষকতায় দিদির ছবি একেছিলেন।
দুঃখের বিষয় নীপময়ীর আঁকা ছবিগুলি সবই নষ্ট হয়ে গেছে। বিবরণ পড়ে মনে হয় নীপময়ী এদেশী এবং বিদেশী চিত্রশিল্পীর কাছে ছবি আঁকা। শিখলেও অঙ্কনশৈলীতে তার নিজস্ব কিন্তু ফুটে ওঠেনি। নীপময়ীর ছেলেমেয়েরাও ভাল ছবি আঁকতেন। ক্ষিতীন্দ্রনাথ তাঁর মায়ের শিক্ষকদের কথাও লিখেছেন। কালিদাস পালের মাসিক বেতন ছিল ত্রিশ টাকা আর white পেতেন একশ টাকা।
ছবি আঁকা ছাড়াও নীপময়ী সেকালের সুপ্রসিদ্ধ বেণীমাধববাবুর কাছে শিখেছিলেন বায়া-তবলা ও করতাল বাজাতে। নীপময়ীকে হেমেন্দ্রনাথ শেখাননি এমন বিষয় খুব কম ছিল। ক্ষিতীন্দ্রনাথ তাঁকে মিন্টনের প্যারাডাইস লস্ট ও সংস্কৃত অভিজ্ঞান শকুন্তলম্ পড়তে দেখেছিলেন। তবে নীপময়ীর সঙ্গীতচর্চা, চিত্রচর্চা, সবই নেপথ্যে রয়ে গেছে। শিক্ষার ফল শুধু দেখা গেছে তার মেয়েদের অসাধারণ গুণাবলীর মধ্যে। হয়ত তার ছোট বোন প্রফুল্লময়ীও এমনি আড়ালে থেকে যেতেন যদি-না তাঁর স্মৃতিকথাটি আমাদের কাছে পৌছে দিতেন সুধীন্দ্রনাথের বড় মেয়ে রমা। তিনিও জ্ঞানদানন্দিনী-স্বর্ণকুমারীর মতো কোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়ে বাংলার মেয়েদের চোখের সামনে কোন নজির সৃষ্টি করেননি। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলে সর্বসুন্দরী, নীপময়ী, প্রফুল্লময়ীরাও তো ছিলেন।
প্রফুল্লময়ীর মতো হতভাগিনী নারীর সংখ্যা বেশি নেই। নাম তার প্রফুল্লময়ী, কিন্তু সারাটা জীবন তিনি চোখের জল ফেলে ঘরের কোণে বসে কাটিয়েছেন। রূপকথার রাজপ্রাসাদের মতো এই বিশাল ঠাকুরবাড়ির একটা ঘরে যে এত অশ্রুবিন্দু জমাট বেঁধে পাথর হয়ে উঠেছে সে কথাই বা কে জানত? জীবনের একেবারে শেষ পর্বে প্রফুল্লময়ী ব্যক্ত করলেন নিজেকে। না কর েঠাকুরবাড়ির সমস্ত আনন্দ উল্লাস ছাপিয়ে অব্যক্ত যন্ত্রণাক্লিষ্ট একটি অশ্রুসিক্ত অপরূপ মুখশ্র কি কোনদিন স্পষ্ট হয়ে উঠত? সুখ-দুঃখ আর হাসি-কান্নার টানাপোড়েনে তবেই না বোনা হয়েছে নারীজীবনের সার্থক ছবি।
প্রফুল্লময়ীর দুঃখ কোন সময়েই খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। কি করে উঠবে? হঠাৎ-হারানোর হাহাকার রূপ পেতে পারে, তিল তিল করে জমে ওঠা বুকভাঙা বেদনার তো কোন রূপ নেই। অথচ প্রফুল্লময়ী পেয়েছিলেন সবই। ছোটবেলায় পুণ্যিপুকুর ব্রত করবার সময় সব মেয়েই যা চায়, সেই সব। দিদির বিয়ে হয়েছে বড় ঘরে। মহাদেবের মতো সুন্দর ভগ্নিপতি। গবে মাঝে মায়ের সঙ্গে দিদিকে দেখতে যেতেন ছোট্ট প্রফুল্লমঙ্গী। অবাক বিস্ময়ে দেখতেন দেউড়িদালানওয়ালা তিন মহলা বাড়িটিকে। কত ঘর, কত থাম, জানলা, রেলিং, দাসদাসী, আসবাবপত্র, আলমারিতে সাজানো কাঁচের-পুতুল–কত কী! তাঁকে দেখেও পছন্দ হয়ে গেল শরৎকুমারী ও স্বর্ণকুমারীর। কেমন স্বর্ণচাপার পাপড়ির ফিকে সোনার মতো চমৎকার গায়ের রঙ, পদ্মের পাপড়ির মতো টানা-টানা ডাগর দুটি ভ্রমরকৃষ্ণ চোখ, নিখুত মুখশ্রী, চমৎকার গড়ন, মিষ্টি গলা—আচ্ছা, বীরেন্দ্রের সঙ্গে বিয়ে দিলে কেমন হয়? যেমন ভাবা তেমন কাজ।
দুই বোনে তাড়াতাড়ি মেয়ে দেখার ব্যবস্থা করলেন। বীরেন্দ্র মহর্ষির চতুর্থ পুত্র, অত্যন্ত মেধাবী, বিশেষ করে অঙ্কে অসাধারণ আসক্তি। সুদর্শন। বেশ মানাবে দুজনকে। তাই মেয়ে দেখার প্রস্তাষ। এর আগে ঠাকুরবাড়িতে মেয়ে দেখা হত সাবেকীমতে। বাড়ির পুরনো ঝি খেলনা নিয়ে মেয়ে দেখতে যেত এবং তারা যাদের পছন্দ করে আসত তাদের সঙ্গেই বিয়ে হত। কিন্তু দিন বদলাচ্ছে সুতরাং আধুনিক মেয়ে দেখার পদ্ধতি যদি চালু করা হয় দোষ কি? একদিন প্রফুল্লময়ী আসতেই দুই বোনে মিলে তাকে সাজিয়ে বীরেন্দ্রকে দেখাবার জন্য টেনেটুনে বাইরের দিকের বারান্দায় নিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন। গ্রামবালিকা প্রফুল্লময়ী, তখন তাঁর লজ্জাই বেশি। কাজেই তিনি কিছুতেই বীরেন্দ্রের সামনে বেরোলেন না। কোন রকমে ভেতরের দিকে চলে এলেন। তাতে অবশ্য বিয়ে আটকাল না। অতি বৃদ্ধা বয়সে স্মৃতিকথা বলার সময় প্রফুল্লময়ীর সব কথাই মনে পড়েছিল। সেই সব সুখের দিনের স্মৃতি।
এক ফাল্গুনী অপরাহ্নে দিদির মতোই একহাত ঘোমটা টেনে তাঞ্জামে চেপে প্রফুল্লময়ী এলেন স্বামীর ঘরে। শাশুড়ী-ননদ-জা-দিদির আদরে দিনগুলো শুরু হল স্বপ্নের মতো। ঠাকুরবাড়ি থেকে নতুন বৌ যৌতুক পেলেন গা-ভরা গয়না। গলায়—চিক, ঝিলদানা, হাতে চুড়ি, বালা, বাজুবন্দ; . কানে— মুক্তার গেচ্ছা, বীরবৌলি, কানবালা; মাথায় জড়োয়া সিথি; পায়ে গোড়ে, পায়জোড়, মল, ছানলা, চুটকী; কোমরে—দশ ভরির গেট, আরো কত কী! মনে হল সুখের বুঝি সীমা নেই।
